রঙিন রেইকাভিক

লেঙ্গাফিওর রোডে ফাঁকা একটা বেঞ্চ পেয়ে সেখানেই ধপ করে বসে পড়ি। কিছুটা আশাহত আমি। যে ক্যাফে খুঁজতে এসেছিলাম, ওটা খুঁজে পাইনি। তার বদলে ওখানে পেয়েছি ইটালীয় পিত্জার দোকান। তাও আবার রবিবারের সকাল বিধায় ওটির দোর এখন বন্ধ। অথচ ওই দশ নম্বর বাড়িটির নিচতলা তো এতটা নিশ্চল, নীরব হবার কথা ছিল না। শুনেছি, সেই ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে বেশ কিছুকাল অবধি আইসল্যান্ড নামক তুহিন তুষারময় দেশটির কবি-সাহিত্যিকদের মিলনস্থল ছিল ওই বাড়িটির নিচতলার একটি ক্যাফে। বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকের বিখ্যাত নারী লেখিকা আস্তা সিগুরহারদতে ওই ক্যাফের আলো-আঁধারিময় ধূমায়িত পরিবেশে বসেই নাকি রচনা করেছিলেন তার বিখ্যাত ছোটগল্পের সংকলন ‘রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল’। সময়টা তখন ঘরছাড়া হিপিদের, বুর্জোয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী তরুণদের। এই লেখিকাও ছিলেন সেই দলেরই একজন। তার সাহিত্যে তাই মূর্তমান ছিল প্রতিবাদী নারীকণ্ঠ। সেই চরিত্রগুলো ছিল সমসাময়িক আর সব লেখকদের সৃষ্ট নারীচরিত্র থেকে স্পষ্টতই ভিন্ন। আর সেই ভিন্নতা আস্তা সিগুরহারদতে অভিমুখে ঠেলে এনেছিল নিন্দা আর সমালোচনার পাহাড়ি ঢল। সেই ক্যাফেটির গুমোট ঘরে কাপের পর কাপ কফি সাবাড় করে আস্তা সেই নিন্দার জবাব দিয়েছেন; মত্ত হয়েছেন আর সব লেখক-কবিদের সঙ্গে সাহিত্য বিতর্কে, কোণের দিকের টেবিলে নিজের আর্ট পেনসিল সাজিয়ে এঁকে গেছেন নিজের বইয়ের জন্যে প্রাসঙ্গিক ইলাস্ট্রেশন।

প্রখ্যাত সেই ক্যাফেটিকে হটিয়ে পত্তন গাড়া পিত্জার দোকানের উল্টোদিকের বেঞ্চে বসে এসবই ভাবছিলাম আমি। দোকানটিকে ধারণকারী বাড়িটি ত্রিতল। গোলাপি চুনকামে এটিকে অনেকটা দেখায় ম্লান জবার মতো। দোতলা-তেতলার জানালার পাল্লা গাড় সবুজে রাঙানো। নিচতলায় সড়ক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়ালে আটকে আছে মিনিয়েচার দুটি গ্রিক মূর্তি আর ছোট্ট এক ঝরনাধারার আধার। ঝরনাটির অতিরিক্ত জল নিষ্কাসিত হয়ে যাচ্ছে ওটির তলে আটকে রাখা নল দিয়ে। তাই জল কখনো উপচে পড়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে না পিচঢালা জমিন। আমি বেঞ্চ থেকে উঠে হাত ভেজাবার জন্যে ঝরনাটির কাছে যাই। বরফ শীতল জলে হাত ভেজাবার সময়ে লক্ষ করি—ঝরনার নিচে জমে থাকা জলে মুহূর্তে মুখ ভাসিয়ে আবারও তলিয়ে যাচ্ছে একটি গোলাপের অসহায় কুঁড়ি। ওকে যে কে এখানে এভাবে ছেড়ে গেছে কে জানে!

আমি আবারও বেঞ্চে ফিরে আসি। বেশ মোলায়েম রোদ চারদিকে। তাপমাত্রা পনেরো ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি নয়। কিন্তু সে নিয়ে অভিযোগের কিছু নেই। কারণ গত বছরেও নাকি এদেশে গ্রীষ্মকালে সূর্যমুখর দিন ছিল মাত্র দুই দিন। সেখানে গত তিন দিন ধরেই সূর্যের সঙ্গে অবিরাম দেখা হচ্ছে। সবাই বলছে—এ বছরে আমরা সত্যিই ভাগ্যবান। তাপমাত্রার ব্যাপারটিকে তাই হয়তো উড়িয়ে দেওয়াই যায়। আমার একপাশে ছায়া দেয় আপেল গাছের কচিপাতা। ফল বা কুঁড়ি আসার সময় এখনো হয়নি ওতে। অর্ধগোলাকার এই বেঞ্চে কিছুটা হেলান দেবার সময়ে বাঁ হাতের নিচে একটি নোট বইয়ের উপস্থিতি আবিষ্কার করি। চমকে উঠি আমি। ভুল করে আমারই মতো কোনো পথচলতি পথিক এটিকে ফেলে গেলেন কি? আমি তাই কিছুটা বিশ্রান্ত হূদয়ে ডায়েরির পূর্বাপর লেখকদের কয়েকটি অনুলিখন পড়ায় মনোনিবেশ করি।  

লেখায় পুরোপুরি ডুবে যাবার আগেই খেয়াল হয়—এ সময়ে একটু চা হলে মন্দ হতো না। দূর থেকে ভেসে আসা সেন্ট্রাল ক্যাথেড্রালের ঢং ঢং শব্দ আমার সেই ইচ্ছেতে যেন সম্মতি জানায়। এই ক্যাথেড্রালটি দেখতে অনেকটা সাভার স্মৃতিসৌধের মতোই। তেমন করেই এর সুচালো চূড়া ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ছুটে গেছে মেঘের দিকে। এতটা দূর থেকেও নানাবাড়ির ছাদের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেই চূড়াটিকে তাই স্পষ্ট দেখতে পাই। আমার ডান ধারে দুই দোকান পরেই ‘কাফি ব্রেন্সলান’—চা-কফির দোকান। ১১ নম্বর বাড়ি থেকে ক্যাফে উধাও হয়ে গেছে বলেই যে এ পাড়ার বাকি সব ক্যাফে-ও উধাও হয়েছে, তেমন নয়। আমি ডায়েরিটি বেঞ্চে রেখে সেই ক্যাফের দিকে হাঁটি। চকিতে পেছন ফিরে ভাবি, এর মধ্যে ওটি নিয়ে কেউ আবার কেটে না পড়লে হয়। অবশ্য এই নিরালা সকালে তেমন কাজ করার খুব বেশি লোক এই মুহূর্তে আশপাশে নেই। কিছুটা তাই নিশ্চিন্তচিত্তে ক্যাফের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকি। ভেতরের স্বল্পালোকিত স্থানটিতে খদ্দেরের সংখ্যা নগণ্য। যারা চা-কফি কিংবা কেকের অর্ডার করছেন, তাদের বেশিরভাগই অর্ডার করে বলছেন—‘বাইরের টেবিলে বসছি, তৈরি হলে দিয়ে আসবেন’। আমাকে দেখে এস্প্রেসোর মেশিন নিয়ে ব্যস্ত মেয়েটি মিলকমেন অর্থাত্ স্বাগতম বলে। আমি দেয়ালে টানানো মূল্যতালিকার দিকে তাকাই। মোটামুটি যা ভেবেছিলাম, তা-ই। সবকিছুই অগ্নিমূল্য। এক কাপ চা খেতেই লাগবে প্রায় পাঁচ ডলার। বাকিসবের দাম আরো বেশি। এদেশে এমনই। খাবার, পরিবহন, বাসস্থান—সবকিছুই অগ্নিমূল্য। যেহেতু প্রকৃতির সঙ্গে নিয়ত যুদ্ধ করে এদেরকে টিকে থাকতে হয়, তাই তার জন্যে মাসুলও গুনতে হয় বেশ চড়া। আমি চায়ের অর্ডার দিতে চাইলে মেয়েটি এবার উঁচু টেবিলে রাখা তিনটি বয়ামের দিকে নির্দেশ করে বলে, ‘কোন ধরনের চা চাও? ইংলিশ, সিলন, নাকি আর্লগ্রে টি?’ আমি ইংলিশ টি-ই বেছে নিই। তারপর মেয়েটিকে বলি, ‘দু দোকান পরের বেঞ্চে বসেছি আমি। চা-টা হয়ে যাবার পর ওখানে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে?’ চায়ের দাম বুঝে নিতে নিতে মেয়েটি মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানায়।

