যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মঙ্গলবার ভোট দেবেন দেশটির নাগরিকেরা। এই নির্বাচনের ফলের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশেষ করে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান পার্টি। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের সামনে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, বিপুল নির্বাচনী তহবিল ও বিজ্ঞাপন প্রচারে এগিয়ে থাকার কারণে লড়াইয়ে সুবিধা পাওয়ার আশা করছে রিপাবলিকানরা।
কোন দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবে, ভোটারদের কাছে কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এবং নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে সেসব বিষয়েই এখন নজর বিশ্লেষকদের।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা, সুবিধা পেতে পারে ডেমোক্র্যাটরা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী হওয়ার অন্যতম কারণ ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
নির্বাচনী জরিপ বিশ্লেষণকারী ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। পরে তা দ্রুত কমে ৪০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ। হামলা শুরুর পর তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। বর্তমানে এই হার প্রায় ৩৭ শতাংশ।
প্রথম মেয়াদে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ছিল ৪৩ শতাংশ। জো বাইডেনের ক্ষেত্রেও একই সময় এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। দুই প্রেসিডেন্টের আমলেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিল তারা।
এই অভিজ্ঞতা ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করে তুলছে। দলটি এবার এমন কিছু অঙ্গরাজ্যেও জয় পাওয়ার চেষ্টা করছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
প্রতিনিধি পরিষদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। ৪৩৫ আসনের এই কক্ষে দলটির সদস্যসংখ্যা ২১৮। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে হলে এই অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। এ ছাড়া একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন, যিনি সাধারণত রিপাবলিকানদের পক্ষেই ভোট দেন।
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হওয়ায় এবার সব কটি আসনেই নির্বাচন হচ্ছে। যদিও অধিকাংশ আসনে জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা নেই, তবে কয়েকটি আসনে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
নির্বাচনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটাই কাছাকাছি যে ফলাফল যেকোনো দিকে যেতে পারে। এসব আসনের ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য পরিস্থিতি ইতিবাচক। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই আসনগুলোতে জয় না পেলেও নিজেদের শক্ত অবস্থানের আসনগুলো ধরে রাখতে পারলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের।
ইতিহাসও ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করে তুলছে। ১৯৩৪ সালের পর থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, এসব নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে। গত ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তিনবার ক্ষমতাসীন দল আসন বাড়াতে পেরেছে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া কঠিন হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের জন্য
প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা শক্ত। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে দলটির আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ৪৫টি আসন। বাকি দুটি আসনে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন।
সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর পরপর এই কক্ষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনে ভোট নেওয়া হবে।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের হিসাবে, এসব আসনের মধ্যে সাতটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে বেশি। এর ছয়টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং একটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের আসন ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের একাধিক আসনেও জয় পেতে হবে।
মিশিগানের আসনটি ধরে রাখা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বামপন্থী আবদুল এল-সায়েদের সঙ্গে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক এফবিআই এজেন্ট মাইক রজার্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে নজর রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের বড় ব্যবধানে জেতা আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের আসন জয়ের চেষ্টা করতে হবে।
টেক্সাসেও দলটির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক শিক্ষক জেমস তালারিকো যদি রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে হারাতে পারেন, তাহলে ১৯৮৮ সালের পর রাজ্যটি থেকে প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ
ভোটারদের সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় এবার বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও দৈনন্দিন খরচ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে প্রতি গ্যালন জ্বালানি তেলের দাম ২ দশমিক ৩০ ডলারের নিচে নেমেছে। কিন্তু এর চার দিন পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন চার ডলারে পৌঁছায়।
যুদ্ধের প্রভাব এবং জ্বালানির বাড়তি খরচ নিয়ে অসন্তোষও বাড়তে থাকে। আগস্টের এক জরিপে দেখা যায়, ইরান পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশ কমানোর সাফল্য তুলে ধরে নিজেদের অভিবাসননীতির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার উচ্চ ব্যয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন আইনের কারণে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি সামনে আনছেন।
নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়
জরিপ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা বাড়ালেও রিপাবলিকানদের হাতে থাকা বিপুল অর্থ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী প্রচার ও বিজ্ঞাপনে দলটি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর হাতে নগদ অর্থ ছিল প্রায় ৩২ কোটি ডলার। একই সময়ে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল প্রায় ২৩ কোটি ডলার।
এর বাইরে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের প্রধান তহবিল সংগ্রহকারী সংগঠন মাগা ইনকের কাছে ১৬ কোটি ডলারের বেশি অর্থ রয়েছে। এসব অর্থ নির্বাচনী প্রচার ও বিজ্ঞাপনে কাজে লাগানো হচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে ১০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। এই খাতে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে প্রায় ২০ কোটি ডলার বেশি খরচ করেছে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট আসনগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচারে এগিয়ে রয়েছে দলটি।
বিজ্ঞাপন ও প্রচারের মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন ধরে রেখে নির্বাচনী ক্ষতি কমানোর আশা করছে রিপাবলিকানরা।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও পড়বে প্রভাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের জন্য নিজের নীতিমালা বাস্তবায়ন ও আইন পাস করানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করতে পারলে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের নেতৃত্বের পক্ষে নতুন করে জনসমর্থনের দাবি তুলতে পারবে।
তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়াই ডেমোক্র্যাটদের জন্য যথেষ্ট হবে না। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলটিকে নিজেদের নীতি, রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও বিকল্প নেতৃত্বের বিষয়েও ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে হবে।
সূত্র: বিবিসি