ফেলনা জিনিস থেকেই নান্দনিক উদ্যোগ

তেলের বোতল, চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, দইয়ের হাঁড়ি আমরা তো ফেলেই দিই যেখানে সেখানে যখন তখন। এগুলো মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস করে, ড্রেনে জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। এসব একদমই ভাবি না। রিসাইকেল করা তো দূরের কথা। অথচ ফেলে দেওয়া এসব জিনিস যে রিইউজ করা যায়। তাও আবার বাগান করার মতো পরিবেশ সুরক্ষার কাজে। সেটা আমরা না ভাবলেও একজন ভেবেছেন। তিনি হলেন আফসানা আফরিন আর্থি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্স পড়ছেন তিনি। ফেলে দেওয়া সামাগ্রীতে আর্থি বাগান গড়ে তুলেছেন। সেখানে জুঁই, বেলিসহ নানা রকমের ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। ঘরের শোভা, মানসিক শান্তি তো হচ্ছেই; আবার পরিবেশও বেঁচে যাচ্ছে দূষণ থেকে। আর্থি বলেন, ‘আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে চাইলেই প্লাস্টিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা যাবে না। বিকল্প না আসা পর্যন্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার থাকবেই। তবে রিইউজ করে কিছুটা হলেও দূষণ কমানো সম্ভব। অর্থনৈতিক ক্ষতিও লাঘব করা যায়।’ গত এক বছরে আর্থি অসংখ্য গাছ লাগিয়েছেন। সবই পরিত্যক্ত তেলের কন্টিনার, পানির বোতল, আইসক্রিমের কাপ ইত্যাদিতে। গ্রিনহপার আর্থির ফেসবুক গ্রুপ। সেখানে তিনি গাছের ছবি পোস্ট করেন। কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া পড়ে। অসংখ্য মানুষ তার এই অভিনব আইডিয়া বেছে নেন। সুন্দর ফুলের বাগান গড়ে তোলেন। আর্থি বলেন, ‘ছোট পানির বোতল, তেলের কন্টিনারে গাছ থাকায় তা যত্রযত্র সরানো যায়। এটা বাড়তি সুবিধা। আর খরচ তো একটু কমই হয়। লো বাজেটে সুন্দর বাগান গড়ে তোলা সম্ভব।’ ভার্সিটির হলে ছেলেমেয়েরা আর্থির দেখাদেখি বাগান করেছে বলে জানা যায়। বিভিন্ন বয়সী মানুষ তার কাছে পরামর্শ চায়। কখনো ইনবক্সে, কখনোবা সরাসির। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ভাবতেই পারিনি এভাবে মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে। গাছের অপূর্ব সমারোহ গড়ে তুলবে।’ বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। একটি প্রাইমারি স্কুুলে প্লাস্টিক ও বায়ুদূষণ, বাগান নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করেন তিনি। পরে দেখলেন, বাচ্চারা স্কুল তো বটেই, বাড়িতেও বাগান গড়ে তুলেছে। শুধু কি তাই, টবের গায়ে তারা নিজেদের নামও লিখে রেখেছে। এসব দেখে আর্থির খুব ভালো লাগে। হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে বাগানের জন্য খরচ করেন বলে তিনি জানান। স্টোর রুমে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল যে এত সুন্দর হতে পারে। সেটা আর্থির টব না দেখলে বুঝাই মুশকিল। তিনি বোতল কেটে সুন্দর করে রং করেন। সাজসজ্জার কারণে তা মাটির টবের চেয়েও সুন্দর মনে হয়। তিনি বাগানে রাসয়নিক সার ব্যবহার করেন না। তিনি ব্যবহার করেন আগানিক ফার্টিলাইজার। আর্থি বলেন, ‘ফেলে দেওয়া ম্যাক্সিমাম জিনিসই রিইউজ সম্ভব। মাত্র তিন থেকে ছয়শ টাকার মধ্যে সুন্দর ছোট একটি বাগান করা যায়।’ নিত্যনতুন আইডিয়া, উদ্ভাবনী চিন্তায় আর্থির জুড়ি নেই। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৯ অরগানাইজ বাই ইয়ুথ অপরচুনিটিস, ডেইলি স্টার চ্যাম্পিয়ান হন তিনি। ফেসবুকে আর্থি প্রতিষ্ঠা করেছেন গ্রিনহপার গ্রুপ। যার সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার। প্লাস্টিক বর্জ্য কেন ক্ষতিকর, কিভাবে আমরা প্লাস্টিক দূষণ করছি, এসবের ক্ষতিকর প্রভাব কী, বিভিন্ন গাছের যত্ন, কিভাবে বাগান করতে হবে, সবজির রেসিপিসহ বিভিন্ন বিষয়ক তথ্য এই পেজে গেলে জানা যাবে। রান্না তার অন্যতম শখ। অথচ সেখানেও তার বিপুল খ্যাতি। ফেসবুকে অবসরের দিনলিপি নামে তার একটি অ্যালবাম আছে। সেখানে শখের কাজ যেমন :বাগান, রান্না, ছবি আঁকা, গাছ বিষয়ক লেখা পোস্ট দেন। চুইঝাল নির্বাচিত ১০০ রান্না বইয়ে তার দুটি রেসিটি স্থান পেয়েছে। দৈনিক জাতীয় সংবাদপত্রের লাইফস্টাইল পাতায়ও তার রান্নার রেসিপি প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া কুকআপস জিরোক্যাল কনটেস্ট-২০১৯-এ শীর্ষ ১৬-এর মধ্যে তিনি ছিলেন। আর্থির প্রতিটি কাজই অসম্ভব যত্ন আর ভালোবাসায় মোড়ানো। দই খেয়ে তার বক্স তো মানুষ ফেলেই দেয়। অথচ দইয়ের বক্স রং করে তাতে তিনি গাছ লাগান। শোপিস তৈরি করেন। যা পছন্দ করে ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড পোডাক্ট। ফলে আড়ং ডেইরি ইয়োগার্ট টাব কনটেস্টে সেরা পাঁচে তিনি স্থান পান। ইউটিউবে আর্থির একটি চ্যানেল আছে। নাম BONG CRAFT BY AFSANA. খুব ছোট্ট পরিসরে সামান্য কিছু ক্রাফট আইটেম তিনি সেল করেন। হাত খরচের টাকা, বন্ধুদের নিয়ে টুকটাক খাওয়ার টাকা এখান থেকেই উঠে আসে বলে তিনি জানান। গাছপালা, পরিবেশ, প্রকৃতির প্রতি তার খুব মায়া। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একটা জাদুঘর ও রিসোর্ট করবেন। যেখানে অসংখ্য প্রজাতির গাছ থাকবে। সরাসরি মানুষ গাছের পরিচর্যা দেখতে পাবে।