বেঞ্চে ফিরে এসে দেখি—রেখে যাওয়া ডায়েরিটি তখনো সকালের মিষ্টি রোদ প্রাণ ভরে গিলছে। আমি সেটির মলাট ওলটাতেই বাঁ দিকের পাতা থেকে ফিক করে হেসে ফেলে সুরার গেলাস। কেউ একজন সেটি এঁকে নিচে লিখেছে—‘আমি আজ বদ্ধ মাতাল। এরচেয়ে বেশি কিছু তাই লিখতে পারছি না।’ কী খেয়ে যে ব্যাটা মাতাল হয়েছিল কে জানে! ফিনল্যান্ডিয়া ব্রান্ডের ভদকা? নাকি বার্চ গাছের বাকল থেকে তৈরি স্থানীয় পানীয়, যেটি পান করে গতকাল আমার ওষ্ঠদেশ পুড়ে হয়েছিল অঙ্গার!

আমি এবারে বাদবাকি পাতাগুলোতে চোখ বোলাই। পড়তে পড়তে একটি গল্পে এসে রীতিমতো চমকিত হই। গল্পটি এমন—‘আমি নিউ ইয়র্কবাসী। মধ্য গ্রীষ্মে নিউ ইয়র্কের নব্বই ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা থেকে বাঁচতে ঠিক করি, কিছুদিনের জন্যে ছুটি কাটাতে যাব সুইডেনে। সুইডেনের কারলসক্রনা শহরে। শুনেছি, পোল্যান্ডের ঠিক উল্টোদিকে বালটিক সাগরধারের এই সুইডিশ শহরটি সারা বছর ঢেকে থাকে কুয়াশার মায়াজালে। অনেকে তাই এটিকে ডাকে ভ্যাম্পায়ের শহর বলে। এমন একটি অদ্ভুত শহরে কিছুটা সময় কাটাবার লোভ তো আছেই, সেইসঙ্গে আছে নিজের কিছু টুকিটাকি কাজ। আমি পেশায় পেইন্টার। ওখানে গিয়ে বেশকিছু পেইন্টিং-এ হাত দেবো, তেমন একটা পরিকল্পনাও ছিল। সবই ঠিক ছিল। কিন্তু আমার নিয়তি বাদ সাধল। নিউ ইয়র্ক থেকে সুইডেনে উড়ে যাবার পথে এই রেইকাভিক শহরে আমার যাত্রাবিরতি ছিল। কিন্তু এখানে নামার পর শুনলাম—পরের ফ্লাইটের প্লেন বিকল। ওটি পরের দিনের আগে ছাড়বে না। লাউঞ্জেই পরিচয় হলো অনিন্দ্য সুন্দরী এক জার্মান রমণীর সঙ্গে। ওর নাম ইলা। ইলা আইসল্যান্ডে এসেছে উত্তরের এক শহরে কয়েক সপ্তাহ থাকবে বলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আর আমিও ঠিক করে ফেললাম, কাল সুইডেন যাচ্ছি না। ইলার সঙ্গে আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর একটা গাড়ি ভাড়া করে আমরা চলে গেলাম উত্তরের সেই বিরান শহরে। সেখানে একটা লগ কেবিন ভাড়া করলাম। স্বপ্নের মতো কয়েকটা দিন কাটল আমাদের। ঠিক যেন সিনেমার মতো। এবারে ফিরে যাচ্ছি যে যার দেশে। তবে আমি আর ইলা এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, বিয়ে করব আমরা। ভাবুন একবার—অদৃষ্ট কী করে আমাদের দুজনকে টেনে এনে এক করে দিল এই শহরে। অপূর্ব এই দেশ, ভালোবাসার মায়াজালে ঢাকা এই  রেইকাভিক শহরের প্রতি তাই আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। ভালো থেকো প্রিয়তম শহর রেইকাভিক, ভালো থাকুন আপনারা। ইতি—ইলিয়াস।’

