তিনি আমাদের ইজ্জত আলি

 

  রাফিদুল রাফি

 

পাড়ার ‘নবারুণ’ ক্লাবের ছেলেরা মিলে ঠিক করল, এবার একটা নাটক মঞ্চস্থ করবে। নাটকের স্ক্রিপ্ট ও ডায়লগ লেখার দায়িত্ব আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে বাবাজিরা লাপাত্তা। প্রায় দুই সপ্তাহ পর তাদের কয়েকজন এসে বলল, ‘নাটক লেখা হয়েছে কি? সামনের শুক্রবার রাতেই কিন্তু নাটকটা মঞ্চস্থ হবে। নাটক পরিচালনার দায়িত্বও আপনার।’

নাটক লেখা শেষ করেই অলসভাবে বসেছিলাম। তাই তাদের বলে দিলাম কাজ শেষ। নাটকে মোট আটখানা চরিত্র। ক্লাবের ছেলেরা সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলছিল। আমার কাছ থেকে নিল না। নাটক লেখার পারিশ্রমিক হিসেবে আমাকে যে টাকাটা দিত, তারা সেটাও দিল না। এভাবেই কৌশলে দেনাপাওনার কারবার চুকিয়ে গেল।

হাতে সময় বেশি নেই। নাটকের কুশীলব ঠিক করা, তাদের নিয়ে রিহার্সাল করার ব্যস্ততা চলছে। আটটি চরিত্রের মধ্যে সাতটিতে কুশীলব ঠিক করে নিলাম। একটিতে পাওয়া গেল না। বলতে গেলে চরিত্রটি একেবারে অন্যতম প্রধান চরিত্র। চরিত্রের নাম ‘ইজ্জত আলি মাতব্বর’।

এই চরিত্রে যে অভিনয় করবে তাকে বৃদ্ধ হতে হবে। বৃদ্ধ না হলেও চলবে, মেকআপ মেরে সাইজ করে ফেলা যাবে। সেটা সমস্যা না। তবে যে এই চরিত্রে অভিনয় করবে তার মাথাভর্তি টাক থাকা লাগবে। ক্লাবের ছেলেদের মধ্যে মেহেদির মাথায় টাক আছে। তাকে বহুকষ্টেও রাজি করাতে পারিনি। আরো দুয়েকজনকে বললাম, মাথা ন্যাড়া করে টাক হতে। কেউ রাজি হলো না। অগত্যা ক্লাবের ছেলেদের দায়িত্ব দিলাম চরিত্রটির জন্য কাউকে খুঁজে আনতে।

নাটকটি আগামীকাল মঞ্চস্থ করার কথা, কিন্তু ‘ইজ্জত আলি মাতব্বর’ চরিত্রের জন্য এখনো কাউকে পাওয়া গেল না। রাতের বেলা চিন্তিত মনে ইজিচেয়ারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছি, এমন সময় অপু আর শোভনকে দেখলাম পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানদার হাশেম মিয়াকে নিয়ে আমার কাছে আসছে। বিষয় কী জানতে চাইলে অপু বলল, ‘বস, এই যে ইজ্জত আলি। দেখেন মাথাভর্তি টাক। বুইড়াও আছে। সে নাকি ইয়াং বয়সে বহুত যাত্রাপালা করছে। সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রও করছে। আপনে তার টেস্ট নেন।’

আমি রীতিমতো অবাক। এই লোক তো দিনের বেলায় চা বানাতে বানাতেই ঘুমিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা হতে না হতেই দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে নাক ডেকে ঘুমায়। এ করবে নাটক! যাই হোক, ব্যাপক হতাশ হয়ে হাশেম চাচাকে সিরাজউদ্দৌলার একটা ডায়লগ দিতে বললাম। হাশেম মিয়া ঘুমজড়ানো চোখে বুক টান করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। এরপর হাত পা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতে শুরু করল, ‘বাংলা, বিহার, মিরপুর, আজিমপুরের হে মহান রাষ্ট্রপতি...’

