এই মুহূর্তে দুলাল মিয়ার হোটেলে কাস্টমারের ভিড়বাট্টা নেই একদম। খাবার হোটেলটাতে সব চেয়ার-টেবিলই ফাঁকা পড়ে আছে। এই ভরদুপুরেও কেউ খেতে আসেনি। হোটেলে তো বটেই এর আশপাশেও কোনো চাঞ্চল্য কিংবা ব্যস্ততা নেই। আজ বুধবার। ছুটির দিনও নয়। আগে এ সময় দুলালের হোটেলে সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের ভিড়ে ভেতরে ঢোকাটাই একরকম কঠিন কাজ ছিল। বাইরে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হতো এখানে খেতে আসা লোকজনের। সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরির কয়েক হাজার শ্রমিকের মধ্যে অনেকেই দুপুর এবং রাতের খাবার খেতে দুলালের হোটেলেই ঢুঁ মারত। ফ্যাক্টরির গেটে আরো বেশ কয়েকটি খাবারের দোকান রয়েছে। তবে দুলালের হোটেলটিই তুলনামূলকভাবে জমজমাট ছিল বেশি। কম খরচে ভালো খাবার খেতে এখানেই ভিড় করত বেশিরভাগ নারী-পুরুষ শ্রমিক। অথচ, আজ পুরো এলাকাটাই পুরোপুরি নীরব, দারুণ সুনসান। একসময়ের ব্যস্ততা, কোলাহল, চাঞ্চল্য—সবই যেন হারিয়ে গেছে এই জনপদ থেকে। রূপকথার গল্পে যেমন শয়তান জাদুকরের কারসাজিতে ব্যস্ত, চঞ্চল, সচল জনপদ অভিশপ্ত বিরান এলাকায় পরিণত হয়, তেমনি অবস্থা হয়েছে এখন ফুলপুর বাজারের।
সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরিকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে জমে উঠেছিল বাজার এলাকা। ঢাকা শহর থেকে খুব বেশি দূরে না হলেও একসময় ফুলপুর ছিল বিরানভূমি, জঙ্গলাকীর্ণ একটি গ্রাম। জুতার কারখানা গড়ে ওঠার পর থেকে কয়েক বছরে খুব দ্রুতই এখানকার দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। বিরানভূমি, জঙ্গল, ক্রমেই হারিয়ে গিয়ে গড়ে ওঠে বসতি। অনেক মানুষের আনাগোনা এবং পদভারে ব্যস্ত জনপদে পরিণত হয় গোটা এলাকা। কারখানার শ্রমিকদের থাকার জন্য বাড়িঘর নির্মিত হয়। স্থানীয়দের অনেকেই ঘর তৈরি করে শ্রমিকদের থাকার জন্য ভাড়া দিতে শুরু করে। সু ফ্যাক্টরিতে নতুন নতুন ইউনিট চালু হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক শ্রমিক এসে এখানে চাকরি নেয়। তিন-চার হাজার শ্রমিক এবং তাদের পরিবার-পরিজনের বসবাসের কারণে গত আট-নয় বছরে ফুলপুরের চেহারাটাই অল্প অল্প করে বদলে গিয়েছিল।
গত আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে ফুলপুর বাজারের প্রাণ সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরি। জুতার কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে একে একে বেকার হয়েছে সব শ্রমিক। মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে প্রায় সবাই। তাদের বেশিরভাগই প্রতি মাসের বেতনের টাকায় ঘর ভাড়া করে কোনোভাবে খেয়ে পরে সংসার চালাত। এর বাইরে ভবিষ্যত্ বিপদ-আপদের জন্য কেউ কেউ টাকা-পয়সা জমিয়ে রাখলেও বেকার জীবনের ঘানি টানতে টানতে সেটাও শেষ করেছে। দুঃসময়ের মোকাবিলা করতে করতে তাদের সবার পিঠ দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে। শেষমেশ আর উপায় খুঁজে না পেয়ে তাদের বেশিরভাগই এলাকা ছেড়েছে।
সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরির মালিক দুই ভাই জামাল উদ্দিন ও কামাল উদ্দিন। তারা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে জুতা তৈরি করে বিদেশে রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেছিল। শুরুতে ব্যবসার আকার তেমন বড় না হলেও দিনে দিনে দুই ভাইয়ের জুতার ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। ব্যাংকও তাদের ব্যবসা ও কারখানায় অকাতরে বিনিয়োগ করেছিল হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একসময় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন ইত্যাদিতে কারখানার মালিক দুই ভাইয়ের অসততা, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ব্যাংক ঋণের টাকার নানা কায়দায় অপচয়-অপব্যবহার ও বিদেশে অবৈধভাবে পাচারের প্রমাণ মেলে। ঋণ কেলেঙ্কারি ও বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারখানার মালিক এক ভাই জামাল উদ্দিন এখন জেলখানায় রয়েছে। ছোটভাই কামাল উদ্দিন কোনোভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এ কারণে বন্ধ হয়ে গেছে সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরির সব কর্মকাণ্ড।
