গাজ ও গুঁড়া দুধ

সামনে ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক পিকনিক। জোরসে চলছে প্রস্তুতি। সকল স্যার-ম্যাডামকে প্রায় দাওয়াত করা শেষ। বাকি আছেন শুধু ডিপার্টমেন্টের প্রথম শিক্ষকজুটি বদরুল স্যার আর তারিন ম্যাডাম। স্যার আর ম্যাডাম সদ্য ইরান থেকে ফিরেছেন। আমরা পাঁচ বর্ষের পাঁচজন প্রতিনিধি গেলাম বদরুল স্যারের বাসায়।

সিঁড়ি ভেঙে দ্বিতীয় তলায় উঠেছি। কলিংবেল চেপে দাঁড়িয়ে আছি। নিজেদের মধ্যে মুখপোড়ার মতো অপরাধবোধ। না আমি স্যারকে কিছু বলতে পারব না। তারা মাত্রই দীর্ঘ এক সফর শেষ করে এলেন। এরকম নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছি। এমন সময় বাসার দরজা হা মেলে যায়। আমরা থতমত খেয়ে যাই। স্যার তো অবাক। আরে তোমরা! ভেতরে আসো। বসো। তা কী মনে করে সদলবলে?

আমরা একেকজন আরেকজনের মুখপানে চাওয়াচাওয়ি করছি। এমন সময় ম্যাডামের আগমন। সহাস্যবদনে বলে উঠলেন, ‘বাব্বা! আমার অনেক ছাত্র দেখি বাসায় হাজির। তোমরা বসো। স্যারের সাথে কথা বলো। আমি আসতেছি।’

দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে গমন করলেও তা বলা হয়ে উঠছে না। মাস্টার্সের বড়ভাই আফজাল হোসাইন আমাকে তার ডান হাতের কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে আলাপ পাড়তে বললেন। আমি সাহস করে বলেই ফেললুম। ভারিক্কী ধরনের মানুষ বদরুল স্যার বললেন, ‘আচ্ছা, তোমাদের ম্যাডামকে বলে দেখি তার মত কী?’

ম্যাডাম হাতে ট্রে নিয়ে দ্বিতীয়বার হাজির হলেন। ট্রেতে পূর্বে অদেখা পাঁচপদের কিছু বস্তু। পাঁচটি বাটিসমেত ট্রেটি আমাদের মাঝখানে রেখে বললেন, নাও কিছু মুখে দাও। কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, ইরানি বড়বড় কিশমিশ আর দু প্রকারের নাম বললেন ম্যাডাম। একটি পদের নাম ছিল গাজ। কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, কিশমিশ আর নাম ভুলে যাওয়া সেই আইটেম আমরা গপাগপ গিলছি। ম্যাম ও স্যার দুজন দুজনের দিকে অষ্টম আশ্চর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশের জায়গা মনে করে তাকিয়ে আছে। ম্যাম বললেন, ‘এই গাজগুলি ইস্ফাহান থেকে কেনা। ইস্ফাহানের গাজ সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত। শোনো, এগুলো ফ্রিজে ছিল, খেয়ে নাও।’ আমরা যে যার মতো গাজ তুলে নিয়ে হাতে মুঠ করে রেখে দিলাম। আড়চোখে তাকাচ্ছিলেন ম্যাডাম।

স্যার-ম্যাডামকে পিকনিকের দাওয়াত দিয়ে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে পড়ি আমরা। সবার বাম হাতই মুষ্টিবদ্ধ। আমরা পকেটে থাকা মোবাইল বের করে প্রেমিকাদের ফোন করা আরম্ভ করি, ‘শুনছ জানু, তোমার জন্য স্পেশাল জিনিশ গাজ নিয়ে আসতেছি।’

যে যার মতো দেখা করার জায়গায় ছুটে চলি। আমিও পৌঁছে যাই লক্ষ্যে, প্রিয়ার হলের সামনে।

বিশাল দেবদারু গাছের পাশের ছোট্ট নিমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। হন্তদন্ত হয়ে জানুর আগমন, ‘কই আমার জন্য নিয়ে আসা স্পেশাল জিনিশ গাজ?’

জানুর সামনে বাঁহাত নিয়ে এসে মুঠো খুলেছি। আর অমনি জানু ক্ষেপে আগুন। আকাইম্যার ঢিবি একটা! এটা কী হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছ শুনি? এটি তো মাত্র একখানা প্লাস্টিক কাগজের টুকরা!’

অমনি আমার ম্যাডামের সেই কথা মনে পড়ে গেল যে, এই গাজ ফ্রিজে ছিল। কিছুটা চকবার ধরনের এই মিষ্টান্নটি স্যার-ম্যাডামের বাসা থেকে প্রিয়ার মুখে পৌঁছার আগেই মুষ্টিবদ্ধ হাতের ফাঁকফোকরের বাতাসের প্রেমে গলে যেয়ে বিলীন। তাই প্রেয়সী আমার প্রতি প্রেমে গলে না গিয়ে অগ্নিশর্মা রূপ ধারণ করল।

জানুর ঝাঁঝালো কথা, ‘কোন দুঃখে যে তোমার মতো এক আঁতেলকে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম! আর তার ফলই তো আজ, দিতে চাইলা গাজ। দিলা গাজের ছাল, অন্যদিকে ঘুরাও তোমার প্রেমের হাল।’

 

২.

ঝারি খাওয়া মন নিয়ে হলে ফিরেছি মাত্র। রুমমেট গাট্টু ওয়াজেদ। তাকে দেখে মনে হবে যেন কোনো গাছের গুঁড়ি। সারাদিন শুধু খাওয়া আর খাওয়াই তার কাজ। কিছু সময় পর সে বলে উঠল, ‘নাকিব ভাই, আপনি নাকি কী গাজ না গজ নিয়ে আসলেন স্যারের বাসা থেকে। দেন একটু খাই।’

বাজখাঁই গলায় জানতে চাইলাম, ‘কে তোমাকে বলল একথা?’ শিবলী পাশের এসএম হলে থাকে। তার কাছ থেকেই নাকি জেনেছে গাট্টু ওয়াজেদ। গাট্টুকে ছাফ ছাফ জানিয়ে দিলাম যে, ‘ওই গাজ-গজ কিছুই নাই। তুমি আর মাথা খারাপ কইরো না।’

ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ি। কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন অনুভব করছি। ওই অবস্থাতেই মিনিট দুয়েক অতিবাহিত হয়েছে। ‘ওরে বাপরে মইরা গ্যালামরে! আমার মুখখান পুইরা গ্যালোরে! ও নাকিব ভাই, এই ডানোর কৌটায় আপনি কী রাখছেন? মরে গেলামরে! বাপরে!’ গাট্টু ওয়াজেদের চরম ভয়ানকমার্কা কথা শুনে ধড়পড় করে জেগে উঠি আমি।

দেখি সে ওয়াক থু, ওয়াক থু করছে আর বলছে, ‘মইরা গ্যালামরে! পুইরা গ্যালোরে!’ ওর সামনে দেখি আমার বাড়ি থেকে আনা হলুদিয়া রঙের ডানোর কৌটার মুখ খোলা। এবার বাড়ি থেকে ইউনিভার্সিটি আসার সময় মা ডানোর কৌটোটি ভরে হুইল পাওয়ার হোয়াইট দিয়েছিল।

কিশোরগঞ্জ