ছোটদের নজরুল

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বড়দের জন্য যেমন লিখেছেন তেমনি ছোটদের জন্যও লিখেছেন মজাদার ছড়া, কবিতা, গান, নাটক ও ছোটগল্প।

কিশোরমন ঘরে থাকতে চায় না। অজানাকে জানার আর অদেখাকে দেখার জন্য তার মন টগবগ করে। আর তাই তো ‘সংকল্প’ কবিতায় নজরুল কিশোরমনের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন এভাবে : ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে/দেখব এবার জগত্টাকে/কেমন করে ঘুরছে মানুষ/যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’

শিশু-কিশোরদের জন্য তার আরেকটি কবিতা :‘আমি হব সকাল বেলার পাখি/সবার আগে কুসুম বাগে উঠব আমি ডাকি।/সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে/হয়নি সকাল ঘুমো এখন মা বলবেন রেগে।/বলব আমি আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাকো/হয়নি সকাল তাই বলে কি সকাল হবে না কো?/আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে/তোমার ছেলে উঠলে মা গো রাত পোহাবে তবে।’ কবির এই কবিতার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সমগ্র ভারতের স্বাধীনতার ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য। সকাল বেলার পাখিরা যেমন কিচির মিচির সুর তুলে মানুষকে জানান দেয়—ভোর হয়েছে সবাই ঘুম থেকে ওঠো, তেমনি কবি সারা ভারতের মানুষকে ভোরের পাখি হয়ে জাগাতে চেয়েছেন। এদেশের তরুণরা জেগে উঠলে ব্রিটিশদের তাড়ানো যে সহজ হবে এবং দেশ স্বাধীন হবে—এমন উপলব্ধি থেকেই বিখ্যাত এই কিশোরকবিতাটি তিনি লিখেছিলেন। ছোটমণিদের জন্য তার আরেকটি প্রিয় ছড়া :‘ভোর হল দোর খোলো খুকুমণি ওঠ রে,/ওই ডাকে জুঁই-শাখে ফুল-খুকি ছোট রে।/খুলি হাল তুলি পাল ওই তরী চলল/এইবার এইবার খুকু চোখ খুলল।/আলসে নয় সে/ওঠে রোজ সকালে,/রোজ তাই চাঁদা ভাই টিপ দেয় কপালে।’ (প্রভাতী)।

ছোটদের জন্য তার আরেকটি আকর্ষণীয় ছড়া ‘ঝিঙেফুল’ :ঝিঙেফুল ঝিঙেফুল/সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল-/ঝিঙেফুল।/গুল্মে পর্ণে/লতিকার কর্ণে/ঢল ঢল স্বর্ণে/ঝলমল দোলে দুল/ঝিঙেফুল।।’ পরিবেশ চেতনা অর্জন ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টিতে এ ছড়াটি ভূমিকা রাখতে পারে। শিশু-কিশোরদের খুবই প্রিয় নজরুলের একটি চমকপ্রদ ছড়া ‘খুকি ও কাঠবিড়ালী’। ছড়াটি এরকম : ‘কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি/পেয়ারা তুমি খাও?/গুড়-মুড়ি খাও দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?/বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?’

এমন রসাত্মক শিশুতোষ কবিতা বাংলা শিশুসাহিত্যে বিরল। কবি ওই ছড়াটি লিখতে গিয়ে নিজেই যেন খুকি হয়ে গিয়েছিলেন। ‘কালো জামরে ভাই’ ছড়া-কবিতায় লিখেছেন :‘কালো জামরে ভাই!/আমি কি তোমার ভায়রা ভাই?/লাউ বুঝি তোর দিদিমা আর/কুমড়ো তোর দাদামশাই।।’

‘শিশু-সওগাত’-এ লিখেছেন :‘তোর দিন অনাগত, শিশু তুই আয়,/জীবন-মরণ দোলে তোর রাঙা পায়।/তোর চোখে দেখিয়াছি নবীন প্রভাত,/তোর তরে আজিকার নব সওগাত।’

‘কোথায় ছিলাম আমি’ শিরোনামের পদ্যটি কার না ভালো লাগে!— ‘মা গো! আমায় বলতে পারিস কোথায় ছিলাম আমি—/কোন্ না-জানা দেশ থেকে তোর কোলে এলাম নামি?/আমি যখন আসিনি, মা তুই কি আঁখি মেলে/চাঁদকে বুঝি বলতিস-ওই ঘর-ছাড়া মোর ছেলে?/শুকতারাকে বলতিস কি, আয়রে নেমে আয়—/তোর রূপ যে মায়ের কোলে বেশি শোভা পায়।...’।

‘নতুন খাবার’ তার একটি হাসির ছড়া। ছড়াটি হলো : ‘কম্বলের অম্বল/কেরোসিনের চাটনি/চামচের আমচুর/খাইছ নি নািন?/আমড়া-দামড়ার/কান দিয়ে ঘষে খাও/চামড়ার বাটিতে/চটকিয়ে কষে খাও।...’  

এরকম আরো কত মজার মজার ছড়া-কবিতা তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য রেখে গেছেন। গত ১২ ভাদ্র ১৪২৬ (২৭ আগস্ট ২০১৯) ছিল প্রিয় কবির ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। কবির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

কাজী নজরুল ইসলাম

ঁজন্ম :২৪ মে ১৮৯৯ [১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ], মৃত্যু :২৭ আগস্ট ১৯৭৬ [১২ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ]