যাতনে মান্য নষ্ট
ভোজনে পেট নষ্ট হয়
অসত্ লোকের সঙ্গ ধরা ভাল নয়।
অসত্ লোকের সঙ্গ ধরা
অকাজে কার্য করা।
কোদাল দিয়া চলা ফারা
বদনা দিয়া তামাক খায়।
ঝি নষ্ট গ্রামের হাটে
বৌ নষ্ট গুদারাঘাটে।
চুলা নষ্ট জিংগুলের খোঁচায়
অসত্ লোকের সঙ্গ করা ভাল নয়।
দীর্ঘদিন খুঁজে ফিরছি এই গানের কবিয়ালকে।
শান্তিপুরের ফুলতলার রেওয়াজ অনুযায়ী মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা গ্রামের প্রায় সকলেই পিরভক্ত। গ্রামের উত্তর পাশে আছে প্রাচীন বটবৃক্ষ, যার তলায় আছে সাধনার আস্তানা। এই আস্তানাকে কেন্দ্র করেই কালাই বয়াতি পালাকার হয়ে উঠেছিলেন। তার শিষ্য মালেক সরকারের গানের হাতেখড়িও এই মাজারে। মাজারে শোভা পায় ফুলতলার পির আব্দুস শুকুর মালঙ্গ বাবার ছবি। পাশেই আছে কুষ্টিয়ার বাবা সোলেমান শাহর ছবি। সোলেমান শাহ কিছুকাল এখানে এসে ছিলেন। তিনিই হুগলির ফুলতলার পির আব্দুস শুকুর মালঙ্গ বাবা ও বাংলাদেশের ভক্তদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী। টরকির চরের আজিজুল হক শাহ চিশতি ছিলেন মাজারের খাদেম। বটগাছের নিচে তিনি একটি চৌচালা ঘর তুলেছিলেন। ঘরটি আছে এখনো।
এখানেই একদিন খুঁজে বের করা গেল তার ছেলে জাহেদ আলী বয়াতিকে। তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেল আর জানা গেল এই গানের গীতিকার, সুরকার ও প্রথম গায়ক জহুর আলী বয়াতি, যাকে স্থানীয়রা কালাই বয়াতি বলে জানে। ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন মেস্তরি বানাইয়াছে’ গানের রূপকার আলাউদ্দিন বয়াতির সমসাময়িক কালের পালাকার। গায়ের রং অত্যধিক কালো হওয়ার কারণে কালাই বয়াতি নামে পরিচিত ছিলেন। পালায় জেতায় আছে তার বিশেষ নামডাক।
মুন্সীগঞ্জের টরকির চরের জমিদার ছিলেন শ্রীনাথ হালদার। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরাজ দেশ ভাগ করে দিল, হিন্দু মুসলিম রায়েট হলো। অদলবদল করে এপার-ওপার হয়ে গেল অনেক মানুষ। সেই নিয়মে হুগলি জেলার ফুলতলার এক হাজার ২০০ মানুষ চলে এল টরকির চরে। জমিদার শ্রীনাথ দেশান্তরিত হয়ে ঠাঁই নিলেন ভারতের হুগলির শান্তিপুরের ফুলতলা গ্রামে। চান মিয়া হাজি, কফিল উদ্দিন, আফিল খাঁ, গনি হাজি, হোসেন আলী প্রমুখ চলে এলেন টরকির চরে। কালাই বয়াতি ছিলেন শান্তিপুরের ফুলতলায়। শান্তিপুরের ফুলতলা গ্রামের সকলে চলে আসে মুন্সীগঞ্জের টরকির চরে। এই গ্রামের নাম হয়ে যায় ফুলতলা, অবশ্য সরকারি কাগজে এখনো এর নাম টরকির চর। ফুলতলা গ্রামের মানুষগুলো একটু বেশি সহজ-সরল আর গুরুবাদী।
