যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নতুন করে শুরু হতে পারে, এমন আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্পষ্ট মন্তব্য ও তেহরানের অব্যাহত হুমকি এই অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় আরব আমিরাত চায় না যুদ্ধ বাধুক, তবে তার পাশাপাশি খারাপ পরিস্থিতির প্রস্তুতিও নিচ্ছে। অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরায়েল।
গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া এই সংঘাত অষ্টম মাসে গড়িয়েছে। ট্রাম্প এক বার্তায় চলতি সপ্তাহে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর কথা বললেও এর পরের পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। রিয়াদের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো হাসান আল-হাসান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তার মধ্য থেকে প্রকৃত বার্তা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরু হলে তেল স্থাপনার বাইরে এআই খাতসহ অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়া যে কোনো হুমকির জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘পুরস্কার ও শাস্তির কৌশল ইরানের ওপর কাজ করবে না। আমাদের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়ার পরই কেবল অগ্রগতি সম্ভব।'
সার্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মার্কিন কূটনীতিকের পরিবার গোপনে অঞ্চলটি ছাড়তে শুরু করেছে। আবুধাবিতে প্রধান তেল সম্মেলনে মার্কিন তেল কোম্পানির নির্বাহীরা নিরাপত্তাশঙ্কায় অংশগ্রহণ বাতিল করেছেন। বাহরাইনের ২১ বছর বয়সি বাসিন্দা ফাওয়াজ জানান, বোমার শব্দ শুনলেই হৃদকম্পন শুরু হয় এবং রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাক জানান, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ আসতে পারে এবং উভয় পক্ষ একটি সাময়িক বিরতির কাছাকাছি রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আটলান্টায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট যে কোনো সংকট কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পক্ষে, যদি তা সম্ভব হয়। কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও অতীতে আলোচনার সময় হামলার শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করতে পারছে না তেহরান। উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় এই যুদ্ধ বিরতি পায় কি না, তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার মুখে নতুন করে কোনো যুদ্ধ বাধুক তা চায় না সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে যদি কোনো কথায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তাহলে দেশটি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছে। সোমবার বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এক সম্মেলনে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাস এ কথা জানান। তিনি বলেন, 'আমাদের প্রত্যাশা আমরা এই সংঘাতে কূটনৈতিক ব্রেকথ্রু দেখতে পাব। এই অঞ্চল আরেক দফা যুদ্ধে যেতে চায় না। তবে আমরাও, যেমনটা আমরা আগে দেখিয়েছি, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত। গত সপ্তাহে ইরানের রাজধানী তেহরানে যান কাতারের প্রতিনিধিরা। ঐ সময় ইরানি প্রতিনিধিদের দোহায় নিতে সম্মত হন তারা। এরপর গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ইরানিরা দোহাতেই ছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথবাহিনীর হামলা শুরু হয়। এ সময় বাহরাইন, কুয়েত ও আমিরাতেও ব্যাপক পালটা হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। এর মধ্যে আমিরাতে সবচেয়ে বেশি ড্রোন ও মিসাইল ছোড়া হয়। কারণ আমিরাত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইরানে সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল। যদিও দেশটি এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে শুরু থেকে। ইরান এবারও আমিরাতসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যদি তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কোনো ধরনের সহায়তা করে, তাহলে তাদের পালটা হামলার মুখোমুখি হতে হবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই ইরানে নতুন হামলা শুরু করতে পারে মার্কিন বাহিনী।
এদিকে ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরায়েল। সোমবার সকালে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়ালা জানিয়েছে, যে কোনো সময় যুদ্ধ শুরু হতে পারে এমন বিষয় মাথায় রেখে ইসরায়েল সরকার তাদের বিমানবাহিনী, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক গোয়েন্দা শাখাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে।
ওয়ালা আরো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কথা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানে হামলার তারিখ ও সময় নির্ধারণ করেন তাহলে ইসরায়েলকে তা আগে থেকেই জানানো হবে। যেন ইসরায়েলও ইরানের পালটা হামলা থেকে বাঁচতে প্রস্তুতি নিতে পারে। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন প্রতিশ্রুতি নজিরবিহীন। এর আগে আরেক ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি অনুরোধ করে তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেবে ইসরায়েল। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েলের নেভাতিম এবং উদভা ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সামরিক পরিবহন বিমান অবতরণ করেছে। এর সঙ্গে ইসরায়েলে বাড়তি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও মিসাইল ইন্টারসেপ্টর মোতায়েন করা হয়েছে। গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ইসরায়েলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ সময় তিনি ইরানে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই হামলার জন্য ট্রাম্পকে তাগাদা দেন।