প্রবাস থেকে দেশে ফিরে নতুন এনআইডি তৈরি করে সেই এনআইডি দিয়ে নিজের নামে প্রথম সিম কিনতে গিয়েই হতবাক হয়ে পড়েছেন আব্দুল মালেক (৫৬) নামে এক প্রবাসী। নতুন এনআইডি কার্ড হাতে পেয়ে সিম কিনতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ৭ দিন আগে হাতে পাওয়া সেই এনআইডি কার্ড দিয়ে ইতোমধ্যে কেনা হয়েছে ১৮টি সিম। পরে শুরু হয় দৌঁড়ঝাপ। এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটেও বিষয়টি এখনও সুরাহা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুনতে অবাক মনে হলেও এমন ঘটনাটি ঘটেছে দীর্ঘদিন পর সৌদি আরব থেকে বাড়িতে আসা চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের আব্দুল মালেকের সঙ্গে। তিনি ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ লুধুয়া গ্রামের মৃত নোয়াব আলী মোল্লার ছেলে।
প্রবাসী এই আব্দুল মালেকের এনআইডির বিপরীতে ইতোমধ্যে নিবন্ধিত হয়ে গেছে ১৮টি সিম। অথচ তার দাবি, তিনি নিজে একটি সিমও কিনেননি। এক কোম্পানির সিম বিক্রেতার কাছ থেকে তার এই এনআইডি ব্যবহার করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির ১৮টি সিম রেজিস্ট্রেশন করেছে জানতে পেরে বিভিন্ন অপারেটরের কাছে যোগাযোগ করে কিছু সিম বাতিল করেছেন। কিন্তু সব সিম বন্ধ করতে পারেননি। নিজের পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে সিম উত্তোলনের ঘটনায় তিনি এখন মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান।
ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক জানান, এর আগে তিনি এনআইডি তৈরি করেননি। এবার দেশে ফিরে দুই মাস আগে এনআইডির জন্য আবেদন করেন এবং এক সপ্তাহ আগে তিনি এনআইডি কার্ড হাতে পান। এরপর সুজাতপুর বাজারের একটি দোকানে নিজের এনআইডি ব্যবহার করে একটি সিম তুলতে গেলে দোকানদার জানান, তার এই এনআইডির বিপরীতে ইতোমধ্যেই ১৮টি সিম উত্তোলন করা হয়ে গেছে। এমন তথ্যে তিনি হতবাক হন।
পরে চাঁদপুরে বিভিন্ন সিম কোম্পানির কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সিম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তার এনআইডির বিপরীতে তিনটি অপারেটরের অধীনে ১২টি সিম পাওয়া যায়।
আব্দুল মালেকের দাবি, এর মধ্যে দুটি সিম চাঁদপুরে বাতিল করতে পেরেছেন। একটি নির্দিষ্ট অপারেটরের চারটি সিম বাতিল করতে তাকে ঢাকায় যেতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, একটি অপারেটরের ১২টি সিমের মধ্যে ৩টি বাতিল করা হয়েছে। বাকি সিমগুলো ধাপে ধাপে বাতিল করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক আরও বলেন, ‘আমি তো আমার এনআইডি দিয়ে একটা সিমও উঠাই নাই। তবে আমার এনআইডি দিয়ে এই সিমগুলো উঠাইলো কারা? কে তুলেছে কারা তুলেছে এর কিছুই আমি জানি না। এই সিমগুলো ভালো কি মন্দ কাজে ব্যবহার হচ্ছে, এর কিছুই আমি জানি না। ভবিষ্যতে আবার যদি ওই চক্র সিম তুলে নেয়, তখন আমি কী করব? কার কাছে যাব।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় শুধু নির্বাচন অফিসেই আঙুলের ছাপ দিয়েছেন। এর বাইরে অন্য কোথাও আঙুলের ছাপ দেইনি । তাহলে আমার পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে কীভাবে এতগুলো সিম নিবন্ধন করা হলো? এ দায় কার, কিন্তু এই সিমের মাধ্যমে কোন অঘটন ঘটলে এর দায়-দায়িত্ব তো আমাকেই নিতে হবে।
এ ঘটনায় থানায় যোগাযোগ করলে তাকে নির্বাচন অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক। তার আশঙ্কা, এসব সিম ব্যবহার করে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটালে হয়রানির শিকার হতে পারেন তিনি।
একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে তার অজান্তে এতগুলো সিম নিবন্ধনের অভিযোগ ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও সিম নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভুক্তভোগী মালেকের দাবি, শুধু সিম বাতিল নয়, ভবিষ্যতে যেন তার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নতুন করে কোনো সিম নিবন্ধন করা না যায়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মতলব উত্তর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শামসুজ্জামান ডলার বলেন, একজন নাগরিকের অজান্তে তার এনআইডির বিপরীতে ১৮টি সিম নিবন্ধনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও সিম নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কারা এসব সিম নিবন্ধন করেছে, তাদের শনাক্ত করা উচিত । পাশাপাশি ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সুলতানা এলিন বলেন, আমার চাকরি জীবনে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম দেখলাম। একজন ব্যক্তির আঙুলের ছাপ ছাড়া কীভাবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এতগুলো সিম নিবন্ধন করা সম্ভব, তা আমার বোধগম্য নয়। তবে আমাদের অফিসের সার্ভার হ্যাক করা সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি।
চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা বলেন, এটার দায়ভার আমাদের নয়। এটা দায়ভার নিতে হবে সিম কোম্পানিগুলোর।
চাঁদপুর বিটিসিএলের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসিব আহম্মেদ বলেন, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করি না। এটা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর বিষয়।
তবে সিম নিবন্ধনের বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরগুলোর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।