অয়েজুল হক
প্রাইমারি স্কুলের হেড মাস্টার হামিদ সাহেব চায়ের দোকানে বসে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকালে হাঁটাহাঁটির পর এলাকার হাঁটাহাঁটি পার্টি চায়ের দোকানে এসে সংবাদ দেখে। সংবাদে যা বলা হয়, তার প্রথম লাইন শুনেই সরাসরি ব্যাখ্যায় চলে যান হামিদ সাহেব। এই যে ডেঙ্গু আতঙ্ক। মাথা কাটা গুজব নিয়ে গণপিটুনির মহামারি! একদিকে মানুষ, আরেকদিকে মশা। এখন তো সকালে রাস্তায় হাঁটতেই ভয় করে। কখন না জানি মশা এসে কামড় দেয়। কোনদিন না জানি মানুষ কিলবিল করে ধরে! এদিকে ডায়াবেটিস ধরে বসে আছে। না হেঁটে উপায় নেই! ‘নির্মম...’ শব্দটা বলে ত্রিশ সেকেন্ডের এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
হাসু মিয়া হাঁটাহাঁটি পার্টির সদস্য। জোর গলায় বলেন, ‘ভয় পান কেন, আমি তো সাথে থাকি।’ হাসুর কথায় হামিদ সাহেব কিছুটা রেগে গিয়ে বললেন, ‘থামো। এক দিন আসো তো তিন দিন ঘুমাও। দরজায় এত জোরে জোরে বাড়ি দিই, কোনো সাড়াশব্দ পাই না। জ্যান্ত মানুষ আবার এমন ঘুমায়! কবরের লাশ হলেও বিরক্তবোধ করার কথা।’
হাসু চমকে ওঠে। দরজার বাইরে কড়া ভাঙছে। ভেতরে ছিটকানি নড়েচড়ে গেছে। ভেবেছে, রাতের বেলা চোরের কাজ। আজ রহস্য বোঝা গেল! হামিদ সাহেবের গুঁতাগুঁতিতে দরজার এই বেহাল দশা। কিছুটা রাগ-অভিযোগ মিলিয়ে বলল, ‘ধুর ভাই, আপনি আর আমারে ডাকবেন না। আপনার সাথে আর নাই।’
হামিদ সাহেব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, ‘হঠাত্ এ কথা!’
‘আপনি আমার দরজার কী অবস্থা করছেন? আমি তো ভেবেছিলাম চোরের কাজ।’
হামিদ সাহেব মুহূর্তেই ডেঙ্গুর মতো ভয়ংকর মূর্তি ধারণ করে বললেন, ‘আমি করেছি? আমি চোর! তোমাদের মতো সন্দেহ ভর্তি মানুষের জন্যই দেশের বেহাল অবস্থা। ছাগল কোথাকার!’
হাসু উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আপনি শিক্ষিত মানুষ বলে যারে যা মন চায় তাই বলবেন?’
হাসুর পাশে বসা কোরবান আলী হাসুকে টেনে বসিয়ে বলল, ‘ছাগলের কিন্তু অনেক দাম। ছাগল কইছে, তাতে দাম কমে নাই, বাইড়া গেছে। ফার্মের মুরগি তো কয় নাই।’
হাসুর রাগ আরো বাড়ল, গদগদ করে উঠে বাড়ির পথে পা বাড়াল। যাওয়ার পথে তুমুল বৃষ্টি হলো। আকাশে গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। ইদানীং মেঘ দেখলেও ভয় করে। বর্ষা-শরত্ বলে কিছু নেই। এদিকে ওদিকে প্রচুর মানুষ বজ্রপাতে মরে যাচ্ছে। আগে এমনটা শোনেনি। ছোটবেলায় মেঘ বৃষ্টি মাথায় করে সারাদিন ফুটবল খেলেছে। তার সকাল শুরু হতো খেলায়, শেষ হতো সন্ধ্যায় বাপজানের কঞ্চির বাড়িতে। হামিদ সাহেব একদিন বললেন, ‘বজ্রপাত এখন মহামারি।’ সেদিনও একচোট বিতর্ক হলো। হাসু বলল, ‘বজ্রপাত মারামারি! পাগলের মতো এইডা কী কন! আপনার মাথায় পড়লে আপনি মারামারি করতে পারবেন?’ সেদিন অবশ্য হামিদ সাহেব রাগেননি। একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘মারামারি না রে পাগলা, মহামারি। বিশেষ্য পদ। মড়ক, যে কারণে বহু লোক মরে।’