জাহেদ আলী বয়াতি জানালেন, গুরুবাদী পরম্পরার সদস্য কালাই বয়াতির দাদা ওস্তাদ উকিল মুন্সী। ওস্তাদ কুষ্টিয়ার সোলেমান শাহ, সোলেমান শাহ’র পির ভাই বাহর আলী শাহ, সোলেমান শাহ’র গুরু আব্দুস শুক্কুর মালঙ্গ বাবা যার আসন ভারতের হুগলিতে। সই সিলসিলায় গুরুশিষ্য পরম্পরার সম্পর্ক রক্ষার কাজ করছেন কালাই বয়াতির জীবিত শিষ্য পালাকার মালেক সরকার। মালেক সরকার কালাই বয়াতির প্রধান শিষ্য। তার শিষ্যদের মধ্যে আব্দুল বাতেন মারা গেছেন। যশোরে একজন শিষ্য আছে তার নাম কালাই বয়াতির নামে জহুর আলী। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় কালাই বয়াতির এক শিষ্য আছেন নাম তার রহমান। যিনি এখন কালাই বয়াতির কথামতো মালেক বয়াতির শিষ্যত্ব নিয়েছেন। রহমানের বাস গোলাপনগর ভেড়ামারায়। সেখানে প্রতি বছরের জ্যৈষ্ঠ মাসের ৮ তারিখ ও চৈত্র ২৭, ২৮, ২৯ তারিখ উরশ হয়। আর ভেড়ামারায় মালঙ্গ বাবার উরশ আশ্বিন মাসের ১২ তারিখ। গুরু পরম্পরার এই লাইনে ফুলতলার আব্দুল আজিজ শাহ চিশতি ছিলেন সোলেমান শাহ’র খাটি শিষ্য। তিনি ফুলতলার বটতলায় ধ্যানে থাকতেন। যার জন্য তিনি একটি সুদৃশ্য জলটঙ্গি ঘর বানিয়েছিলেন। ঘরটি এখনো আছে। আষাঢ় মাসের ৯ তারিখ আজিজ শাহ চিশতির প্রয়াণ দিবস। এ উপলক্ষে সেখানে উরশ হয়। বর্তমানে নাম করার মতো এবং বিশেষ তথ্য দেওয়ার মতো মালেক সরকার আছেন। মিরপুরের শাহ আলী (র.) মাজারে গেলে কালাই বয়াতি সম্পর্কে সবকিছুই জানা যাবে।
এক বিকেলে মিরপুর শাহ আলী (র.) মাজারের কাছেই মার্কেটের দোতলায় এক রুমে সুর সাধনারত মালেক সরকারকে পাওয়া গেল। মালেক সরকার শুরু করলেন—
জহুর বয়াতির গায়ের রং ছিল অসম্ভব রকমের কালো এবং অসাধারণ মায়াবি চেহারার অধিকারী। যার কারণে লোকমুখে নাম হয়ে যায় কালাই বয়াতি। নিজে ব্যবহার করতেন কালা সাঁই নামটি। অসামান্য বুদ্ধিমত্তা আর প্রজ্ঞায় কথার পিঠে কথা গেঁথে ঘায়েল করতেন প্রতিপক্ষ পালাকারকে, এমন হয়েছে বাঘা বাঘা পালাকারের সঙ্গে পালা গেয়ে রাতকে সকাল করেছেন। পালায় হারের ইতিহাস তার জীবনে কম। যার কারণে তার আরেকটি নাম প্রচলিত ছিল এলাকায় ও শিল্পীসমাজে—ঠেঁটা কালাই।
ঠেঁটা কালাই নামকরণের পেছনে আছে একটি কাহিনি—
জহুর বয়াতি গানের আসরে কখনোই হার মানতেন না। সেই সময়কার ঢাকা অঞ্চলের বিখ্যাত পালাকার—আলাউদ্দিন বয়াতি, মারফত আলী বয়াতি, হালিম বয়াতি। গুহের কান্দি গ্রামে আলাউদ্দিন বয়াতির সঙ্গে কালাই বয়াতির পালা। সন্ধ্যা রাতে পালা নিয়ে স্টেজে উঠলেন আলাউদ্দিন বয়াতির সঙ্গে। রাত দ্বিপ্রহর পার হলো। সাধারণত পালা মধ্যরাতেই শেষ হয়ে যায়। