জাপানের অর্থনীতির জন্য গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এ প্রসঙ্গে যে কোনো জাপানিকে কিছু বলতে বললে শুরুতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। অর্থনৈতিক মন্দার দায়ে এ সময়টা তাদের কাছে ‘কালযুগ’ হিসেবে চিহ্নিত। কিঞ্চিত হলেও ঐশ্বর্য হারানোয় অর্থনীতিবিদদের কাছে এ দুই দশক হচ্ছে ‘লস্ট ডিকেডস’। কিন্তু অনেক বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা তা মানতে নারাজ। তাদের কাছে এ দুই দশক লস্ট ডিকেডস তো নয়ই; উপরন্তু বহু কিছু অর্জনের দশক বা ‘গেইনড ডিকেডস’, বিশেষত সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সামাজিক পরিপক্বতা অর্জনের দৃষ্টিকোণ থেকে। তদুপরি সেখানে মাঝারি আয়ে লিঙ্গগত মজুরি-বৈষম্য এখন পর্যন্ত প্রায় ২৭ শতাংশ, যা কিনা অধিকাংশ উন্নত দেশেই অকল্পনীয়। বিয়ের পর জাপানি মেয়েদের ক্যারিয়ার গঠনকে নিরুত্সাহিত করা হয়। সেখানকার শ্রমশক্তিতে বিদেশিদের প্রতিনিধিত্ব ২ শতাংশেরও কম, যেটি ইউরোপীয় দেশগুলোয় গড়ে ১০ শতাংশ আর যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় ১৬ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমশক্তিতে নারী ও অভিবাসীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাটা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। মারাত্মক মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধির নিশ্চলতা ও বিশ্বের সর্বোচ্চ সরকারি ঋণ— এই তিন বিষয় ২২ বছর ধরে জাপানের অর্থনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রী শিঞ্জো অ্যাবের মাত্রিক সহজতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের বৈপ্লবিক নীতি উপরোল্লিখিত তিন সমস্যার গায়ে আঁচড়ও কাটতে পারছে না। প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম প্রজনন হার (প্রতি নারীতে ১.৪) এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ গড় আয়ুর (৮৩.৭ বছর) মিশ্রণের অর্থ হচ্ছে, জনসংখ্যাগত কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করছে জাপান। অর্গানাইজেশান ফর ইকোনমিক কো-অপারেশান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)-এর তথ্যানুসারে জাপানে সন্তান জন্মদানের পর মাত্র ৩৮ শতাংশ নারী তাদের চাকরি চালিয়ে যান। মেয়েদের ওপর থাকা প্রবল সামাজিক প্রত্যাশার চাপ এবং শিশুসেবা কেন্দ্রের অপ্রতুলতাই এর মূল কারণ। জাপানের চড়া শ্রমের মূল্যের জন্য শিশুসেবা পাওয়া ও আয়া রাখার বিষয়টি আমজনতা চিন্তাও করতে পারে না। এসব দিক চিন্তা করেই গৃহকর্মী হিসেবে ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর নাগরিকদের অনুমোদন দেওয়ার নিয়মকানুন শিথিল করা হয়েছে অতিসম্প্রতি। জাপানিদের তুলনায় ফিলিপিনোরা অনেক কম খরচে শিশুযত্ন ও গৃহকর্মী সরবরাহ করতে পারে। প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহযোগিতা পেলে জাপানি নারীরাও যে অনেক কিছু করে দেখাতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হচ্ছে রেনহো মুরাতা। দেশের প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান নেতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তিনি দলীয় নেতৃত্বের শীর্ষে আরোহণ করেছেন দেশের প্রথম নারী হিসেবেই নয়, শরীরে ‘বিশুদ্ধ জাপানি রক্ত’ প্রবাহিত না হওয়া সত্ত্বেও একমাত্র তিনিই এমন কৃতিত্বের দাবিদার। আধা তাইওয়ানিজ ও আধা জাপানিজ মুরাতা সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়ানোর আগে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সম্প্রচার সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলেন এবং এ পেশায় তার ক্যারিয়ার ছিল বর্ণাঢ্য। মিশ্র পরম্পরার জাপানিদের জন্য বর্ধিষ্ণু পদ ও সম্মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গত গ্রীষ্মকালটা ছিল ল্যান্ডমার্কস্বরূপ। এর মধ্যে জাপান দেখে ফেলেছে দেশের প্রথম প্রমিলা গভর্নর ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্বাচন। আংশিক ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রিয়াঙ্কা ইওশিকাওয়া মনোনীত হয়েছেন জাপানের সেরা সুন্দরী। এত কিছুর পরও জাপানি নারীদের ডাকা হয় অবমাননাকর ‘হাফু’ হিসেবে, যার অর্থ অর্ধেক।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক পর্যন্ত নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া হতো যে, পরিবারের তরুণ সদস্যটি পারিবারিক ব্যবসাতেই যুক্ত হবে। ১৯৯০-এর অর্থনৈতিক পতনের পরই পালটাতে শুরু করে অনেক কিছু। সর্বশেষ অর্থনৈতিক পতনের পর জাপানের তরুণ-তরুণীদের মধ্য থেকে উত্থিত হয় এক নতুন শ্রেণি, ‘ফ্রিটার্স’ নামে যারা পরিচিত। কলেজ শেষ করার পর নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি থেকে বঞ্চিত হয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ক্যারিয়ার গঠনে সৃজনশীল পন্থা উদ্ভাবনে ব্যস্ত হতে শুরু করে। —ফরেন পলিসি অনুসরণে