কালের সাক্ষী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

অলোক আচার্য

 

অদেখাকে দেখার ক্ষেত্রে আমার চিন্তা-চেতনায় কেবল কবিগুরুর সেই কবিতার লাইন মনে পড়ে।—‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ঘাসের ওপর একটি শিশির বিন্দু।’ বিশ্বাসও করি তাই। ঘরের সৌন্দর্য না দেখে বাইরের সৌন্দর্য দেখে কী লাভ? তাই সুযোগ পেলেই ছুটে যাই দেশটাকে দেখতে। ঘর থেকে দুই পা ফেলে দেখার ইচ্ছে হয় বারবার। আমাদের প্রেসক্লাবের উদ্যোগে কিছুদিন আগে আমরা গিয়েছিলাম পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার অন্তর্গত অন্যতম ঐতিহ্য পাকশীতে শত বছরের ঐতিহ্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখতে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অগণিত পর্যটক একবার এই ঐতিহ্য দেখতে ছুটে আসেন পরিবার-পরিজন বা বন্ধুদের সঙ্গে। সেখানে গেলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজও দেখা, সেইসঙ্গে লালন শাহ সেতুও দেখা যায়। কারণ এর পাশেই যে আমাদের দেশের আরেক স্থাপনা লালন শাহ সেতু অবস্থিত। কয়েকবার দেখেছি, তবু দেখা যেন শেষ হয় না! হওয়ার কথাও নয়। এত বিশাল লোহার সেতু আর কী চমত্কার নির্মাণশৈলী! আমার বাড়ি পাবনা জেলায় হওয়ায় সেখানকার দূরত্ব বেশি নয়। তবে সবার সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর লোভ কী আর সামলানো যায়। আমরা প্রেসক্লাবের ২৫ জন সাংবাদিক এক সকালে রওনা হলাম পাকশীর উদ্দেশ্যে। মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম সেখানে। আমাদের সঙ্গে রান্নার বাবুর্চি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ছিল। সেগুলো গুছিয়ে দিয়ে বের হলাম আশেপাশে দেখতে। যতবার সেখানে গিয়েছি ততবার মুগ্ধ হয়েছি এত নিপুন আর দক্ষ কাজ দেখে!

১৯০৭ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও ঈশ্বরদী উপজেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে একটি ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে কর্তৃপক্ষ। ১৯১৪ সালের শেষ দিকে ব্রিজটির কাজ শেষ হয়। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ডাউন লাইন দিয়ে প্রথম মালগাড়ি চালানো হয়। সে সময় ব্রিজটি ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামানুসারেই ব্রিজটি নামকরণ করা হয়। তখনকার সময় ব্রিজটি তৈরিতে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

শত বছর পার করে আসা এই ব্রিজটি যতবার দেখি ততবার এক ধরনের আনন্দবোধ করি। আমরা বর্ষা মৌসুম শেষে বেড়াতে যাওয়ায় পদ্মার জল ছিল অনেকদূরে। ব্রিজের নিচে অনেকদূর হেঁটে গেলে পদ্মার দেখা পাওয়া গেল। সেখানে সারিসারি নৌকা বাঁধা। নৌকায় রয়েছে পদ্মার মাঝে চর থেকে ঘুরে আসার সুযোগ। অনেকেই সে সুযোগ নিচ্ছে। ব্রিজের নিচ দিয়ে বহু অস্থায়ী খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে। দলবেঁধে ঘুরতে আসা সবাই পদ্মার দিকে যাচ্ছে। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে, আবার কেউ এদিক-ওদিক ঘুরে ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের বামদিকে তাকালেই চোখে পড়ে লালন শাহ সেতু। পাশাপাশি দুই সেতু দুই সময়ের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুটা উঁচুতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের একপাশে উঠলাম। ভেতরে চলাচল নিষেধ তাই পাশ থেকেই প্রেসক্লাবের সবাই ছবি তুললাম। সেখান থেকে সৌন্দর্যটা অন্যরকম। তারপর বিকেলের আলো কমতে শুরু করলে আমরা আবার ফিরতি যাত্রা করলাম। পেছনে পড়ে রইলো একটি দিনের স্মৃতি। আবারো হয়তো সেখানে ঘুরতে যাবো কোনো এক সময়।