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ বাড়ি গিয়ে ঘুমাতে যায়, পরবর্তী দিনে জমিতে কাজ করতে যেতে হবে। কিন্তু পালাটা এতই জমেছে যে কেউ উঠছে না। সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো গান শুনছে। কেউ কাউকে হারাতে পারছে না। ফজরের আজান হলো। নামাজ পরে ফসলের খেতে কাজ করতে যাবে শ্রোতারা, আজকে আর ঘুমের কাম নাই। কাজেই অসমাপ্ত পালায় ক্ষান্ত দিতে হলো। সকলে বলবলি করতে থাকল কী ঠেঁটারে বাবা! এমন জাঁদরেল পালাকার আলাউদ্দিন বয়াতিকে পর্যন্ত সারারাত স্টেজে ধরে রাখল। নাম হয়ে গেল ঠেঁটা কালাই। তার অর্জিত ঠেঁটা তকমা এখন তার শিষ্য মালেক সরকার বহন করছেন, ঠেঁটা মালেক হিসেবে।
কালাই বয়াতির প্রিয় গানগুলোর মধ্যে—
দয়াল চান কি গুণ জানে গো
আপনার জন্যে কান্দে ভক্তের প্রাণ
নয়ন চায় তার রূপ দেখিতে
কর্ণে চায় তর নাম শুনিতে
জিহ্বায় চাহে করতে গুণগান
আমি মস্তকেতে রাখতাম
তোমায় রে সোলেমান
নাম নিতাম দিনে রাতে।
আমি যে তোমারে ডাকি
দেখা দেও না আমি দেখি।
তোমায় দেখবো বলে
আশায় গো তোমার।
সোলেমান কি গুণ জানে গো
আপনার জন্য কান্দে আমার প্রাণ
ঐ সময় মুসলমানি আর বিয়ে বাড়িতে গান দেওয়া হতো। সেই সব অনুষ্ঠানে স্বর্ণের মেডেল দেওয়া হতো বাহাসে জয়ীকে। মতলবের দজলা গ্রামে একবার বিয়ের বাড়িতে আসর বসল। আলাউদ্দিন বয়াতির সঙ্গে সেদিন কালাই বয়াতির বাহাস। কুলসুমের জারি, ওয়াজ করনির জারি, রাসুলের ওফাত, আইয়ুব নবির জারি, জয়নাল উদ্ধার, শহিদে কারবালা, হাসানের বিষপান গানগুলো যখন করতেন মানুষ কাঁদতে কাঁদতে বিভোর হয়ে যেত। উনি ছিলেন পড়াশোনা না করা মানুষ, কিন্তু গানের এত সুর আর মিল-ছন্দ আসত কোথা থেকে! এসব জারি যখন করতেন নিজে চোখের জলে, শ্রোতাদের চোখের জলে সভাস্থল ফানাফিল্লাহ হয়ে যেত। ওইবার কালাই বয়াতি সোনার মেডেল ও প্রচুর টাকা-পয়সা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।
কালাই বয়াতি প্রথম জীবনে মূলত প্রেম-রসের গান করতেন আর পালাগান করতেন। গুরুর কোপে একবার গায়কীশক্তি লোপ পায়। গলায় শব্দ বের হতো না। পরে আবারও গুরুর বরে গায়কীশক্তি ফিরে পান। তবে এই শর্তে যে, প্রেম-রস আর ভব জীবনের গান নয়, তাকে সারাজীবন ভক্তি-রস আর পরমাত্মার বন্ধনা করতে হবে। পালাগান করতে হলে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে জয়ের পথে যেতে হয়। তাই গুরু সোলেমান শাহ বললেন, পালাগানে নিজধর্ম নষ্ট হয়। গুরুপদে থাকলে পালাগান করা যাবে না। তাহলে কী করব? গুরু বললেন, তুই শুধু আল্লাহ ও নবিতত্ত্ব গান করে মানুষকে বোঝাবি। আর এই গান করে কারো কাছে কিছু চাইতে পারবি না। তোকে মানুষ দয়া করে যা দেয় তা-ই দিয়ে জীবনযাপন করবি। শুরু হলো ঠেঁটা কালাইর ফকিরি জীবন। আল্লাহ-রাসুলের বয়ান যখন গাইতেন তখন অঝর নয়নে কাঁদতেন। এছাড়া সকালে ফজর নামাজের প্রার্থনার সময় খুব কাঁদতেন। প্রার্থনায় কালাই বয়াতির কান্নায় তার পাশে থাকা মানুষজনের ঘুমানো হতো না। সোলেমান শাহ ছিলেন কালাই বয়াতির ধ্যান ও জ্ঞান। কথায় কথায় মুরশিদ সোলেমান শাহর গুণগান করতেন।