কাস্টমার নেই বলে দুলালের খাবার হোটেলটি বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকমাস আগেই। তারপরও প্রতিদিন বন্ধ হোটেলের দরজা খুলে কিছুক্ষণ বসে থাকে দুলাল মিয়া। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে জমি বিক্রি করে দুটি ইজিবাইক কিনেছে সে। এর মধ্যে একটি নিজে চালায়, অন্যটি ভাড়ায় দিয়েছে। এভাবেই জীবনের তাগিদে খুব দ্রুতই পেশা বদলে গেছে ফুলপুরের অনেকেরই। বিশাল জুতা ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দারুণ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফুলপুরসহ আশপাশের জনপদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা ফেরত দিতে না পারায় জুতা কারখানার সম্পত্তি বিক্রি করতে নিলামে তোলা হয়েছে।
সহসা সেভেন স্টার সু ফ্যাক্টরি চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় দুই চোখে শুধুই অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে নাদিরা বেগম। সেও কাজ করত জুতা ফ্যাক্টরিতে। তার স্বামী রমজান শুরুতে এই কারখানায় চাকরি নিয়েছিল। কাজ করত কারখানার কাটিং সেকশনে। এর আগে পুরান ঢাকায় জুতার কারখানায় চাকরি করত সে। ফুলপুরে সেভেন স্টার জুতা ফ্যাক্টরি চালু হওয়ার পর পুরান ঢাকার চাকরি ছেড়ে এখানে এসে কাজ নিয়েছিল। এখানকার বেতন তুলনামূলকভাবে একটু বেশি হওয়ায় রমজান আগ্রহী হয়ে এসেছিল। তাছাড়া পুরান ঢাকায় রাতের বেলায় জুতা তৈরির কাজ করতে হতো। কেরানীগঞ্জের বাসায় সুন্দরী যুবতী বউকে রাতের বেলা একাকী রেখে এসে জুতা তৈরির কাজ করতে মোটেও ভালো লাগত না তার। একধরনের অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা, শঙ্কা বুকের মধ্যে দলা পেকে উঠত কেবলই। চেনাজানা লোকজনের কাছে ফুলপুরে সেভেন স্টার জুতা ফ্যাক্টরিতে চাকরির খোঁজ পেয়ে পুরান ঢাকার কাজ ছেড়ে ফুলপুরে চলে এসেছিল। নিজে কয়েক বছর চাকরি করার পর নাদিরাকেও প্যাকেজিং সেকশনে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ভালো বেতন, ঘরে অলস বসে থেকে কী লাভ—তেমন ভাবনায় জুতা ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতে আপত্তি করেনি সে। স্বামী স্ত্রী দুজনে একসঙ্গে জুতার কারখানায় কাজ করতে গিয়ে ফুলপুরের মাটি ও মানুষগুলোর প্রতি একধরনের আলাদা টান অনুভব করতে শুরু করে। প্রথম দিকে ভাড়া বাসায় থাকলেও একপর্যায়ে নিজেদের জমানো টাকা-পয়সা এবং নাদিরার বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া এক খণ্ড জমি বিক্রির টাকা সব মিলিয়ে ফুলপুরে কারখানার কাছাকাছি কয়েক শতাংশ জমি কিনে ছোটখাটো ঘর বানিয়ে থাকতে শুরু করে। জায়গা কিনে ছাপড়া ঘর বানাতেই পুঁজিপাট্টা সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আয় বাড়াতে একপর্যায়ে নাদিরা স্থানীয় একটি এনজিও থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পাঁচটি কাঁচাপাকা ঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়েছিল। যেখানে জুতা কারখানার শ্রমিকরা থাকত। সবকিছুই ঠিকঠাকমতো চলছিল। প্রতি মাসে ঘর ভাড়া হিসেবে যা পেত নাদিরার তা দিয়ে এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়ে যেত। এভাবে আগামী কয়েক বছরে ঋণের সব টাকা পরিশোধ হয়ে যাবে, ভেবেছিল সে। কিন্তু এভাবে হঠাত্ করে কারখানা বন্ধ হয়ে সব শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে, এখানকার কেউ ভাবেনি।
