যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল। নির্বাচনের এমন ফলাফলে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ায় যেমন অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি বিরোধীদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও দেখিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তাও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী ছিলেন না। থাকলে রিপাবলিকানরা বড় ব্যবধানে জয় পেতেন।
পরবর্তী সময়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা জানান তিনি। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে এর কিছুক্ষণ পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লাল রঙের ‘মাগা’ টুপির ছবি প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তার নির্বাচনী স্লোগানের পরিবর্তে টুপিটিতে লেখা ছিল ‘ভেটো’। কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো আইন আটকে দেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রতি এটি তার ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ট্রাম্পকে ইতোমধ্যে ‘লেম ডাক’ বা ক্ষমতা হারাতে থাকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিহিত করছেন।
লেম ডাক প্রেসিডেন্ট বলতে কী বোঝায়?
মার্কিন রাজনীতিতে ‘লেম ডাক’ শব্দটি সাধারণত এমন প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যার মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে এবং যার রাজনৈতিক প্রভাব আগের তুলনায় কমে গেছে। সাধারণত উত্তরসূরি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত সময়কে এ নামে অভিহিত করা হয়। এ সময়ে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্টের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা সীমিত হয়ে আসায় নীতিনির্ধারণে তার প্রভাবও কমতে থাকে।
তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে শব্দটি ভিন্ন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার দ্বিতীয় মেয়াদের এখনো দুই বছর বাকি থাকলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এত দিন রিপাবলিকান পার্টি হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সরকারের আইন প্রণয়নসংক্রান্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ট্রাম্প তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু এখন ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে। ফলে নিজেদের পছন্দের আইন ও নীতিমালা পাস করানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়কে ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এতে নিজ দলের আইনপ্রণেতাদের ওপর তার প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। কারণ, নির্বাচনী ফলাফলের পর রিপাবলিকানদের মধ্যেও তার রাজনৈতিক কৌশল ও নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ২০২৯ সালের জানুয়ারি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে তার সঙ্গে অবস্থান নির্ধারণে দলের অনেক নেতার আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এসব বিবেচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, মেয়াদের আরও দুই বছর বাকি থাকলেও ট্রাম্প ইতোমধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর পর্যায়ে প্রবেশ করছেন। তবে লেম ডাক প্রেসিডেন্ট মানেই যে তিনি পুরোপুরি ক্ষমতাহীন, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মেয়াদের শেষ পর্যায়েও অনেক প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং নিজেদের নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেছেন।
ট্রাম্পের হাতে এখনো যেসব ক্ষমতা রয়েছে
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে ট্রাম্পের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরোধীদের বাধার মুখে পড়লেও নির্বাহী আদেশ, পররাষ্ট্রনীতি এবং ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ তার রয়েছে।
এর আগেও কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকা অবস্থায় আইন প্রণয়নের জটিলতা এড়াতে নির্বাহী আদেশের আশ্রয় নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাহী বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয় ট্রাম্পের। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও দেয়াল নির্মাণের জন্য তার চাওয়া অর্থের তুলনায় কম বরাদ্দ দেয় কংগ্রেস। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন তিনি। পরে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সীমান্তপ্রাচীর নির্মাণের জন্য অন্যান্য খাতের বরাদ্দ থেকে বিপুল অর্থ স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা থাকলেও কংগ্রেস চাইলে যৌথ প্রস্তাবের মাধ্যমে তা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট সেই প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের ভেটো অকার্যকর করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও এককভাবে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ট্রাম্পের ভেটো বাতিল করা কঠিন হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, বিরোধীদের প্রস্তাবিত আইন আটকে দিতে ভেটো ক্ষমতা আরও বেশি ব্যবহার করতে পারেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটদের আনা সব ‘উন্মাদ’ আইন প্রণয়ন প্রস্তাবে তিনি ভেটো দেবেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, কয়েক মাস এভাবে ভেটো দেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা বুঝতে পারবেন যে এভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তখন দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা ও একসঙ্গে কাজ করার পরিস্থিতি তৈরি হবে।
আগের লেম ডাক প্রেসিডেন্টরা কী করেছেন?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে কিংবা কংগ্রেসে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি ও নির্বাহী বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়গুলোতে তারা নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) সেন্টার অন ইউএস পলিটিকসের গবেষক জেমস বয়েজ আলজাজিরাকে বলেন, রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনের ফলাফল নেতিবাচক হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখনো কংগ্রেসের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রেসিডেন্টকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে। ফলে মেয়াদের বাকি সময় ট্রাম্প এই ক্ষেত্রটিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।
এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কাছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নির্বাহী ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেন। জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামে পরিচিত ওই চুক্তির পাশাপাশি কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেন তিনি।
এ সময় নিজের বিতর্কিত স্বাস্থ্যসেবা আইন অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট (এসিএ) রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ওবামা।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও মেয়াদের শেষ দিকে পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনের আয়োজন করে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই আলোচনা সফল হয়নি।
পরিবেশ সংরক্ষণেও নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন ক্লিনটন। তাঁর উদ্যোগে প্রায় ৫ কোটি ৮৫ লাখ একর বনভূমি সংরক্ষণের আওতায় আসে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট ফেডারেল ভূমিতে বড় পরিসরে খনন ও বৃক্ষনিধন সীমিত করা এবং পানিসম্পদ রক্ষায় বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দেওয়ার পর তার প্রশাসন কার্যত মেয়াদের শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করে।
ক্ষমতা ছাড়ার আগে ছেলে হান্টার বাইডেনকে ব্যাপক পরিসরে ক্ষমা করেন তিনি। পাশাপাশি পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও সাবেক সহযোগীর জন্যও আগাম ক্ষমা ঘোষণা করেন।
এ ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে দেশটিকে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলার জন্য মার্কিন সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেন বাইডেন।
নবনির্বাচিত ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ করা ৬১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকায় মেয়াদের শেষ দিকে অবশিষ্ট অর্থ দ্রুত দেশটিকে সরবরাহের নির্দেশও দেন তিনি।
সব মিলিয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ ও রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। তবে নির্বাহী ক্ষমতা, ভেটো প্রয়োগ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকায় তাকে পুরোপুরি ক্ষমতাহীন বলা যাচ্ছে না। বরং আগামী দুই বছর কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি কতটা এগিয়ে নিতে পারেন, সেটিই হবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় পরীক্ষা।