দুনিয়ায় পদের কোনো শেষ নেই। বজ্রপাত যে পদই হোক, তাতে যে বহু লোক মরে যাচ্ছে এটা সত্য। দুশ্চিন্তার কারণ। হাসু ভয়ে ভয়ে বাড়ি পৌঁছাল। স্ত্রী শিরিন দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আকাশে মেঘ। এতবার কল দিই মোবাইল ধরো না!’ হাসু পকেট থেকে মোবাইল বের করল। গরমে মোবাইলের পিপাসা লাগে কি না কে জানে। বৃষ্টির পানি খেয়ে একেবারে টইটুম্বুর। বউয়ের সামনে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল, ‘মোবাইলও পানি খায়। ওরও তো পিপাসা লাগতে পারে। মোবাইল ঠিক করতে হবে। মোবাইল ছাড়া এ যুগে চলা মুশকিল।’
বিকালে শহরের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারে হাজির হলো হাসু। অনেক লোক বসে আছে। হাসুও বসে আছে...। নম্বর ওয়ান থেকে শুরু করে ইলেভেন পর্যন্ত ডাকা হলো। হাসু বসে আছে এক ঘণ্টা ধরে। তার পেছনের লোকেরা সমাধান করে চলে যাচ্ছে, কিন্তু হাসুকে ডাকা হচ্ছে না। শেষমেশ কিছুটা রাগ নিয়ে রিসিপশনে বসা এক ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে বলল, ‘ভাই আমি কোন ভেন? কখন ভেন হয়ে বাড়ি যাব?’
‘টোকেন নিয়েছেন?’
‘টোকেন নেব কেন! এইডা তো ব্যাংক না। টাকা দেবেন নাকি?’
পেছন থেকে সিকিউরিটি দৌড়ে যায়। ধমকায়, ‘যান মিয়া। পাগলামি করতে এসেছেন।’
হাসু ভাঙা গলায় বলল, ‘কী হচ্ছে না হচ্ছে, আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। মাথা ঘুরাচ্ছে।’
‘আপনার কিচ্ছু বুঝতে হবে না। আপনি পেছনে বসে মাথা ঘুরাতে থাকেন।’
হাসুর চাহনিতে সম্ভাবত রিসিপশনে বসা ভদ্রলোকের মায়া হলো। তিনি বলে উঠলেন, ‘এই উনাকে ছেড়ে দেন।’ ভদ্রলোক কিছুক্ষণ হাসুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার তো মোবাইলে সমস্যা স্যার।’
‘আমি স্যার না, হাসু।’
‘জি স্যার, হাসু।’
হাসু মিয়ার হাসতে মনে মনে ভাবল, হামিদ সাহেবকে ডেকে এনে দেখাতে পারলে ভালো হতো। ইস, বেচারার ভাবখানা এমন, দুনিয়াতে তিনিই যেন একখান স্যার পয়দা হয়ে আসছেন। আর কোনো স্যার নেই!
লোকটা আবার বলল, ‘দুঃখিত স্যার, আমরা এ ব্যাপারে কোনো প্রকার সাহায্য করতে পারছি না। সিমে সমস্যা হলে আমরা কিছু করতে পারতাম স্যার। ওকে স্যার।’
সমাধান না হোক, এতবার স্যার শুনে হাসু উত্ফুল্ল চিত্তে বলল, ‘ওকে ওকে।’
বেলা শেষে শহর থেকে ব্যাগ ভর্তি বাজার করে বাড়ির দিকে যাত্রা করল হাসু। বাসস্ট্যান্ডের সামান্য আগে বেশ কয়েকজন হাসুর পথ রোধ করে দাঁড়াল। তাদের চোখ লাল, ভাবে হিংস্রতা।
‘ব্যাগে কী!’
হাসুর বুকের ভেতর ধক করে উঠল। হামিদ সাহেবের কথা মনে পড়ে যায়। চোখদুটো বড় হয়। পাশ থেকে আরেকজন ফাল দিয়ে ওঠে, ‘কথা কস না ক্যান! ব্যাগে কী?’
হাসু জোর গলায় বলল, ‘একদম সন্দেহ করবেন না। ব্যাগভর্তি বাজার।’
চারপাশ থেকে কিলবিল করে ছুটে আসছে মানুষের ঝাঁক। চিত্কার করতে করতে বলছে, ‘ছেলেধরা! ছেলেধরা!’