এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ সক্রিয় থাকে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনের নৌবহরের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জাহাজের সংখ্যার দিক থেকে চীনের নৌবাহিনী ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। একসময় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরিচিত চীনা নৌবাহিনী এখন এশিয়ার বাইরেও নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করছে। ফলে বৈশ্বিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তির অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন নৌবহরে বর্তমানে ৪০০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রয়েছে। জাহাজের সংখ্যায় এটি মার্কিন নৌবহরের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বড়। আধুনিক সময়ে শান্তিকালীন কোনো দেশের নৌবাহিনীর অন্যতম বৃহৎ সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই অগ্রগতিকে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাতা দেশ হওয়ায় দ্রুত যুদ্ধজাহাজ তৈরির সক্ষমতাও অর্জন করেছে চীন।
চীনা নৌবাহিনীর তৎপরতা এখন এশিয়ার বিস্তৃত জলসীমায় ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ানের আশপাশের এলাকা, ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল এবং জাপানের দক্ষিণ উপকূলসংলগ্ন সমুদ্রপথে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে দেশটির যুদ্ধজাহাজ। এর পাশাপাশি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে অভিযান চালানোর পাশাপাশি এডেন উপসাগরেও নৌবাহিনীর উপস্থিতি বজায় রেখেছে বেইজিং।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাংহাইয়ের কাছাকাছি দ্বীপগুলোতে অবস্থিত চীনের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোতে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি হয়। একই শিল্প অবকাঠামো ব্যবহার করে সেখানে ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট ও বড় উভচর যুদ্ধজাহাজের মতো আধুনিক সামরিক জাহাজও নির্মাণ করা হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের সক্ষমতা
শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়িয়েছে চীন। এর মাধ্যমে দেশের উপকূল থেকে দূরে নৌবাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৭৮ দিন সমুদ্রে অবস্থানের পর দেশটির ৪৮তম এসকর্ট টাস্কফোর্স কিংদাও বন্দরে ফিরে এসেছে। দীর্ঘ এই অভিযানে বহরটি ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করেছে। এ সময় এডেন উপসাগর ও আশপাশের জলসীমায় ৪২৩টি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়েছে তারা। বহরটিতে ছিল একটি আধুনিক ডেস্ট্রয়ার, একটি ফ্রিগেট ও একটি সরবরাহকারী জাহাজ।
চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশটির নৌবাহিনীর টাস্কফোর্সগুলো এখন নিয়মিতভাবে ৩০০ দিনের বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করতে পারছে। উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত নাবিক এবং কার্যকর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
এ ক্ষেত্রে জিবুতিতে চীনের সহায়তা ঘাঁটি এবং কম্বোডিয়ায় নতুন যৌথ স্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব স্থাপনার মাধ্যমে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেও যুদ্ধজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
দূরপাল্লার অভিযান ও সাবমেরিন সক্ষমতা
চীনের উপকূলীয় অঞ্চলে নৌবাহিনীর তৎপরতা বাড়ার পাশাপাশি দূরবর্তী সমুদ্রেও অভিযান পরিচালনার প্রবণতা বেড়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রুজারের সমান আকারের বড় চীনা যুদ্ধজাহাজ এখন দেশের উপকূল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে বিমানবাহী রণতরিগুলো যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিমানের কাছাকাছি অবস্থান থেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের ঘটনাও ঘটছে। এর পাশাপাশি সাবমেরিন তৈরির কার্যক্রমও সম্প্রসারণ করেছে বেইজিং।
মার্কিন মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে চীনা সাবমেরিনগুলো নিয়মিতভাবে ভারত মহাসাগর এবং সম্ভবত আটলান্টিক মহাসাগরেও অভিযান চালাতে পারে। এমনটি হলে এশিয়ার বাইরেও চীনের সামুদ্রিক সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশটির নৌবাহিনীর সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। জাতীয় শক্তি প্রতিষ্ঠায় সামুদ্রিক সক্ষমতাকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। ইতিহাসে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্রের উত্থানে কীভাবে ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন নৌশক্তির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যু এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। তাইওয়ানকে সমর্থন দেওয়ায় জাপানের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বেইজিং। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন জলসীমা নিয়ে ফিলিপাইনের সঙ্গে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে চীন। দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টিও পুরোপুরি নাকচ করেনি দেশটি। তবে বেইজিংয়ের বক্তব্য, তারা শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলনকেই অগ্রাধিকার দেয়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে চীন আগামী বছরের মধ্যেই তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
অন্যদিকে জাহাজ নির্মাণ ও নৌবহরের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের ব্যবধানও আলোচনায় এসেছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ খাতে বাজেট দ্বিগুণ হয়েছে। তবে ২০০৩ সালের তুলনায় দেশটির নৌবহরের আকার বাড়েনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ভিত্তিও তুলনামূলকভাবে সীমিত। দেশটির পতাকাবাহী জাহাজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের পরিমাণও কম।
এ ছাড়া নতুন ফ্রিগেট নির্মাণ, পুরোনো ক্রুজারগুলোর কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং বিপুলসংখ্যক লিটোরাল কমব্যাট শিপ পরিচালনার জন্য নেওয়া মার্কিন কর্মসূচিগুলো বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
চীনের দ্রুত নৌবহর সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক কৌশলের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দুই দেশের সামরিক উপস্থিতি, জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।