কারখানা বন্ধ হওয়ার পরও কয়েক মাস ভাড়া চললেও একসময় ভাড়াটিয়ারা ঘর ছেড়ে চলে গেছে। গত তিন মাস ধরে ঘরভাড়া না পাওয়ায় এনজিওর ঋণের কিস্তির টাকা ফেরত দিতে পারছে না নাদিরা। এনজিওর লোকজন ঋণের টাকা পরিশোধে বারবার চাপ দিচ্ছে। বেশ কয়েকবার এসে তাগিদ দিয়ে গেছে তারা। সময়মতো ঋণের কিস্তির টাকা ফেরত দিতে না পারলে থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে বাধ্য হবে তারা, কড়া ভাষায় বলে গেছে।
নিজের জমানো টাকা-পয়সা যা অবশিষ্ট ছিল তা দিয়ে কোনোভাবে খেয়ে পরে দিন কেটেছে গত কয়েক মাস। এখন ঘরে বাজার করার মতো টাকা-পয়সাও নেই। এ অবস্থায় কী করবে, নাদিরা ভেবে পায় না। স্বামী রমজান কিছুদিন আগে কাজের খোঁজে আবার পুরান ঢাকায় গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানেও কোনো চাকরি নেই। রমজান জুতা তৈরির কাজ ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। পুরান ঢাকা থেকে ফিরে ছেলে বাবলুকে নিয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চলে গেছে রমজান। তারও কোনো খোঁজ নেই। গ্রামের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছিল। ঋণের টাকা পরিশোধে কোনো ব্যবস্থা হয়েছে কি না জানতে চেয়েছিল নাদিরার কাছে। কোনো জবাব দিতে পারেনি অসহায় এই নারী।
এখন দুলালের হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে নাদিরা কারো জন্য। তাকে দেখে দুলাল মিয়া জানতে চায়, ‘এনজিওর ট্যাহা শোধ করার কোনো ব্যবস্থা করতে পারছো? তারা তো এইবার কঠিন ব্যবস্থা নিবো কইছে, শুনলাম।’ নাদিরা মাথা নেড়ে জানায়, ‘নারে ভাই, ট্যাহা শোধ করমু কোত্থেইকা। আমি তো ঘরভাড়া হিসাবে যা পাইতাম, তা-ই দিয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতাম। ভাড়াটিয়ারা চইল্যা যাওয়ার পর আর ট্যাহা পামু কই? আমি তো দুই চোখে শুধু আন্ধার দেখতাছি। কী যে হইবো! বাপের বাড়ির সামান্য জায়গা যা পাইছিলাম সেইডা বেইচ্যা এইখানে জমি কিনছিলাম। এহন ঋণের ট্যাহা শোধের কোনো উপায় তো দেখতাছি না।’
‘আমার অবস্থা তো আরো শোচনীয়। খাওনের এই হোটেলডা বন্ধ। যে কয়ড়া ঘর তুইল্ল্যা ভাড়া দিছিলাম সেইগুলাও খালি হইয়া পইড়া আছে কয়েকমাস ধইরা। জমি বেইচ্যা দুইডা গাড়ি কিনছি, সেইগুলোও ঠিকমতো চালাইতে পারতেছি না প্যাসেঞ্জারের অভাবে। আমিও তো সমিতির কাছ থেইক্যা ঋণ করছি। সেই ঋণের টাকা শোধ দিমু কেমনে, ভাইব্যা কূল পাইতেছি না। হায় মাবুদ, সামনে যে কী আছে কে জানে,’ বলতে বলতে দুলাল সামনের রাস্তা ধরে উদ্ভ্রান্তের মতো হনহন করে হাঁটতে থাকে। সে কোথায় যাবে কে জানে।
তার মতো আরেকজন বিপদগ্রস্ত, অসহায় মানুষকে দেখে নাদিরার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। দুলাল মিয়া চলে গেলেও নাদিরা ঠিক আগের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে অপেক্ষা করছে সিরাজুলের জন্য। কখন সে আসবে, তার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছে নাদিরা। সিরাজুল ফুলপুরে নাদিরার বাড়িতে আগে কোনোদিন আসেনি। এখানকার পথঘাট তার অচেনা। মোবাইলে সেভেন স্টার জুতা ফ্যাক্টরির গেটে বড় খাবার হোটেলের সামনে আসতে বলেছে সিরাজুলকে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করবে বলেছে নাদিরা।
সিরাজুল নাদিরাদের গ্রামেরই মানুষ। সেই কিশোরী বেলা থেকেই নাদিরার প্রতি অনেক দুর্বল ছিল মানুষটা। আকারে ইঙ্গিতে, কথাবার্তায় নিজের মনের কথা বলতে চেয়েছে অনেকবার। নাদিরা সব বুঝলেও সিরাজুলের ভালোলাগার অনুভূতির জবাবে কিছু জানাতে পারেনি। একসময় চাকরি নিয়ে মালয়েশিয়া চলে যায় সিরাজুল। এভাবে কেটে যায় কয়েকবছর। একসময় মালয়েশিয়া থেকে ভালো টাকা রোজগার করে দেশে ফিরে আসে সিরাজুল। ততদিনে গ্রামের সেরা সুন্দরী মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। নাদিরা স্বামীর হাত ধরে ঢাকা শহরে চলে গেছে। সিরাজুল দেশে ফিরে তার অনেক পছন্দের নাদিরার বিয়ের খবর শুনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। তার ইচ্ছে ছিল মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে নাদিরাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে এবং তাকে বউ করে ঘরে তুলবে।
