চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটি সড়ক একই দিনে দুইবার উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী বিওপি ক্যাম্প থেকে ফরিদপুর বিওপি ক্যাম্প পর্যন্ত সড়কটির নির্মাণকাজ রোববার (১ নভেম্বর) সকালে উদ্বোধন করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিন বিকেলে সড়কটি আবার উদ্বোধন করেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জের ধরেই এমন উদ্বোধন, পাল্টা উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বলছে, সড়কটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এখনো করা হয়নি।
জানা যায়, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। তিন কিলোমিটার ৫৫০ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৩১ টাকা। সড়ক নির্মাণ হলে সীমান্তবর্তী এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির টহল ও সীমান্তে নজরদারিতে সুবিধা হওয়ার পাশাপাশি পদ্মা নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি পদ্মা নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকার মানুষের যাতায়াতেও সুবিধা বাড়বে।
স্থানীয়রা জানান, রোববার সকালে সড়কটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিন বিকেলে সড়কটি পুনরায় উদ্বোধন করেন এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ।
দুই নেতা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একে অপরের সমালোচনা করেন। সকালে নুরুল ইসলাম বুলবুলের অনুষ্ঠানে এলজিইডির নামসংবলিত ব্যানার থাকলেও বিকেলে হারুনুর রশীদের অনুষ্ঠানে তা দেখা যায়নি। তিনি ফিতা কেটে সড়কটির উদ্বোধন করেন। তবে দুই অনুষ্ঠানেই এলজিইডির কর্মকর্তা ও ঠিকাদার উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে উদ্বোধন শেষে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘আপনি (হারুনুর রশীদ) যদি চান চাঁপাইনবাবগঞ্জে যত ভালো কাজ হবে, এর উদ্বোধনে আমার সাথে থাকতে চান, ওয়েলকাম, আপনি থাকবেন আমার সাথে। কারণ আমি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে জেলাকে সবাই মিলে এগিয়ে নিতে চাই। সুতরাং, আমি যেই কাজ উদ্বোধন করব, আপনি আমার সাথে থাকেন কোনো অসুবিধা নাই। আপনি জেলা পরিষদের প্রশাসক, সেই বরাদ্দ নিয়ে থাকেন। আপনার যে বরাদ্দ আসবে, কী বাজেট আসছে আপনি কোন খাতে খরচ করছেন এবং করবেন, সেটি জেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে খোঁজ-খবর নেওয়ার দায়িত্ব এমপির আছে। এটি শুধু আমার একার নয়, সারা বাংলাদেশের সকল এমপির আছে। সুতরাং আপনার তদারকি করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু আমার কোনো কাজের দিকে তাকানো আপনার দায়িত্ব না।’
তিনি আরও বলেন, জেলার উন্নয়নে সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে তার কোনো আপত্তি নেই। তবে সরকারি উন্নয়নকাজে সংসদ সদস্যের তদারকির অধিকার রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সদর আসনে যেসব উন্নয়নকাজ হবে, সেগুলোর দায়িত্ব তাঁর। জনগণ তাঁকে ৬২ হাজার ৬১৯ ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত করেছে। তাঁর উদ্যোগে নেওয়া কাজ অন্য কেউ উদ্বোধন করবেন, এমন এখতিয়ার জনগণ কাউকে দেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই সড়ক দুইবার উদ্বোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে হারুনুর রশীদ মুঠোফোনে বলেন, সড়কটির বরাদ্দ ও প্রকল্প তিনি নিয়ে এসেছেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তিনি সড়কটি পরিদর্শন কিংবা উদ্বোধন করতেই পারেন। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য বুলবুলকে প্রশ্ন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে আসার সুবাদে সড়কটি উদ্বোধনের অধিকার তার রয়েছে।
এদিকে, উদ্বোধন-পরবর্তী আলোচনা সভায় হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের নতুন এমপিকে (নুরুল ইসলাম বুলবুল) বলব, বহু কাঁচা রাস্তা আছে ভাই, তুমি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসে কাজ করো, তোমার বরাদ্দ আনার ক্ষমতা আমরা দেখতে চাই। মানুষ চায়, এখানে আরও কাজ হোক, উন্নয়ন হোক, কোনো অসুবিধা নাই। কথাবার্তা বলার সময় খুব সাবধানে বলবা, উল্টাপাল্টা কথা বললে, জনগণ কিন্তু সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এরকম ছ্যাঁচড়া এমপি আমি দেখিনি। এত ছ্যাঁচড়া এমপি বাংলাদেশে আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। সড়কটি আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল, বাস্তবায়নেও আমার অনেক সহযোগিতা ছিল।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন জুয়েল বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই এ আসনে রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নেতা কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এতে জেলার উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
সড়ক নির্মাণের ঠিকাদার মো. সেলিম রেজা বলেন, বর্তমান ও সাবেক দুই সংসদ সদস্যের অনুষ্ঠানেই তিনি উপস্থিত ছিলেন। সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা প্রকল্প পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে ঠিকাদার হিসেবে তাদের উপস্থিত থাকতে হয়। সে কারণেই তিনি দুই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম জানান, এলজিইডির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। এটি হলে ফলক বসানো হতো। কিন্তু তা করা হয়নি। বর্তমান ও সাবেক এমপি দুজনই তদারকির কাজে গিয়েছিলেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে তাঁরা সেখানে উপস্থিত থাকেন। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে বলেও জানান তিনি।