২০৩০ সাল নাগাদ সর্বজনীন চক্ষুসাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে মাল্টিসেক্টরাল পদক্ষেপের আহ্বান

বাংলাদেশের চক্ষু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন চক্ষু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে রোববার ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, চক্ষু স্বাস্থ্যকে কেবল একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটিকে উন্নয়নের একটি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং এর জন্য শিক্ষা, পরিবহন, কৃষি ও সমাজকল্যাণের মতো বিভিন্ন খাতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘মাল্টিসেক্টরাল ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম অন আই হেলথ ইন বাংলাদেশ’-এর আয়োজনে ‘ভ্যালিডেশন অফ দ্য মাল্টিসেক্টরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর আই হেলথ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই আহ্বান জানানো হয়। এই উদ্যোগে সহায়তা প্রদান করে ইউএনডিপি বাংলাদেশ, দ্য ফ্রেড হলোস ফাউন্ডেশন, সাইটসেভার্স এবং হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্য বিষয়ক গণসচেতনতা তৈরিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কেবল সরকারি উদ্যোগ বা চিকিৎসা সেবা যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, “আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি ছাড়া আমাদের দেশের মানুষকে বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হবে।” তিনি চিকিৎসকদের কেবল চিকিৎসক হিসেবে নয়, বরং মানবতার সেবক হিসেবে নিজেদের বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

তিনি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও জনশিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, অনেক রোগ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়মতো শনাক্ত ও প্রতিকার না করা হলে এগুলো গুরুতর জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ডায়াবেটিস থেকে অন্ধত্ব, কিডনি বিকল হওয়া এবং স্ট্রোকের মতো সমস্যা হতে পারে; তাই সমন্বিত ও বহুমুখী স্বাস্থ্যসেবা পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত দলের (মাল্টিডিসিপ্লিনারি গ্রুপ) মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান, যাতে মানুষ ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতার মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। এছাড়া, তিনি চিকিৎসক সম্প্রদায়কে গ্রামীণ জনপদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

সাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এএনএম মঈনুল ইসলাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইওএইচ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ মাহবুব উল কাদির ‘মাল্টিসেক্টরাল অ্যাকশন প্ল্যান ২০২৬-২০৩০’-এর ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন অরবিস ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ব্লাইন্ডনেস (আইএপিবি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ার ডা. মুনির আহমেদ এবং আইএনজিও ফোরাম অন আই হেলথ-এর চেয়ার ও সাইটসেভার্স-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও।

মাল্টিসেক্টরাল ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম অন আই হেলথ-এর চেয়ার মো. মহসিন স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এছাড়া অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ফ্রেড হলোস ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ক্লাস্টার ডিরেক্টর মুসাব্বির আলম।

অনুষ্ঠানে ড. মুনির আহমেদ বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে চক্ষুস্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক প্রতিশ্রুতিগুলো অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ২ কোটি মানুষের চোখ পরীক্ষা করা, ১ কোটি চশমা প্রদান করা এবং ১০ লাখ ছানি অপারেশন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে – সেটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, পেশাজীবী সংগঠন এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও জোরালো সহযোগিতার প্রয়োজন; পাশাপাশি চক্ষু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।”

চক্ষু সেবা পরিষেবার জন্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং গুণমান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডা. মুনির। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে অপটোমেট্রিস্ট ও সংশ্লিষ্ট চক্ষু স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি কাউন্সিল গঠন করা, জাতীয় পর্যায়ে গুণমান নিশ্চিতকরণ নির্দেশিকা তৈরি করা, ক্লিনিক্যাল প্রোটোকল ও ভিশন সেন্টারের নির্দেশিকাগুলোকে মানসম্মত করা এবং এনজিও ও বেসরকারি খাতের চক্ষু হাসপাতালগুলোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে সুবিন্যস্ত করা।

গত ২ নভেম্বর অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল সামিট ফর আই হেলথ’-এর প্রসঙ্গ টেনে ডা. মুনির সর্বজনীন চক্ষু স্বাস্থ্যের পক্ষে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। এই সম্মেলনে ১১৫টি দেশ থেকে ১৯১টি প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪৮টি দেশের সরকার তাদের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চক্ষু স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ প্রদানের অঙ্গীকার করেছে।

অমিত রেজিনা রোজারিও সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানান। তিনি সরকারি মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি খাতকে দেশের চক্ষু সেবা বিষয়ক লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব সক্রিয়ভাবে কাঁধে তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় অগ্রগতি অর্জনে নতুন প্রণীত এই কর্মপরিকল্পনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুসাব্বির আলমও জোর দিয়ে বলেন যে, চক্ষুস্বাস্থ্য কেবল একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমুখী উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, যার সমাধানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের উদ্যোগটি ২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম ‘গ্লোবাল আই হেলথ সামিট’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি আরও জানান, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রায় ১২৯ থেকে ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন।