দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য টেকসই উন্নয়ন পদক্ষেপ

অর্থনীতিতে সুন্দরবনের ভূমিকা ব্যাপক

আলাউদ্দিন চৌধুরী

সুন্দরবনকে ঘিরে কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষার (এসইএ) উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে চারপাশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুেকন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, তার বিশদ মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি বিশেষ সেক্টরের সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনাও (ইএমপি) প্রণয়ন করা হবে। এজন্য ‘স্ট্রেটেজিক এনভায়রনমেন্টাল এসেসমেন্ট (এসইএ) অব সাউথ ওয়েস্ট রিজিয়ন অব বাংলাদেশ ফর কনসার্ভিং আউটস্ট্যান্ডিং ইউনিভার্সাল ভ্যালু অব দি সুন্দরবন’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রকল্প নিচ্ছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে ২০২১ সালের মার্চের মধ্যে সমীক্ষা শেষে এর বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। সমীক্ষা প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে ২৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে— সুন্দরবন সংরক্ষণের জন্য দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন। সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ও অন্যান্য প্রভাব হ্রাসের উদ্দেশ্যে বিকল্প কৌশল প্রণয়ন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের তদারকিতে পরিবেশগত কার্যক্ষমতা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভবিষ্যত্ কর্মকাণ্ডের বিবেচনায় সাতটি খাত যেমন— পানিসম্পদ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি, পর্যটন, নগরায়ন, শিল্প পরিবহন/যোগাযোগ ও নৌচলাচলকে সম্পৃক্ত করা।

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব— ঐতিহ্যের সম্মান দেয় ইউনেসকো। তাতে শর্ত ছিল এই বনের জীববৈচিত্র্যের হুমকিতে পড়ে এমন কোনো তত্পরতা চালানো যাবে না। শর্ত লঙ্ঘনের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হলে এ সম্মান চলে যাবে। বিশ্ব ঐতিহ্যের ১৬.৩ ধারা অনুযায়ী বিশ্ব ঐতিহ্যের চারপাশের নির্দিষ্ট এলাকায় (প্রতিবেশ) বড়ো কোনো শিল্পকারখানা হতে দেওয়া যাবে না। আসছে ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সুন্দরবনে আসবে। তারা সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও পানিপ্রবাহের ওপর একটি সমীক্ষা করবে। চারপাশের শিল্পকারখানা ও রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করে দেখবে। তার ভিত্তিতেই নেওয়া হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ইউনেস্কোর কমিটি বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ জানায়।

পরিবেশ মন্ত্রণালয় বলছে, সুন্দরবন পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এটি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের আঁধারই নয়, বরং দুর্যোগ থেকেও এ দেশের মানুষ ও সম্পদ রক্ষা করে এ বন। সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য আছে যা মোট এলাকার ৫২ শতাংশ। সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকার ১ লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর এলাকা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিজেট সাইট এবং পুরো জলাভূমি রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত। এ কারণে এ বনের গুরুত্ব দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও রয়েছে। এটি শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয় বরং বিশ্ব ঐতিহ্যও এ বন। এ কারণে ইউনেস্কোও বনটি সংরক্ষণে গুরুত্ব দিয়ে আসছে এবং এসইএ কাজ শুরুর জন্য বাংলাদেশকে বলে আসছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের এবং এর ইসিএ (প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা) সীমার বাইরে শিল্প কারখানা স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজ উত্তরোত্তর বাড়বে। যার বিরূপ প্রভাব সুন্দরবনের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপরন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মধ্যে দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়সহ নানা কারণে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকা সর্বাধিক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে সুন্দরবনকে সংরক্ষনের জন্য দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন, সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ এবং অন্যান্য প্রভাব হ্রাসের উদ্দেশ্যে বিকল্প কৌশল প্রণয়ন, পরিবেশগত কার্যক্ষমতা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এলাকার উল্লেখযোগ্য খাতগুলোকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে টেকসই ব্যবস্থাপনা নেওয়া হবে।