বিশ্বের অক্সিজেনের ২০ ভাগ আসে আমাজন জঙ্গল নামে পরিচিত দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদী বিধৌত অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল বনভূমি থেকে। ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটারের অরণ্য ৯টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত যা ইউরোপের চেয়েও বড়ো। ব্রাজিলে ৬০ ও পেরুতে ১৩ ভাগ। বাকি অংশ কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম ও ফরাসি গায়ানায়। এক মার্কিন বিজ্ঞানী অনেক আগেই আমাজন অরণ্য আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। এখন সেটাই হতে চলেছে! তবে ‘ধরিত্রীর ফুসফুস’ খ্যাত আমাজনের আগুন রাজনীতির গায়েও লেগেছে। চাপে পড়েছেন ব্রাজিলের ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট। এমনকি জি-৭ সম্মেলনও উত্তপ্ত আমাজনকে ঘিরে।
আমাজনের গুরুত্ব : আমাজন অরণ্যের গুরুত্ব অনেক। ৩০ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ রয়েছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, পৃথিবীর ২০ ভাগ অক্সিজেনের আমাজন পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চার্যের একটি। আমাজন নদী বেশির ভাগ নদীর উত্স। এই নদী বিশ্বে প্রচুর পানির জোগান দেয়। পৃথিবী জুড়ে থাকা বনাঞ্চলের অর্ধেক এই অরণ্য। ৩৯০ বিলিয়ন বৃক্ষ ১৬ হাজার প্রজাতিতে বিভক্ত। ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়, ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরিসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী আছে। আমাজন নদীতে ৩০০০ প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী এবং সেখানে বসবাস করেন ১০ লাখ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ যাদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই। প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ায় দুরারোগ্য রোগে এদের আক্রান্ত হওয়ার হারও কম।
জ্বলছে ফুসফুস : ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ (ইমপে) জানিয়েছে, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমাজনে ৭২ হাজার ৮০০টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত বছর একই সময়ের তুলনায় যা ৮৩ ভাগ বেশি। ২০১৮ সালে আমাজনের ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বনাঞ্চল হারিয়ে যায় যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৬৫ ভাগ বেশি। রোরাইমা, একার, রনডোনিয়া এবং আমাজোনাস্ সব এলাকাতেই গত চার বছরের (২০১৫-২০১৮) তুলনায় গড়ে আগুন লাগার ঘটনা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড়ো রাজ্য আমাজোনাস্ জরুরি অবস্থা জারি করেছে।
সংকটে ইইউসহ বিশ্ব : বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশাল অরণ্যাঞ্চলের গাছপালা প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন টন কার্বন শুষে নিয়ে বিশ্বের উষ্ণায়ন মোকাবিলা করে। কিন্তু গাছ যখন কাটা হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয় তখন যে কার্বন গাছের মধ্যে সঞ্চিত থাকে তা বায়ুমণ্ডলে মিশে যায় এবং উষ্ণমণ্ডলীয় এসব বৃক্ষের কার্বন শুষে নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়। বর্তমানে জ্বলন্ত আগুন থেকে ব্যাপক পরিমাণ ধোঁয়া ও কার্বন নির্গত হচ্ছে। আগুন থেকে সৃষ্ঠ ধোঁয়া আমাজনের আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস অ্যাটমসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের (ক্যামস্) তথ্যানুযায়ী, ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত। এমনকি ৩২০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে সাওপাওলোর আকাশ এই ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হচ্ছে যার পরিমাণ ২২৮ মেগাটনের সমপরিমাণ দাঁড়িয়েছে যা ২০১০ সালের পর সবচেয়ে বেশি। ধোঁয়া থেকে কার্বন মনোক্সাইডও নির্গত হচ্ছে। ক্যামস্র প্রকাশ করা মানচিত্রে দেখা যায়, খুবই চড়ামাত্রায় বিষাক্ত গ্যাস কার্বন মনোক্সাইড দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ছাড়িয়ে আরো দূরে ছড়াচ্ছে। ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক আগুনের ঘটনা ভেনিজুয়েলায় যার সংখ্যা ২৬ হাজার। তৃতীয় স্থানে বলিভিয়া যেখানে আগুনের ঘটনা ১৭ হাজারের বেশি।
রাজনীতিতেও আগুনের আঁচ : শুকনো মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দাবানল তৈরি হতে পারে প্রাকৃতিক কারণে, যেমন বাজ পড়লে। কৃষক এবং কাঠুরেরা ফসল উত্পাদনের জন্য অথবা পশু চরাতে জমি পরিষ্কার করায় জঙ্গলে আগুন দিয়ে থাকে। তবে গত জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা ব্রাজিলের ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো ইতিমধ্যে বেশ কয়েক বার বলেছেন, ব্যাবসায়িক স্বার্থে ব্রাজিলের উচিত আমাজনকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। যাতে খনন, কৃষি ও কাঠ ব্যবসায়ীরা এর সম্পদকে কাজে লাগাতে পারে। তাই আগুনের ঘটনায় সন্দেহের তীর তার দিকে। তবে তার মতে, তহবিল কমিয়ে দেওয়ায় এনজিওগুলো সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে আগুন দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বিদেশিরা অর্থ দাতব্যে নয়, সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের জন্যই পাঠায়। তিনি বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্রাজিলের একার নেই। কারণ আমাজন ইউরোপের চেয়েও বড়ো। সেখানকার অপরাধমূলক অগ্নিকাণ্ডের বিরুদ্ধে কী লড়াই করা যায়? তার বিরুদ্ধে ব্রাজিলের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ চলছে। তাকে অনেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করছেন যিনি মনে করেন প্রকৃতি ধ্বংসে মানুষের হাত নেই এবং প্রাকৃতিক কারণেই তাপমাত্রা বাড়ে। টুইট বার্তায় ‘আমাদের ঘর জ্বলছে’ উল্লেখ করে আমাজনের আগুনকে আন্তর্জাতিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জি-৭ সম্মেলনে আলোচনা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আমাজনকে রক্ষায় ব্যর্থ হওয়া ব্রাজিলে জার্মানি ৩৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।