উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিবৃত্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র যত কঠোর মানসিকতার পরিচয় দিক না কেন বাস্তবে কিন্তু একই পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি মাঝারি পাল্লার একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বিষয়টি উত্তর কোরিয়াকে নয় রাশিয়াকে বার্তা দিতেই ক্যালিফোর্নিয়ার সান নিকোলাস দ্বীপে পরীক্ষাটি চালানো হয়। এই পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে রাশিয়ার সঙ্গে করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর এরপরই যুক্তরাষ্ট্র এই পরীক্ষা চালায়। এর জন্য সে সময়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছিল। শুধু রাশিয়া নয়, চীনও তার উদ্বেগের কথা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এভাবে যদি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চলতে থাকে কিংবা এর দেখাদেখি অন্য কোনো দেশও একইভাবে চলতে থাকে তাহলে বিশ্ব কি নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে না?
গত ২ আগস্ট আইএনএফ (ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস) চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তখন অভিযোগ করা হয়েছিল যে রাশিয়া এই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে। আর এরপরই জল ঘোলাটে হতে থাকে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় এবং তারপরে ঐ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এই অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন. এর মাধ্যমে বিশ্ব নতুন করে সামরিক উত্তেজনার দিকে ধাবিত হবে যা প্রকারান্তরে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকেই বাড়িয়ে তুলবে। যদিও পেন্টাগনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করেই এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। অর্থাত্ এতে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়নি। আরো বলা হয়েছে, এই পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যত্ মাঝারি পাল্লার অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিষয়টি যে উদ্দেশ্য নিয়েই হোক না কেন একই ধরনের কারণ দেখিয়ে অন্য দেশও যে এ পথে যাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের পদক্ষেপ উত্তর কোরিয়াকে আরো বেপরোয়া করে তুলতে পারে। কারণ তারা চাক্ষুষ প্রমাণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে উদাহরণ হিসাবে টানবে। যার প্রমাণ এরই মধ্যে দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার জাপান সাগরে স্বল্পপাল্লার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উত্তর কোরিয়া। এ নিয়ে গত দুই মাসে সাত বার ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করল পিয়ংইয়ং। অবশ্য এর পিছনে উত্তর কোরিয়ার থেকে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়ার জবাবে এসব করা হচ্ছে। বিষয়টির জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তাকাশি আইওয়াইয়া বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি তাদের জলসীমায় না পড়লেও এই ঘটনা জাতিসংঘ রেজুলেশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
স্নায়ুযুদ্ধকালে করা এই চুক্তিতে তখন ৫০০-৫৫০০ কিলোমিটার রেঞ্জের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যুুক্তরাষ্ট্র আইএনএফ থেকে সরে আসার পর ঐদিন ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে যে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল তার মাত্রা ছিল ৫০০ এর ওপরে। পেন্টাগনের দাবি, তারা এতে সফলকাম হয়েছেন। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই রায়াভকভ তখন এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, এর মাধ্যমে বিশ্বে অশুভ অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে সামরিক উত্তেজনার পথকেই প্রশস্ত করছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে তিনি আরো বলেন, এ পরীক্ষা থেকে এটাই বোঝা যায়, ওয়াশিংটন চুক্তি (আইএনএফ) থেকে বের হয়ে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বিশ্বের কোনো স্থানে মোতায়েন না করা পর্যন্ত এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মস্কো ব্যবহার করবে না। একই কথা বলেছে, চীনও। বেইজিং বলেছে, এর মাধ্যমে বিশ্বে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে।