খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফটকের পাশে প্রতিদিন সকালে চায়ের দোকান খুলে বসেন শান্তি লাল চাকমা। দিনভর চা বানানো, ক্রেতাদের পরিবেশন আর দোকান সামলানোর মধ্য দিয়ে চলে তার জীবিকা। এই ছোট্ট দোকান ঘিরেই তার সংসার।
তবে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন হাসপাতালের পাশে বসে থাকলেও মনে তার আরও বড় একটি স্বপ্ন। মেয়ে শৈবাকে একদিন এই হাসপাতালেরই চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চান তিনি।
শৈবা এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার মতো চায়ের দোকানি বাবা-মায়ের সন্তানদের শিক্ষাগত সাফল্যের স্বীকৃতি দিতে এবং তাদের পড়াশোনায় উৎসাহ জোগাতে গত ২৭ অক্টোবর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাম্বার ওয়ান।
‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’ শীর্ষক এ আয়োজনে শৈবাসহ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া ১৩৫ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে তাদেরও সম্মানিত করা হয়। শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় ক্রেস্ট, সনদ, বৃত্তির নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তার জন্য টেন মিনিট স্কুলের বিভিন্ন একাডেমিক কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছে প্রত্যেক শিক্ষার্থী।
চায়ের দোকানের সীমিত আয় আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলার স্বপ্ন দেখেন অনেক বাবা-মা। তাদের সন্তানদের সেই স্বপ্ন পূরণে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিতে গত তিন বছর ধরে এ আয়োজন করে আসছে নাম্বার ওয়ান।
শান্তি লাল চাকমার কাছে মেয়ের এই সাফল্য এবং সংবর্ধনা পাওয়া বিশেষ আনন্দের। প্রতিদিন চায়ের দোকানে পরিশ্রম করে সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগান তিনি। মেয়ের অর্জনের স্বীকৃতি তার সেই পরিশ্রমেরও স্বীকৃতি।
শান্তি লাল বলেন, “আমি চাই, আমার মেয়ে চিকিৎসক হয়ে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করুক। আমি হাসপাতালের ঠিক বাইরেই চায়ের দোকান চালাই। একদিন মেয়েকে এই হাসপাতালে রোগীদের সেবা করতে দেখলে আমার অনেক ভালো লাগবে।”
মেয়ের সাফল্যে নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, “মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে, এখন সংবর্ধনাও পেল। বাবা হিসেবে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! আমি অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। মেয়ের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেটাই আমার চেষ্টা। সে যত দূর পড়তে চায়, আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করতে চাই।”
শান্তি লাল চাকমা বলেন, “আমি চাই, আমার মেয়ে ভালো ফলাফল করে চিকিৎসক হোক এবং আমার স্বপ্ন পূরণ করুক। আমি যে হাসপাতালের সামনে চায়ের দোকান চালাই, একদিন সেই হাসপাতালেই যদি আমার মেয়ে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে! তখন আমি গর্ব করে সবাইকে বলতে পারব, আমি একজন চায়ের দোকানি, আর আমার মেয়ে এই হাসপাতালের চিকিৎসক। মেয়েকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন।”
শৈবাও বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। এ বছর সে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছে। এখন তার লক্ষ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করা এবং পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার সুযোগ পাওয়া।
শৈবা বলে, “আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করে পানছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক হতে চাই। বাবা আমার জন্য অনেক পরিশ্রম করেন। আমি ভালোভাবে পড়াশোনা করে তার কষ্টের মর্যাদা দিতে চাই।”
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পাওয়া শিক্ষা উপকরণগুলোও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে চায় শৈবা। বিশেষ করে টেন মিনিট স্কুলের একাডেমিক কোর্সগুলো উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে তাকে সহায়তা করবে বলে আশা তার। এসব কোর্সের মাধ্যমে পড়াশোনার বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করতে চায় সে।
শৈবা বলে, “নাম্বার ওয়ান আমাকে সম্মাননা, বৃত্তি ও উপহারসামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি টেন মিনিট স্কুলের কোর্স করার সুযোগ দিয়েছে। আমি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পড়াশোনায় আরও ভালো করতে চাই। এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে চাই।”
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী শান্তি লাল। তিনি চান, শৈবা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করুক, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাক এবং একদিন মানুষের সেবা করার সুযোগ পাক। মেয়ের পড়াশোনার পথ যত দীর্ঘই হোক, তাকে সহযোগিতা করে যেতে চান তিনি।
এই আয়োজন সম্পর্কে এমজিআই এর চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. রহমতুল্লাহ খোন্দকার বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি পেলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বপ্ন পূরণে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বাবা-মায়ের সন্তানদের এই সাফল্য তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও ত্যাগের ফল। নাম্বার ওয়ানের এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের বাবা-মায়ের অবদানকে সম্মান জানাতে চাই। শিক্ষার্থীরা যেন আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পড়াশোনার পথে পিছিয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যে আমরা তাদের পাশে থাকতে চাই। ভবিষ্যতেও এই উদ্যোগ অব্যাহত রেখে আরও শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করা এবং তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করাই আমাদের লক্ষ্য।”