৯০,০০০ উদ্যোক্তার ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়িয়েছে দেশব্যাপী সাইবার হাইজিন প্রশিক্ষণ

সাইবার হাইজিনকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএসএমই) জন্য, একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান হারে ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ করছে।

বুধবার ঢাকায় আয়োজিত ‘এপ্যাক সাইবার সিকিউরিটি ফান্ড’ (এসিএফ) প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে এই বার্তাটি উঠে আসে। ‘সাইবাররেডি: সেলিব্রেটিং দ্য জার্নি অফ সাইবার-সেফ এমএসএমই’ (CyberReady: Celebrating the Journey of Cyber-Safe MSMEs) শীর্ষক এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ‘দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন’ এবং ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সাইবার হুমকিগুলো ক্রমশ জটিল ও ব্যাপক হয়ে উঠার কারণে এমএসএমইগুলোকে সুরক্ষিত রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি। এই সুরক্ষা মানুষের জীবিকা রক্ষা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর আস্থা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।

২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের নভেম্বরের পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় অনলাইন ও অফলাইন সেশনের মাধ্যমে ৯০ হাজারেরও বেশি উদ্যোক্তাকে সাইবার হাইজিন বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ‘দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন’-এর ডিজিটাল ইকোনমি প্রোগ্রামের সিনিয়র ডিরেক্টর অ্যান্থিয়া মুলাকালা বলেন, সাইবার হাইজিনের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে; কারণ এটি মানুষের জীবিকা রক্ষা করে, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আস্থা সুদৃঢ় করে।

তিনি বলেন, “কোনো অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া, ফিশিং আক্রমণ বা প্রতারণামূলক লেনদেনের ফলে একটি ছোট ব্যবসার জন্য আয় কমে যেতে পারে, গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে, এমনকি ব্যবসার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। আমরা প্রায়শই বিষয়টিকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সাজেদা ফাউন্ডেশনের মতো স্থানীয় পর্যায়ে বিশ্বস্ত ও সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব থাকলে কোনো কর্মসূচির পরিধি, কার্যকারিতা এবং প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

সাজেদা ফাউন্ডেশনের সিনিয়র পরিচালক মো. নোমানুজ্জামান এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার ইজলাল হোসেন প্রকল্পটির মূল অর্জনগুলো তুলে ধরেন। তারা প্রশিক্ষণের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং এমএসএমই ও অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সাইবার হাইজিন সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই কর্মসূচির অবদানের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন।

তারা জানান, মাইক্রোফাইন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজে লাগানোয় এই উদ্যোগটি আরও কার্যকর হয়েছে। কারণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের আগে থেকেই গভীর আস্থা ও বোঝাপড়া রয়েছে, যা জ্ঞান বিনিময়ের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ফলপ্রসূ করেছে।

অনুষ্ঠানে “বাংলাদেশে এমএসএমইর জন্য সাইবার-সহনশীল ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন সাজেদা ফাউন্ডেশনের ডেপুটি সিইও ফজলুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মো. খাইরুল আনাম, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের ডিজিটাল স্কিলস বিষয়ক পরিচালক নাদিয়া সুব্রামানিয়াম এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সোহেল রানা। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন ইনস্পিরা অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড কনসাল্টিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনতাসির তাহমিদ চৌধুরী।

মুনতাসির তাহমিদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, সাইবার অপরাধ এখন কেবল বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্যই নয়, বরং উদীয়মান অর্থনীতির প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা ছোট ব্যবসার জন্যও একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্যানেল আলোচনার মাধ্যমে তিনি ছোট ব্যবসাগুলোর সাইবার ঝুঁকির মুখে পড়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে আরও নিরাপদ করার লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন।

ফজলুল হক বলেন, ‘সাইবার হাইজিন’ বা সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদী প্রকল্প হিসেবে না দেখে, নিয়মিত আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা প্রয়োজন। ক্ষুদ্রঋণ ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে সাজেদা ফাউন্ডেশনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, অনেক ব্যবহারকারীই পাসওয়ার্ড, অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করছেন।

তিনি আরও বলেন, সাইবার হাইজিন বজায় রাখা একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, কারণ প্রতারকরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। এই ধরনের প্রশিক্ষণ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি এটি প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ প্রবাসী কর্মীদের তথ্য ব্যবহার করে তাদের পরিবারকেও প্রতারকরা লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

অনুষ্ঠানে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমাজ মানুষকে প্রতারণা ও শোষণ থেকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক রীতি ও ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। আজ ডিজিটাল জগতেও ঠিক একই ধরনের সুরক্ষা প্রয়োজন। নিরাপত্তা কেবল আমাদের বাস্তব জীবনেই নয়, বরং অনলাইন জগতেও সমানভাবে জরুরি।”

এপ্যাক সাইবার সিকিউরিটি ফান্ড (APAC Cybersecurity Fund) হলো দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের একটি উদ্যোগ, যা গুগলের জনহিতৈষী সংস্থা Google.org-এর আর্থিক সহায়তায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করছে সাজেদা ফাউন্ডেশন।