তাকে থামিয়ে দিয়ে ডায়লগটা ঠিক করে দিলাম। সে রীতিমতো ঘুমে টলছে। বারবার একই ভুল করে যাচ্ছে। সকালে আসতে বলে সে রাতের মতো তাকে ছেড়ে দিলাম।

পরদিন সকালে সে এল। বেশ হাসিহাসি মুখ। পান চিবুচ্ছে। তার ঠোঁট বেয়ে রক্তজলের মতো পানের পিক গড়িয়ে পড়ছে। তাকে তার চরিত্র বুঝাতে লেগে গেলাম। নাটকের শুরুতেই তার ডায়ালগ আছে। ব্যাপারটা এমন যে, ইজ্জত আলি মাতব্বরের ছেলে তার বাড়ির কাজের মেয়েকে গোপনে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে এসেছে। এটা দেখে ইজ্জত আলি তার টাকে হাত বুলাতে বুলাতে ছেলের উদ্দেশে বলবে, ‘ইজ্জত আলির চুল গেছে তো কী হইছে, ইজ্জত কিন্তু যায় নাই। তোরে এখন জুতাপেটা করতে করতে গাছে তুলে এরপর গাছ থেকে নামিয়ে ত্যাজ্যপুত্র করব।’

এই ডায়লগটায় বেশি মনোযোগ দিতে বলে এবং বাকিগুলো আয়ত্ত করতে বলে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। বাড়ি পাঠানোর আগে অবশ্যি বলে দিলাম, যে করেই হোক যেন ঘুম তাড়িয়ে আসে।

সে বলে গেল, ‘আরে ভাতিজা কী যে কও, দুই কাপ কড়া পাত্তির চা খামু, ঘুম বাপ ডাইকা যাইব গা।’

সন্ধ্যা পেরিয়ে তখন রাত। নাটক শুরু করার কথা ছিল রাত ৯টায়। কিছু টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে তা শুরু হচ্ছে রাত ১১টায়। গ্রিনরুমে গিয়ে দেখি হাশেম মিয়া ইজ্জত আলির সাজ নিয়ে চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে। এত ঘুমকাতুরে লোক জীবনেও দেখিনি বাবা! তাকে ডেকে তুলে, চোখে পানি ছিটিয়ে দিয়ে মঞ্চে পাঠালাম। পর্দা উঠেছে নাটক শুরু হবে। ইজ্জত আলি বারবার হাই তুলছে। ইস্! এই লোকটা বেইজ্জতি করে ছাড়বে না তো আবার।

প্রথম দৃশ্য। ইজ্জত আলির ছেলে আর কাজের মেয়ে তার সামনে গেল সালাম করতে। ইজ্জত আলি নড়ছে না। সম্ভবত দাঁড়িয়েই ঘুমাচ্ছে। ইজ্জত আলির ছেলের চরিত্র করছে ন্যাপলা। সে সালাম করার নাম করে তার পায়ে চিমটি কাটল। ইজ্জত আলি হুঁশে ফিরল। ন্যাপলা ডায়লগ বলল। ইজ্জত আলির পালা এখন। সে বলা শুরু করল, ‘জুতা মারতে মারতে আমাকে তোরা গাছে তুইলা দে। কাঁঠাল গাছে তুলিস। চা দিয়া কাঁঠাল খামু আর ঘুমামু।’

এমন ডায়লগ শুনে হাসির রোল পড়ে গেল চারদিকে। নাটকটা ছোট, বাজেটও কম তাই প্রম্পটার রাখিনি। আমি নিজেই চিত্কার করে তার ডায়ালগ বলে দিতে লাগলাম। সে এবার ধীরে ধীরে মঞ্চে শুয়ে পড়ল। এরপর চার হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাতে শুরু করল।

দর্শকরা ডিম ছুড়ে মারছে তাকে লক্ষ্য করে। তাতে কী, আমাদের হাশেম আলি ওরফে ইজ্জত আলি মাতব্বর সাহেব ঘুমাচ্ছেন!

তিনি আমার এবং আমাদের ক্লাবের বেইজ্জতি করে দিয়েছেন এই আরকি!

জাককানইবি, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।