g রেজাউল করিম খোকন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমদানি-রপ্তানি তথা বৈদেশিক বাণিজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ এর মাধ্যমে গোটা অর্থনীতিতে সচলতা বজায় থাকে। বাংলাদেশে আমদানির তুলনায় রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ কম। তাই রপ্তানি বৃদ্ধি বা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ভালো প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য শুভ সংবাদ। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দেশের আমদানি সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেশি হলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকে। নিজস্ব মুদ্রা অর্থাত্ টাকার মান বাড়ে। তখন আমদানি পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকে বা কমে যায়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। ইদানিং বৈদেশিক বাণিজ্য ঘিরে জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গোটা অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্বস্তি দানা বেঁধে উঠছে। অর্থপাচার, শুল্ক ফাঁকিসহ নানা অসত্ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে বিল অব লেডিং এয়ারওয়ে বিল, ট্রাক রিসিপ্টের মতো জরুরি নথি বা দলিল জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের এক গবেষণায় দেখা যায়, ব্যাংকে জমা দেওয়া পরিবহন সংক্রান্ত নথির ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রেই মূল কপি ও অনুলিপির মধ্যে অমিল পাওয়া গেছে। কার্গো ক্যারিয়ার বা পণ্য পরিবহন সংস্থার পরিচিতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে। ৮০ শতাংশ বিল অব লেডিংয়ের যথার্থতা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয় ব্যাংকারদের। দিনে দিনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটার পাশাপাশি নানা ধরনের জালিয়াতির ঘটনাও বেড়েছে। এসব অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও জালিয়াতির ধরনে পরিবর্তন আসায় এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ব্যাংকাররাও ধরতে পারছেন না এসব জালিয়াতি। কারণ ব্যাংকাররা জালিয়াতির ধরন সম্পর্কে কোনো ধারণা লাভ করতে পারছেন না আগে থেকে। ফলে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চরমভাবে। এর ফলে রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে প্রত্যাশিত রাজস্ব আহরণ থেকে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জ বেড়েছে, এটা মানতেই হবে সবাইকে। এসব কারণে ব্যাংকারদের আরো সতর্কতা অবলম্বন একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিল অব লেডিং, এয়ারওয়ে বিল, ট্রাক রিসিপ্টের ক্ষেত্রে সতর্ক ও সাবধান হতে হবে ব্যাংকারদের। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্রেডিট রিপোর্টের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডার (সেন্ট্রাল ডাটাবেজ) তৈরি করতে সক্ষম হলে ঝুঁকি ও খরচ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সেন্ট্রাল ডাটাবেজ থাকলে কোনো ভুয়া ক্রেডিট রিপোর্ট সরবরাহের সুযোগ থাকবে না। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে, কমবে অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনাও। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা সুস্পষ্ট হয়েছে যে দিনে দিনে বৈদেশিক বাণিজ্যে জালিয়াতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও অনিশ্চয়তাবোধ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অর্থ পাচারের ৮৩ শতাংশ ঘটছে বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক যদি সতর্ক ও সাবধানী হয় তাহলে অনিয়ম ঘটার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার কতোটা বেড়েছে তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। অর্থপাচারের সম্ভাব্য পথগুলো খুঁজে বের করা এবং তা কঠোরভাবে বন্ধে সরকারের আরো বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত উদ্যোগগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী সুফল বয়ে আনতে পারেনি।
বর্তমানে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও সঠিকতা নিশ্চিত করেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরো স্বচ্ছ ও মসৃণ করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং এ ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি জোরদার করা জরুরি।
০