ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোনে অবৈধভাবে আড়িপাতার অভিযোগে পুলিশের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে।
৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার) দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আন্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রমাণ জব্দের পর ওই তিন কর্মকর্তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অবৈধভাবে যোগাযোগে আড়ি পাতা, অনুমোদন ছাড়া ইলেকট্রনিক সিস্টেমে প্রবেশ এবং ইলেকট্রনিক ডেটা মুছে ফেলার অভিযোগে সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ জেনারেল লিস্তিও সিগিত প্রাবোও, জাতীয় পুলিশের আইন বিভাগের প্রধান ইন্সপেক্টর জেনারেল আহরি সোনতা নাসুতি এবং জাতীয় পুলিশ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক ইন্সপেক্টর জেনারেল একো হাদি সান্তোসো।
তাদের পুলিশ সদর দপ্তরের আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থার প্রধান আসেপ সাফরুদ্দিন।
মঙ্গলবার রাতে জাকার্তায় পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাফরুদ্দিন বলেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী, সামাজিক নেতা, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মী এবং ব্যবসায়ীদের ফোন নম্বরে নিয়মবহির্ভূত ও অবৈধভাবে আড়ি পেতেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’
এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও কিংবা অভিযুক্ত তিন জেনারেলের কেউই প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফের কার্যালয়ের একজন মুখপাত্রের সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সাফরুদ্দিন জানান, এ ঘটনায় ১০ জন সাক্ষী ও তিনজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষীর বক্তব্য নিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া আলামত হিসেবে ১১টি মোবাইল ফোন, একটি আইপ্যাড এবং চারটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের অভিযোগ, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই অবৈধ আড়িপাতার ঘটনা ঘটে। ওই সময় লিস্তিও জাতীয় পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১০ সালের জাতীয় পুলিশবিষয়ক বিধিমালায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অভিযুক্তরা ফোনে আড়িপাতার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাফরুদ্দিন বলেন, কয়েকটি ফোন নম্বর যাচাই ছাড়াই ‘লফুল ইন্টারসেপশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলআইএমএস)-এ যুক্ত করা হয়েছিল। সম্প্রতি অভিযুক্তরা ওই ব্যবস্থা থেকে আড়িপাতার মাধ্যমে সংগ্রহ করা কথোপকথনের ফাইল মুছে ফেলার নির্দেশও দেন। প্রমাণ গোপন এবং আড়িপাতার কার্যক্রমের চিহ্ন মুছে ফেলতেই তারা এমনটি করেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে আড়িপাতার উদ্দেশ্য বা এর পেছনের কারণ সম্পর্কে এখনো কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, তদন্ত চলছে।
দেশটির আইন, মানবাধিকার, অভিবাসন ও সংশোধনাগারবিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী ইউস্রিল ইহজা মাহেন্দ্র বলেন, সক্রিয় দায়িত্বে থাকা তিন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের কোনো ইঙ্গিত পাননি তদন্তকারীরা।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাকার্তায় পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বিষয় নিয়ে ভাবুন। কোনো প্রেসিডেন্টের ফোনে আড়িপাতা হচ্ছে, কিংবা সরকারি মন্ত্রীরা নজরদারির আওতায় রয়েছেন, অথচ কেন এই আড়িপাতা হচ্ছে, তা আমরা জানি না। এটি কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়; যেকোনো দেশের জন্যই এটি গুরুতর ঘটনা।’
মাহেন্দ্র জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ার নতুন ফৌজদারি আইনের ২৫৮ ধারায় অভিযোগ আনা হবে। এ ধারায় ব্যক্তিগত ইলেকট্রনিক যোগাযোগে বেআইনি আড়িপাতা, রেকর্ড করা, অন্যত্র পাঠানো, পরিবর্তন, বাধাগ্রস্ত করা বা নজরদারি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া ফৌজদারি আইনের ৩৩২ ধারায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হতে পারে। এ ধারায় সর্বোচ্চ ছয় বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির ইলেকট্রনিক তথ্য ও লেনদেন আইনের ৩২ ধারায়ও তাদের অভিযুক্ত করা হতে পারে। এ ধারায় অনুমতি ছাড়া ইলেকট্রনিক তথ্য পরিবর্তন, ধ্বংস, মুছে ফেলা, স্থানান্তর বা গোপন করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ আট বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
সূত্র: আরব নিউজ