শ্বাসের রোগের জন্য গুরু তাকে ধুতরা পাতা খেতে বলেছেন, সাদা ধুতরা। তাই তিনি ধুতরা পাতা শুকিয়ে বিড়ি বানিয়ে খেতেন। গুরুর ওপর ছিল অগাধ বিশ্বাস। গুরু যা বলতেন তিনি তা-ই করতেন। কখনো খুব নামাজ পরতেন। আবার কখনো নামাজ পরতেন না। কেউ জানতে চাইলে বলতেন, এটা তো আমার ব্যাপার। মানুষ যে সব অন্যায় করে এটা ভেবে তিনি সবসময় কষ্ট পেতেন। সমাজ সংসারে থেকেও তিনি কোনোদিন মানুষের কষ্ট হয় এমন কাজ করতেন না। মানুষ হিসেবে ছিলেন একজন অসাধারণ গুণী। রাগ গোস্সা ছিল না তার মধ্যে। মানুষের প্রতি তার ছিল অগাধ দয়া। খাওয়ার সময় একা খেতে পারতেন না। আশপাশে কাউকে না পেলে মানুষ ঢেকে তারপর খেতে বসতেন।
গুরুবাদী ধারার সাধক কালাই বয়াতি প্রায়ই গুরুর বাড়ি ঘুরে আসতেন। গুরু সোলেমান শাহ ছিলেন তার ধ্যান-জ্ঞান। একবার কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় গুরুর দরবারে গেছেন কালাই বয়াতি। গুরু জপ নিতে নিতে ভবজগত্ ভুলে গেছেন। মানুষ তাকে পাগল বলে সম্বোধন করতে শুরু করল। প্রত্যেক কথায় কথায় কালাই বয়াতি সোলেমান শাহ’র নাম জপ করতে থাকেন। একসময় দরবার থেকে কালাই বয়াতিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বাড়িতে এসে ও সবকিছুতে সোলেমান শাহ’কে দেখতে শুরু করেন। ভাত খেতে বসলে বলেন সোলেমান শাহ, মাছি ধরে বলেন সোলেমান শাহ, রাস্তায় হাঁটছেন তো হঠাত্ বলে উঠলেন এই যে সোলেমান শাহ, পিঁপড়ায় কামড় দিলে বলেন এই সোলেমান শাহ। কাজকর্ম করেন না, শুধু গুরু নাম জপ করে ফেরেন।
প্রতি বছর সোলেমান শাহ ভেড়ামারা থেকে ফুলতলার আজিজ মস্তানের আস্তানায় আসেন আশেকানদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে, তিনি আসলেন। সকলে সোলেমান শাহের সঙ্গে দেখা করতে এলেন আস্তানায়। কিন্তু বাবা যেন কাকে খুঁজছেন, চারদিকে বাবার চোখ খুঁজে ফিরছে অন্য কাউকে। না পেয়ে বাবা অবশেষ বললেন, তোমাদের এখানে একজন পাগল আছে, কালাই বয়াতি। সে কই, তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। একজন জানালেন আছেন তার বাড়িতেই। বাবা কালাই বয়াতিকে দেখার বাসনা জানালেন। কেউ জানাল সে তো বদ্ধ উন্মাদ, তাকে আনা যাবে কী করে। কালাই বয়াতিকে নিয়ে আসা হলো, তিনি সোলেমান শাহ’র সামনে বসলেন।
