ইশতি ডায়েরি নিয়ে বসল। সে যে নিয়মিত ডায়েরি লেখে তা না। এ বছরের শুরুতে শিলাইদহের উপেন মামা ওকে একটা ডায়েরি উপহার দিলে ও মাঝে মাঝে কিছু লেখে। কোনো ভালোলাগা, কোনো কষ্ট বা অন্যরকম আনন্দ—এসব। ও খুব ব্যস্ত। ক্লাস, কোচিং এসব নিয়ে এতই ব্যস্ত যে সময়ই পায় না, তাই লেখে খুব সংক্ষেপে। ল্যাপটপের কিওয়ার্ডের মতো শুধু একটা শব্দ বা লাইন। যেন সার্চ দিলেই সব বেরিয়ে আসে বা ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
ইশতি সেদিন সকালে ডায়েরিতে লিখল :
: ভূত আছে। ওরা আসে অন্ধকারে চুপি চুপি।
: ভূত দিনে বা আলোতে আসে না। তার মানে ভূত নেই।
ইশতির মা গেছে খালাকে দেখতে। তার অসুখ। আব্বা বিদেশে ট্রেনিংয়ে। ইশতি যায়নি। ওর গণিত অলিম্পিয়াডের ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপ, বছরের শুরু না হতেই অঙ্কের প্রাইভেট শুরু হয়ে গেছে। বুয়েটে পড়া যে ছাত্রের কাছে ও অঙ্ক শেখে, সে এক মাসে ক্লাসের এক বছরের সব অঙ্ক শিখিয়ে দেবে। ইশতি তাই একা রয়ে গেছে বাসায়। খওয়ার কোনো সমস্যা নেই, পাঁচতলায় থাকে ছোট ফুফু। সিঁড়ি ভেঙে তিন থেকে পাঁচ তলায় উঠতেই যেটুকু কষ্ট।
গতকালটা ইশতির বেশ ব্যস্ততায় কেটেছে। সারাদিনে অঙ্ক ও অলিম্পিয়াডের বেশ কয়টা ক্লাস, সন্ধ্যার পরে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা, বাসায় ফিরে ফুফুর বাসায় খেয়ে তবেই নিজের ঘরে এসে আবার অঙ্ক নিয়ে বসা। হোমটাস্কের অঙ্কগুলো শেষ, কিন্তু অলিম্পিয়াডের একটা প্রবলেম আর সল্ভ হয় না। মাথাটা গরম হয়ে উঠল, তাও মিলল না। বুঝল এখন আর হবে না। শরীরও খুব ক্লান্ত। শোওয়ার প্রস্তুতি না নিয়েই শুয়ে পড়ল।
ঘুম ভাঙল ঘরের ভেতর কারো নড়াচড়ায়। কথাবার্তাও বলছে খুব আস্তে আস্তে। শোনা যায় কি যায় না। ভালো করে দেখতে চাইল সে, কিন্তু চোখের পাতাদুটো যেন গ্লু দিয়ে আটকানো। কিছুতেই চোখ খুলতে পারল না। বলতে গেল, এই তোমরা কারা?
কিন্তু মুখ ফুটে কোনো কথা বেরুল না। যেন ওকে বোবায় ধরেছে।
মাথার কাছে দু-তিনটা ভূত। নড়াচড়া করছে, মিনমিন করে কথা বলছে, খিনখিন করে হাসছে। এরপর শুরু করল নতুন উত্পাত। কান ধরে টান দেয়। জোড়ে না, আস্তে আস্তে। যেন খুব ছোট বাচ্চা আলতো করে তার কান নিয়ে খেলা করছে। একবার এ কান আরেকবার আরেক কান। কান টানছে, কান মলছে। নাক ধরেও টানা শুরু করল।
ইশতি খুব বিরক্ত। সবচেয়ে বিশ্রী ব্যাপার ও কিছুই করতে পারছে না। ওর খুব পানি পিপাসা পেয়েছে। মাথার কাছে ছোট টেবিলের ওপর পানির বোতল থাকে, ইশতি হাত বাড়িয়ে পানির বোতল নিয়ে মুখে ঢালল। মুখে তো পানি আসছে না। ইশতি ভয় পেয়ে গেল।
এই সময় ঘরের ভেতর একটা ভারী পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। যারা কান টানছিল তারা ভয় পাওয়া গলায় বলল, এই চল, পালা, মামদো এসেছে।
আরেকজন বলল, তাড়াতাড়ি পালা। এবার মামদো মানুষটার ঘাড় মটকাবে।
ইশতি আরো ভয় পেয়ে গেল। মামদোটা এবার জব্বারের বলীখেলার মতো তাকে মাটিতে ফেলে চেপে ধরে তার ঘাড় মটকাবে।
গণিত অলিম্পিয়াডের ট্রেনিং নেওয়া ইশতি তা কিছুতেই হতে দেবে না। সে সর্বশক্তি এক করে উঠে দাঁড়াল। আর ঠিক এই সময়ে সারা ঘর ভরে উঠল দিনের মতো উজ্জ্বল আলোয়।
ইশতি এদিক ওদিক তাকাল। কানটানা নাকটানা কোনো ভূতই ঘরে নেই। মামদো ভূতেরও কোনো অস্তিত্ব নেই। বিছানার ওপর পানির বোতল, বোতলে পানি। কিন্তু বোতলের পানিতে বিছানা তো ভেজে নাই। ভিজছেও না।
ইশতি জোরে হেসে উঠল, পানি বেরুবে কী রে? বোতলের মুখ তো বন্ধ!