জাতিসংঘের প্রতিবেদন

বন্যা ও ভূমিধসে আক্রান্ত সাড়ে ৭৬ কোটি মানুষ, ৯৯ শতাংশই নিম্ন আয়ের দেশে

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বাড়ছে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ, বন্যা ও ভূমিধস। এসব দুর্যোগের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন দরিদ্র ও উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোর মানুষ।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত ‘অ্যাডাপটেশন গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: রেডি? নট.’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৭৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে ৯৯ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক।

বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে কম অবদান রাখা স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা করছে। অথচ জলবায়ু মোকাবিলায় অথচ বৈশ্বিক সহায়তার বণ্টনে এই বাস্তবতা বারবার উপেক্ষিত থাকছে।

২০২০ থেকে ২০২৫ সালের জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসের শিকার বিশাল জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল অঞ্চলের বাসিন্দা। কিন্তু এটি সমস্যার একটি দিক মাত্র। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহ বা অবজারভেশন ক্যাপাসিটির চরম ঘাটতি রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে চরম তাপপ্রবাহে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হলেও তার মাত্র ২৭ শতাংশ রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে। প্রাতিষ্ঠানিক ডেটার অভাবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির বহু তথ্য আন্তর্জাতিক নথিতে অঘোষিত থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

নদীমাতৃক বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌসুমী বন্যা, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও আকস্মিক প্লাবনের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ফেনী, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার ফিরে আসা প্রলয়ংকরী বন্যা সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করলেও আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণী মঞ্চে তা যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, প্রচলিত আন্তর্জাতিক মডেলে কেবল অবকাঠামোগত ও আর্থিক ক্ষতি গণনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বন্যার পর মানুষের বাস্তুচ্যুতি, মানসিক ট্রমা, স্বাস্থ্য সংকট, শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় এবং জীবিকা চিরতরে হারানোর মতো ‘অ-অর্থনৈতিক’ ক্ষতিগুলো মূল্যায়নের আওতায় আনা হয় না।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে ১১৮টি দেশের ৮৯ শতাংশ তাদের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনায় ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করলেও, মাত্র ৫৪ শতাংশ দেশের কাছে সুনির্দিষ্ট ডেটা সিস্টেম এবং ৩৮ শতাংশের কাছে প্রাসঙ্গিক আইনি কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় দুর্যোগের পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে বাধা সৃষ্টি হয়।

তহবিল সংকট ও বৈষম্য

প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’-এর প্রথম রাউন্ডে ১১৯টি উন্নয়নশীল দেশ মোট ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছিল। অথচ বিপরীতে প্রাথমিক তহবিল হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৪২ মিলিয়ন ডলার, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশন অর্থায়নের গতি প্রায় স্থবির। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বার্ষিক অভিযোজন চাহিদা যেখানে প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন ডলার (মডেল বিশ্লেষণে ৩২০ বিলিয়ন ডলার), সেখানে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে আসা আন্তর্জাতিক সরকারি অর্থপ্রবাহ মাত্র ২৮.২ থেকে ৩১.৭ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর (এসএইডিএস) ক্ষেত্রে বার্ষিক চাহিদা তাদের মোট জিডিপির ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমান হলেও সেই অনুপাতে অনুদান বা সহজ শর্তের ঋণ মিলছে না।

প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।  

যেমন-তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে স্থানীয় পর্যায় থেকে নিখুঁত ডেটা সংগ্রহ ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।

সহায়তা প্রাপ্তির জটিলতা হ্রাস: লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ছাড়ের দীর্ঘসূত্রিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর হাতে সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

যথাযথ ও শর্তহীন অর্থায়ন: উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে অনুদানভিত্তিক অভিযোজন অর্থায়ন বহুলাংশে বৃদ্ধি করতে হবে, যা কপ-৩০  বা পরবর্তী বৈশ্বিক সম্মেলনে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি।