উচ্চশিক্ষায় ফাঁকা থাকতে পারে ৮ লাখ আসন!

২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষায় ফাঁকা থাকতে পারে প্রায় ৫৬ শতাংশ আসন! ‘সহানুভূতির নম্বর’ বন্ধ, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক সংকটে শিখন ঘাটতি ও অতিমাত্রায় মুখস্থ নির্ভরতায় শিক্ষার্থীদের ভিত দুর্বল হওয়ায় গত ২২ বছরের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাশের হার সর্বনিম্ন। পাশ করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ শিক্ষার্থী। জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষায় মোট আসনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ৯২ হাজার।

সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রায় ৮ লাখ আসন ফাঁকা হবে। শতকরা হিসেবে ৫৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ আসন। গত তিন বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর প্রতিবছরই প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি হননি। কেউ চাকরিতে প্রবেশ করেন, কেউ ব্যবসায় যান, কেউ বিদেশে চলে যান। আবার অনেক ছাত্রীরই বিয়ে হয়ে যায়, তাদের অনেকেই পড়ালেখায় ফিরে আসেন না। যদি ঝরে পড়ার হার গত তিন বছরের মতোই থাকে তাহলে আসন খালি থাকতে পারে প্রায় ৯ লাখ আসন!

অবশ্য পাশ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবার বাড়বে। কারণ সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর সাপ্লিমেন্টারি বা পুনঃপরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এতে যারা উত্তীর্ণ হবে তারা এই শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন। এবার এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থী। বাকি ১ লাখ ৭৮ হাজার ২০৮ শিক্ষার্থী দুইয়ের অধিক সংখ্যক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।

এদিকে এবার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী পেলেও ভুগতে হবে নতুন বা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বর্তমানে দেশে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১০ লাখ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪ লাখের মতো আসন রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ ডিসেম্বর থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। বুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়ার কথা জানুয়ারিতে। ইতিমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবার ভর্তি যোগ্যতা শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিক্যালসহ শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অধিভুক্ত কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে তৈরি হচ্ছে বিপুলসংখ্যক আসন পূরণের চ্যালেঞ্জ।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও কি ভর্তির যোগ্যতায় শিথিলতা আসবে?: এবার এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় যে হারে জিপিএ ৫, জিপিএ ৪ ও জিপিএ ৩-এর বেশি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। জিপিএ-৪ এর বেশি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৮২ হাজার ৭২০। জিপিএ ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ পাওয়া শিক্ষার্থী আছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮২৬ জন। এছাড়া জিপিএ-৩ থেকে সাড়ে ৩ দশমিক ৫০ এর মধ্যে আছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৭১ জন। আর জিপিএ-৩ এর নিচে পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। ৩ এর নিচে জিপিএ পাওয়া এসব শিক্ষার্থী দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তির আবেদনের সুযোগ পাবে কিনা। এর প্রভাবেও এবার ভর্তির প্রতিযোগিতা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতায় শিথিলতা আসতে পারে কি না, শনিবার ফল প্রকাশের দিন সেই প্রশ্ন করা হয়েছিল শিক্ষামন্ত্রীকে। জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কতটুকু ‘কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ’ করে শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে, এটা তো তাদের নিজস্ব বিষয়, তারা সেভাবে চিন্তাভাবনা করবে। তবে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সবাই পাবেন।’ বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আসন ফাঁকা থাকলেও ভর্তির যোগ্যতায় শিথিলতা আনা ঠিক হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনই যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষার্থী বের করতে পারছে না। সেখানে যদি আমরা আরো ঘাটতি থাকা শিক্ষার্থীদের শর্ত শিথিল করে ভর্তি করি, আমাদের শিক্ষার মান খারাপ হবে। আমরা শুধু সার্টিফিকেটধারী বেকার তৈরি করব। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যারা খারাপ করেছে, তাদের পেছনে ইনভেস্ট করাটা বেকার তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের আসনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং বর্তমানে চালু ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে স্নাতক পর্যায়ে মোট আসন রয়েছে ১৪ লাখ ৯২ হাজার ২৮৮টি। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪ লাখ ১০ হাজার আসন রয়েছে। সামগ্রিকভাবে আসন উদ্বৃত্ত থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসগুলোতে ভর্তির প্রতিযোগিতার চিত্র হবে সম্পূর্ণ আলাদা। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে স্নাতক পর্যায়ে মোট আসন রয়েছে ৬৩ হাজার ৬৫৬টি। অর্থাত্ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় এই আসনসংখ্যা অনেক কম। হিসাব অনুযায়ী, পাশ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৯ দশমিক ৮ শতাংশের জন্য রয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে পড়ার সুযোগ। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অধিভুক্ত কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আসনসংখ্যা বিশ্লেষণেও এই প্রতিযোগিতার চিত্র পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে আসন রয়েছে ৬ হাজার ১২৫টি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ হাজার ৯৫৬টি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ হাজার ৩৩টি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৮৪৮টি। প্রকৌশল শিক্ষায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আসন ১ হাজার ৩০৯টি, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ৯৩১টি, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ১ হাজার ২৩৫টি, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ১ হাজার ১০৫টি এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) ৭৮০টি।

এদিকে কৃষিশিক্ষায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৩৪টি, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১০টি, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০৫টি, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩১টি এবং খুলনা ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে ১৫০ ও ৮৪টি আসন রয়েছে। আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬৩৬টি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ১০৯টি, হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ১০০টি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬১১টি এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ৯৫৭টি আসন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সীমিত আসনের বিপরীতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৪০ হাজার ৮৪ জনসহ ভালো ফল করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবেদন থাকায় প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পছন্দের বিষয় ও প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেতে মেধাতালিকায় অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।