মনের দুঃখে বেশ কিছুদিন অস্থির সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত বিয়ে শাদি করে ঘর-সংসার শুরু করে সিরাজুল। তার সবকিছু সহজ-স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও মনে মনে আজও সে নাদিরাকে ভালোবাসে। তাকে মন থেকে একেবারে মুছে ফেলতে পারেনি। নম্বর জোগাড় করে মালয়েশিয়া থেকে বেশ কয়েকবার মোবাইলে নাদিরার সঙ্গে কথা হয়েছে সিরাজুলের গত কয়েক বছরে। একসময়ের ভালোলাগা একান্ত প্রিয় মানুষটির ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের কথা জানতে চেয়েছে সিরাজুল। অনেকদিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না নাদিরার। পরপুরুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে সংসারে অশান্তি হবে, স্বামী জানতে পারলে নানা ধরনের সন্দেহ করবে ইত্যাদি ভেবে নাদিরা ইচ্ছে করেই সিরাজুলের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি কিংবা কোনো যোগাযোগ রাখেনি।
মালয়েশিয়ায় চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে সিরাজুল। গ্রামে তিনতলা পাকা দালান তুলেছে। ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে। বউ-বাচ্চারা সেখানে থাকে। নিজস্ব গাড়িতে তারা চলাফেরা করে। সিরাজুলের বিত্তশালী হয়ে ওঠার সব খবরই জানত নাদিরা। এ নিয়ে তার মনে কোনো আক্ষেপ কিংবা দুঃখবোধ ছিল না। তবে জুতার কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার পর বেকারত্বের বোঝা টানতে গিয়ে এবং এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় চরম অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে সে। সিরাজুলের নতুন মোবাইল নম্বর জোগাড় করে নিজেই ফোন করেছে তার কাছে। নাদিরা নিজের বর্তমান বিপর্যস্ত সময়ের কথা খুলে বলেছে সিরাজুলের কাছে। এসময় তার সাহায্য পেলে বিপদ থেকে কিছুটা রেহাই পেত, বলেছেও। সব শুনে সিরাজুল নাদিরার চরম বিপদে তার পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আজ সে এখানে আসবে দুপুরে, মোবাইল ফোনে জানিয়েছে।
নাদিরা দুলালের বন্ধ হয়ে যাওয়া হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে সিরাজুলের কথা ভাবছিল এতক্ষণ। লোকটিকে সামনাসামনি দেখেছে সেই কবে, বিয়ের আগে কিশোরী বেলায়। গ্রামে পথ চলতে কিংবা পুকুরপাড়ে নয়তো ধানখেতের পাশে হঠাত্ হঠাত্ সামনে এসে দাঁড়াত সিরাজুল। আকারে ইঙ্গিতে, ইশারায় কথাবার্তায় নিজের মনের দুর্বলতার কথা খুলে বলতে চাইত সে। নাদিরা সব বুঝলেও তার নিজের করার কিছু ছিল না। আজ সে আসছে তার কাছে। তার বিপদে সহায়তা করতে আসছে সিরাজুল। এখন নাদিরা যে চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে আর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে পরপুরুষ সিরাজুলের সাহায্য প্রার্থনা করতে মন না চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাকে এখানে আসতে বলেছে।
সিরাজুল হয়তো আসছে নাদিরার প্রতি আগের দুর্বলতার কারণে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে। এখন তার কাছে অনেক টাকা। বিত্ত-বৈভবের কোনো অভাব নেই তার। সে চাইলে নাদিরার বিপদে তার পাশে এসে দাঁড়াতে পারে। তার একটুখানি সহায়তা নাদিরাকে চরম অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে। আর এই সাহায্য-সহযোগিতার বিনিময়ে যদি তাকে একাকী পেয়ে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে চায়, অশালীন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব দেয় তাহলে কী করবে সে, ভাবতে গিয়ে মনটা দারুণ চঞ্চল হয়ে ওঠে নাদিরার। হালকা শীতের মধ্যেও তার শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যায়।