এমন একটি মিষ্টি কাহিনির পাশাপাশি অভিযোগের সুরে লেখা আরো একটি মজার কাহিনি বলার লোভ সামলাতে পারছি না—‘আমরা গাড়ি ড্রাইভ করে গিয়েছিলাম আইসল্যান্ডের একেবারে পশ্চিমে। তাল্কনাফিউরদর নামক একটা জায়গায়। ফেরার পথের দুই পাশটা যেন চাঁদের দেশ। জনবিহীন। পথের পাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে যেন দুমড়ে মুচড়ে আছে কংক্রিটের চাঙড়। আসলে ওগুলো বোধহয় আগ্নেয় জমাট লাভার স্তর। ও পথে চলতে গিয়ে তেল ফুরিয়ে এল আমার গাড়ির। কপাল জোরে মাইল বিশেক চলার পর একটা তেলের পাম্প নজরে এল। তেল নিলাম। বিল এল দশ হাজার লিরা। ক্রেডিট কার্ডে দাম দিলাম। তারপর বেরিয়ে এসে আবারও পথ চলা শুরু করলাম। রেইকাভিকে পৌঁছে আমার ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্ট চেক করতে গিয়ে দেখি, ওটাতে ভুল করে চার্জ করা হয়েছে দশ লক্ষ লিরা। কোথায় দশ হাজার, আর কোথায় দশ লক্ষ। কী কাণ্ড দেখুন! ওদিকে আমি কিন্তু সেই দোকানটির নাম-ঠিকানা সব ভুলে বসে আছি। ওদের ফোন নম্বরও নেই যে ফোন করে টাকা ফেরত দিতে বলব। শালার এই দেশটা এভাবে আমার টাকাগুলো খেয়ে নিল। ইতি—ব্রুনো, ব্রাজিল।’

এমন সব নানা কাহিনির সাগরে ডুবে যাবার মধ্যেই কিন্তু ক্যাফের মেয়েটি এসে আমার বেঞ্চে একটি গোল অ্যালুমিনিয়ামের ট্রে রেখে গেছে। তাতে রাখা ছোট্ট চীনেমাটির পট, চায়ের পেয়ালা আর একবাটি লালচে দানার চিনি। চুক চুক করে চা পান আর ডায়েরি পাঠপর্ব শেষ হলে আমি একটু হারবারের দিকে অর্থাত্ পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকি।

হারবার এখান থেকে বেশি দূরে নয়। এইতো কয়েক গলি পরেই হয়তো শুরু হয়েছে সাগরের প্রান্তসীমা। তবে সেখানে পৌঁছাবার রাস্তাটি আবার সরলরেখাও নয়। রংচঙে নানা বাড়িতে ভরপুর বেশ কয়েকটি স্ট্রিট ডিঙিয়ে তবেই হয়তো সেখানে পা ফেলা যায়। আমি কিছুটা অলস চালে পা ফেলে সেই স্ট্রিটগুলো পেরোই। তাতে করে দেখা হয় বেশকিছু চালচিত্র। আমার দুই পাশে লাল, সবুজ, হলুদ, নীল—এমন নানা রঙে রাঙানো বাড়ি। ফলে একঘেয়েমি লাগবার কোনো সুযোগ নেই। দুই বাড়ি পর পর যে ল্যাম্পপোস্ট, সেখানে ঝোলান লিলি ফুলের ঝাঁপি। এমন কয়েকটি বাড়ির পেছনের এক চিলতে বাগানে বসে আচ্ছাসে আড্ডা দিচ্ছেন প্রতিবেশীরা। কেউবা আবার কাচের জানালার ওপাশে রাখা মানিপ্ল্যান্টের পাতা ছেঁটে দিচ্ছেন সযত্নে। এখানে দেখলাম—কেউ জানালার বাইরের কার্নিশে কিংবা উঠোনে ফুলগাছ রাখে না, লুকিয়ে রাখে কাচের অন্তরালে, তুষার আর হিমেল হাওয়ার ছোবল থেকে গাছকে বাঁচাবার অভিপ্রায়ে হয়তো। দু-একজনকে আবার দেখলাম সাইকেল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাজারের দিকে ছুটতে।

