‘ইনশাআল্লাহ’ থেকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ঐতিহাসিক জয়ের পর ট্রাম্পকে খোঁচা আল-সাইয়েদের

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে পরাজিত করে মার্কিন সিনেটর হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুল আল-সাইয়েদ। এর মাধ্যমে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়লেন ৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। বুধবার ভোরে ডেট্রয়েটে দলীয় সমর্থকদের সামনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের বিজয় ঘোষণা করেন।

ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, নির্বাচনী লড়াই চলাকালে যেকোনো ফলাফলের বিষয়ে তিনি সবসময় ‘ইনশাআল্লাহ’ (আল্লাহ চাহেন তো) বলতেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আজ রাতে আমরা সেই ইনশাআল্লাহকে আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর)-তে রূপ দিতে পেরেছি।’

নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিরোধীরা তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করে এক নজিরবিহীন আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এমন এক আমেরিকার স্বপ্ন দেখে যা সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ, অথচ বাস্তবতার আমেরিকা সবার জন্য সমান জায়গা দেওয়ার মতো যথেষ্ট উদার।

পরাজিত রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আপনি বেছে নিয়েছিলেন ঘৃণা, আর মিশিগান বেছে নিয়েছে আশা।’ একই সঙ্গে তিনি রজার্সকে অবসর জীবন উপভোগের পরামর্শ দেন।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে আরবি স্নেহের সম্বোধন ‘হাবিবি’ উল্লেখ করে আল-সাইয়েদ বলেন, আগামী জানুয়ারিতে সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই ভ্যান্স তাঁকে শপথ পাঠ করাতে বাধ্য থাকবেন, যা রাজনৈতিক দিক থেকে এক উপভোগ্য বাস্তবতা। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কটাক্ষের জবাবে তিনি মন্তব্য করেন, তাঁর নাম উচ্চারণ করতে কষ্ট হলে শপথের পর থেকে ট্রাম্প তাঁকে সরাসরি ‘সিনেটর’ বলেই ডাকতে পারেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থলগ্নি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আল-সাইয়েদ জানান, তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষ প্রাথমিক ও মূল নির্বাচন মিলিয়ে ৩৫ কোটি (৩৫০ মিলিয়ন) ডলারের বেশি ব্যয় করেছে, যার মধ্যে শুধু প্রাইমারিতেই খরচ হয়েছে ৭ কোটি ডলার। তিনি এটিকে মিশিগানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় করার বিষয়টি উল্লেখ করে সংস্থাটিকে দুবার পরাজিত করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মার্কিন করদাতাদের অর্থে ফিলিস্তিনি শিশুরা যাতে নিজেদের পৈতৃক ভূমিতে নিহত না হয়—এমন বিশ্বাস কোনো ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন নাগরিকদের করের অর্থ যুদ্ধ, বর্ণবাদ বা আগ্রাসনে ব্যয় না করে নিজ দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোয় ব্যবহারের দাবি জানান তিনি।

রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব দূর করা, সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বা ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন নবনির্বাচিত এই সিনেটর। তিনি বলেন, শুধু একটি সিনেট আসন জয় করা মূল লক্ষ্য ছিল না; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে রূপান্তর করতে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করাই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য।

দীর্ঘ ১৯ মাসের নির্বাচনী লড়াইয়ে পাশে থাকার জন্য স্ত্রী সারা, সন্তান ও পরিবারের পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মী, দ্বিতীয় প্রজন্মের ইউনিয়ন সদস্য হিসেবে শ্রমিক সমাজ এবং দলের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান আব্দুল আল-সাইয়েদ। পরিশেষে তিনি সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আগামী ছয় বছর মানুষের অধিকার ও সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ওয়াশিংটনে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।