বাবা শুরু করলেন—‘কালাই, এই যে তুই পাগলামি করিস, এটা ঠিক? তোর বাড়ির পাশে বাড়ি চান্দু হাজির। চান্দু হাজি যদি মুন্সীরহাট থেকে একটা কাঁঠাল নিয়ে বাড়ি ফিরে। তোর ছেলে-মেয়েরা যদি সেই কাঁঠাল দেখে তাকিয়ে থাকে, মনে কষ্ট পাবে। ছেলেমেয়েরা মনে মনে বলবে, কোথাকার সোলেমান শাহ আমার বাবাকে পাগল বানিয়ে দিল। আমার বাবা যদি ভালো থাকত তাহলে আমাদের জন্য কাঁঠাল নিয়ে আসত। তাহলে কি তোর ফকিরি হবে? তোরও ফকিরি হবে না, তোর গুরুরও ফকিরি হবে না।’ এই বলে সোলেমান শাহ হাঁক দিলেন, ‘কেউ একজন একটু পানি নিয়ে এসো’ পানি আনলে, সেই পানি থেকে হাতের তালুতে অল্প পরিমাণ পানি নিয়ে, কালাই বয়াতিকে খাইয়ে দিলেন। কালাই বয়াতি তখনই সুস্থ হয়ে উঠলেন। এরপর থেকে কালাই বয়াতি গান ছেড়ে দিলেন। জমিজমায় কাজ করতেন আর নিজে নিজে আপন মনে গান করতেন।
কালাই সাঁইয়ের বাড়ি ছিল মুন্সীগঞ্জের জাজিরা গ্রামে। সোলেমান সাঁইয়ের পদতলে জায়গা পেতে তিনি ফুলতলা চলে আসেন। কালাই বয়াতির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ছিল সোলেমান শাহ। তার চার সন্তান। দুই ছেলে—এশাক আলী, জাহেদ আলী। এশাক আলী গত হয়েছেন, জাহেদ আলী বাবার গানের অল্পটা ধরে রেখেছেন। দুই মেয়ে ফিরোজা বেগম, রওশন আরা বেগম। টরকির চরের উত্তর পাশে আছে এক প্রাচীন বটবৃক্ষ। ফুলতলার ছায়া-সুনিবিড় বটতলায় ভিড় জমে প্রতিদিন বিকেলে। গান হয় গভীর রাত অবধি। এই গ্রামেই কালাই বয়াতি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ২ চৈত্র (১৬ মার্চ ১৯৯৯ সাল)। কালাই বয়াতিকে বাড়িতে কবর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর ছেলেমেয়েরা বাড়ি থেকে একটু দূরে কবর দিলেন। ভক্তরা মনে করেন নিজ বাড়িতে কবর দেওয়া হলে বছরে বছরে স্মরণ হতো, মানুষ মনে রাখত। কালাই বয়াতির জন্ম তারিখ কেউ বলতে পারলেন না।
সারাজীবন শিল্পসাধনা করে ধন নয়, মান নয়, একটু স্বীকৃতি কি পাওয়ার অধিকার রাখেন না একজন শিল্পী? অতি পরিতাপের বিষয় এই গুণী সাধক গুরুর নাম এখন কালের গর্ভে বিলীন। ব্যক্তি উদ্যোগকে নাইবা ধরলাম, বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের ধারক একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত মুন্সীগঞ্জের লোক ইতিহাসে তার সমসাময়িক আলাউদ্দিন বয়াতি, মারফত বয়াতির নাম থাকলেও, কালাই বয়াতির নামটি স্থান পায়নি। একজন লোক গায়ক ও সাধকের নাম এভাবে ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া অন্যায়। যত শিগগির কালাই সাঁইয়ের নাম সংকলনে অন্তর্ভুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।