এমন নানা সব দৃশ্যের মুখোমুখি হবার পর আমি যখন হারবারের দোরগোড়ায়, তখন দূর সাগরের শান্ত জলে একেবারে নিঃশব্দে ভেসে চলেছে টকটকে লাল রঙের মালবাহী জাহাজ। চৈত্রের নিস্তেজ নদীবক্ষের মতোই এ সাগর উর্মিহীন। জাহাজটিকে তরতরিয়ে সামনে এগোবার জন্যে তাই খুব একটা লড়াই করতে হয় না। দিগন্তের কাছাকাছি জায়গাটায় মাথা উঁচিয়ে থাকা দ্বীপের ওধারে ওটি হারিয়ে যাবার পর ডান দিক থেকে ভেসে আসে ছাই বর্ণের বিশাল যুদ্ধ জাহাজ। উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ। এই দুই জাহাজ ব্যতীত অসীম এই সাগরপৃষ্ঠে আর কোনো পোতের দেখা নেই, নেই সাগর থেকে ভেসে আসা দূরগামী জাহাজের ভেঁপুর শব্দ। কেবল কয়েকটি তুন্দ্রা অঞ্চলের বাজপাখি মেঘহীন ঝকঝকে আকাশে দলবেঁধে উড়ে চরাচরের নিঃসঙ্গতা মেটায়।

হারবার থেকে ফেরার পথে আমি পথ হারাই। তবে অন্যান্য দেশে যেমন পথচলতি কারুর কাছে পথের হদিস জানার আগে জিজ্ঞেস করে নিতে হয়, জনাব কি ইংরেজি জানেন? এদেশে সে ঝামেলা নেই। কারণ, এখানে সবাই কমবেশি ইংরেজি জানেন। আর ওদিকে এ শহরে আছে প্রচুর বিদেশি শ্রমিক। তাদের মাঝে পোলিশ আর হাঙ্গেরিয়ানই বেশি। তাই ভাষা সমস্যায় খুব একটা পড়তে হয় না। দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে ঠিক ঠিক পৌঁছে যাই কাঙ্ক্ষিত বাসস্ট্যান্ডের নিকটে। আমাকে এখন যেতে হবে হাফনাফিওর নামক শহরতলিতে। মূল শহরের এতটা দূরে ওখানে উঠেছি কম ভাড়ায় হোটেলের লোভে। তবে বাসের সময়সূচিতে দেখছি, পরের বাস ছাড়বে আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক পর। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে আমি যাত্রীছাউনির পাশের একটি চত্বরে গিয়ে বসি। পাশেই চলমান ফোয়ারা। ওটির বেদিতে বসে গিটারে ঝংকার তুলে গান গাইছে স্বর্ণকেশী তরুণী। কী চায় ও? লিরার কয়েকটি আধুলি? আচ্ছা, গান গাওয়া কি ওর পেশা? নাকি কেবলই শখের বশে এখানে গিটার নিয়ে বসেছে? হাওয়ার ঝাপটায় ওর চুলগুলো এলোমেলো উড়ে চলে। আমার হঠাত্ মনে হয়, গান শোনার প্রতিদানে ওকে এক মগ হট কফি কিনে দিলে কেমন হয়? সে প্রস্তাব দিলে মেয়েটি বাজনা থামিয়ে আমার দিকে ফিরে বলে—‘কী আশ্চর্য! ঠিক এই মুহূর্তে এক মগ কফির জন্যেই মনটা কেমন করছিল।’ আমার প্রস্তাব যে ওকে আনন্দ দিয়েছে, সেটি এই আহ্লাদিত কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝি। ‘তুমি যদি উল্টোদিকের ওই দোকানে যাও, তাহলে ওখানে গিয়ে আমার কথা বললেই হবে। ওরা জানে, আমি কোন কফিটা খাই।’ আমি ওকে অপেক্ষা করতে বলে সেই ক্যাফেটির দিকে এগোই। পেছনে শুনতে পাই—মেয়েটি আবারও গিটারের স্ট্রিং-এ হাত বুলিয়ে সুর তোলা শুরু করেছে।