দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নির্মিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে থামছে না দুর্ঘটনা। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে গত সাড়ে চার বছরে এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জ অংশে ৫৮৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৫২ জন। আহত হয়েছে অন্তত ৯৫০ জন। বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতায় এক্সপ্রেসওয়েটি যেন পরিণত হয়েছে দুর্ঘটনার ফাঁদে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দ্রুতগতির কারণে একটি গাড়ির পেছনে অন্য গাড়ির ধাক্কা লাগার ঘটনা বেশি ঘটছে।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ সোমবারও সিরাজদিখানের নিমতলা এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় আট জন আহত হয়েছে । তাদের মধ্যে তিন জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে ঢাকামুখী লেনে হাওলাদার ফিলিং স্টেশনের সামনে মাওয়া থেকে ঢাকাগামী মহানগর এক্সপ্রেসের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা একটি গাড়ির পেছনে ধাক্কা দেয়। মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
হাসাড়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। দুর্ঘটনার পর বাসটি পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। চালক পালিয়ে গেছেন। এর আগে ২৪ অক্টোবর ভোরে শ্রীনগরের হাসাড়া এলাকায় দর্শনা পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে বাসটির সুপারভাইজার মো. রুকনুজ্জামান রঞ্জু (৫০), হেলপার চঞ্চল বিশ্বাস (২৪) এবং যাত্রী সালাহউদ্দিন আহম্মেদ সাকিব (৩২) নিহত হন। আহত হন আরো ১৬ জন । ভোরে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনা আবারও মহাসড়কে বাসের গতি ও চালকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ৩১ আগস্ট পদ্মা সেতুর ঢালে নিউ গ্রিন লাইন এক্সপ্রেসের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উলটে অন্তত ১৫ জন আহত হয় । তাদের মধ্যে আট জনের অবস্থা গুরুতর ছিল। ১৫ জুন কামারখোলা রেলওভার ব্রিজের ঢালে ভারী বৃষ্টিতে পিচ্ছিল সড়কে বরিশাল থেকে ঢাকাগামী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গার্ডরেল ভেঙে সার্ভিস রোডে কাত হয়ে পড়ে । এতে আহত হয় অন্তত ১৪ জন।
২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর হাসাড়া এলাকায় ইমাদ পরিবহনের একটি দ্রুতগতির বাস সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হানিফ পরিবহনের বাসে ধাক্কা দেয়। এতে এক জন নিহত ও তিন জন আহত হয়। একই বছরের ২৮ জুন শ্রীনগরে বাস ও মিনি ট্রাকের সংঘর্ষে চার জন নিহত এবং অন্তত ১৪ জন আহত হয়।
মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে ঝুঁকি নিতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্রুতগতির কারণে সামনে থাকা গাড়ির দূরত্ব ও অবস্থান বুঝতে না পারায় পেছন থেকে ধাক্কার ঘটনা ঘটছে বেশি । হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এ সড়কে অধিকাংশ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বেপরোয়া গতি। গতি নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত করতে পুরো এক্সপ্রেসওয়েতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও আইন ভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
এদিকে মহাসড়কে বাসের অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে বাস চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহমেদ খোকন বলেন, মহাসড়কে বাসের গতি নিয়ন্ত্রণে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সব পরিবহনে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।