গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, নদীর ঢেউ আর মাঝি-মাল্লাদের বৈঠার ছন্দে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় বরিশালের উজিরপুর। ঢাকঢোলের বাদ্য, নৌকার পাল্লাপাল্লি আর লাখো দর্শকের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে সন্ধ্যা নদীর বুক। নদীর দুই তীরজুড়ে মানুষের ঢল আর বৈঠার ছন্দে যেন ফিরে আসে বাংলার চিরচেনা সেই গ্রামীণ উৎসবের আবহ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় শিকারপুর সরকারি শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন সন্ধ্যা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘উজিরপুর নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা-২০২৬’। প্রতিযোগিতাকে ঘিরে মেজর এম. এ. জলিল স্মৃতিসেতু এবং নদীর উত্তর ও দক্ষিণ তীরজুড়ে নামে মানুষের ঢল। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় উৎসবের মঞ্চে।
নদীর বুকে তখন একের পর এক ছুটে চলছিল নৌকা। মাঝি-মাল্লাদের ছন্দময় বৈঠার টানে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল প্রতিযোগিতার নৌকাগুলো। নৌকার গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দর্শকদের করতালি, চিৎকার আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে সন্ধ্যা নদীর দুই তীর যেন হয়ে ওঠে মিলনমেলা।
উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থা আভাসের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় আটটি দল। দলগুলোর নামকরণ করা হয় দেশের বিভিন্ন নদীর নামে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় কীর্তনখোলা নদী, সুগন্ধা নদী, আড়িয়াল খাঁ নদী, সন্ধ্যা নদী, ধানসিঁড়ি নদী, তেঁতুলিয়া নদী, পায়রা নদী ও বিষখালী নদী দল।
নদীর নামে নামকরণ করা দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সন্ধ্যা নদীর বুকে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা। প্রতিটি দলই সেরার লড়াইয়ে নিজেদের সামর্থ্য ও নৈপুণ্য তুলে ধরে। শেষ পর্যন্ত প্রথম স্থান অর্জন করে ‘সন্ধ্যা নদী’ দল। দ্বিতীয় হয় ‘বিষখালী নদী’ দল এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে ‘সুগন্ধা নদী’ দল।
যে সন্ধ্যা নদীর বুকে প্রতিযোগিতার আয়োজন, সেই নদীর নামের দলটির চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবারের নৌকা বাইচে যোগ করে বাড়তি আনন্দ। বিজয়ী দলের সাফল্যে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন নদীর তীরে অপেক্ষমাণ দর্শকেরাও।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে যথাক্রমে ৩০ হাজার, ২০ হাজার ও ১০ হাজার টাকা প্রাইজমানি দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিটি বিজয়ী দল পায় একটি করে কাপ। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দলের জন্যও রাখা হয় সান্ত্বনা পুরস্কার।
নৌকার লড়াই শেষে মেজর এম. এ. জলিল স্মৃতিসেতুর নিচের বিস্তৃত স্থানে নির্মিত সুসজ্জিত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় দিনব্যাপী আয়োজনের দ্বিতীয় অধিবেশন—পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেখানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। নদীর বুকে রোমাঞ্চকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর সেতুর নিচে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান মিলিয়ে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। সভাপতিত্ব করেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) খলিল আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কিপার আসমা ফেরদৌসী এবং উন্নয়ন সংস্থা আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল। অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা।’
বক্তারা তাদের বক্তব্যে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, নৌকা বাইচ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে প্রতিবছর নিয়মিত নৌকা বাইচের আয়োজন করা যায় এবং গ্রামবাংলার মানুষ এমন উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
উজিরপুরসহ বরিশাল জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নৌকা বাইচ উপভোগ করেন। নদীর দুই তীর ও সেতু এলাকায় বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় মিলনমেলায়। শিশু, তরুণ, প্রবীণসহ নানা বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে নৌকা বাইচ হয়ে ওঠে সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের উৎসব।
নদী ও নৌকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলার এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রতিবছর এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, নিয়মিত নৌকা বাইচের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে বাংলার শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।