রায়ান মুনতাসির
সুবর্ণপুর গ্রামে ইদানীং একটা সামাজিক সমস্যা বেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। গ্রামের বাচ্চা ছেলে থেকে শুরু করে মাঝবয়েসী কিংবা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই হুট করে অত্যধিক ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
বিষয়টা নজর এড়ায়নি এলাকার সমাজকর্মী মোতালেব সাহেবের। তিনি আবার গ্রামের এক স্কুলের শিক্ষক। মোতালেব সাহেব ভাবলেন, তার এমন কিছু একটা করার দরকার যাতে গ্রামবাসী ধূমপানের কুফল সম্পর্কে জানতে পারে, আর ধূমপান করা থেকে বিরত থাকে।
মোতালেব সাহেব জানেন শুধু মুখের কথায় গ্রামবাসীকে কাজ হবে না। তাই অনেক ভেবেচিন্তে তিনি ঠিক করলেন গ্রামবাসীর সামনে একটা মঞ্চ নাটক উপস্থাপন করবেন। যেখানে ধূমপানের খারাপ দিক আর ধূমপান থেকে বিরত থাকার ভালো দিকগুলো দেখানো হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। মোতালেব সাহেব নাটকের স্ক্রিপ্ট রেডি করলেন। স্কুল থেকে কয়েকজন ছেলে বাছাই করে তাদের প্রশিক্ষণ দিলেন নাটকের জন্য। তারপর একদিন তিনি গ্রামবাসীর সামনে তার নাটকের ব্যাপারে ঘোষণা দিলেন আর সবাইকে বললেন যেন নাটক দেখতে উপস্থিত থাকে।
গ্রামে মোতালেব সাহেবের বেশ গ্রহণযোগ্যতা আছে। মোতালেব সাহেব কিছু বলেছেন আর গ্রামবাসী তা করেনি এরকম কিছু হয়নি কখনো। এবারো তার ব্যতিক্রম হলো না। পুরো গ্রামবাসী হাজির হলো নাটক দেখার জন্য।
স্কুলের বড় মাঠের এক প্রান্তে নাটকের জন্য মঞ্চ বানানো হলো। মঞ্চের সামনে মাঠের বিশাল খোলা জায়গায় প্যান্ডেল টাঙিয়ে চেয়ার বিছিয়ে গ্রামবাসীর বসার ব্যবস্থা করা হলো। নাটক শুরু হলো যথাসময়ে। একে একে অভিনেতারা পর্দার আড়াল হতে মঞ্চে প্রবেশ করল।
নাটকের প্রধান চরিত্র দুইজন। তাদের মধ্যে একজন ধূমপায়ী আর অন্যজন অধূমপায়ী। প্রথমে ধূমপায়ীর অংশ দেখানো হলো। দেখানো হলো যে, লোকটি প্রচুর ধূমপান করে। একেবারে চেইন স্মোকার। একের পর এক সিগারেট খেয়ে শেষ করছে সে। তারপর অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে একদিন সে অসুখে পড়ে গেল। কঠিন অসুখ। অসুখে সে শয্যাশায়ী হলো। মঞ্চে হাসপাতালের বেডের মতো একটা বিছানায় তাকে শোয়ানো হলো। কাজকর্ম করতে পারে না সে। নড়াচড়াও করতে পারে না। এমনকি নিজে নিজে খেতেও পারে না। অন্যরা এসে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে।
মঞ্চের একপাশে ধূমপায়ীকে এভাবে বিছানায় শুইয়ে রেখে অধূমপায়ীর অংশ শুরু হলো এবার। এবারের লোকটি নিজে তো ধূমপান করেই না, বরং ধূমপানকে দুচোখে ঘৃণা করে সে। কাউকে ধূমপান করতে দেখলে তার ছায়াও সে মাড়ায় না। সিগারেটের বদলে সে সবসময় তাজা ফলমূল খায়। ফলে তার স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কখনো অসুখে পড়ে না। সে প্রচুর কাজ করতে পারে। সারাদিন ক্ষেতে খামারে কাজ করে। সতেজ শস্য ফলায়। সংসারের সমস্ত খরচ চালায়। সারাদিন হাসিখুশি থাকে। ভালোই দিন চলে যায় তার।
নাটকের শেষ অংশে দেখানো হলো অধূমপায়ী লোকটি তার ক্ষেত থেকে সতেজ ফল এনে ধূমপায়ীকে খাওয়ায়। ধূমপায়ী নিজে খেতে পারে না। অধূমপায়ী লোকটি তাকে খাইয়ে দেয়। ধূমপায়ীরা যে অধূমপায়ীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সেটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হলো খুব সুন্দর করে।
নাটক শেষ হলো। গ্রামবাসী প্রচুর হাততালি দিল। এবারে মোতালেব সাহেব মঞ্চে এলেন। তিনি মনে মনে বেশ খুশি। ছেলেরা খুব সুন্দর করে নাটকটা মঞ্চস্থ করেছে। একেবারে তিনি যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবে। মোতালেব সাহেব গ্রামবাসীর দিকে তাকালেন। সবাই বেশ হাসিখুশি। মোতালেব সাহেব সন্তুষ্ট হলেন। ভাবলেন সবাই হয়তো তার নাটকের বার্তাটি এরমধ্যে বুঝে গেছে।
মোতালেব সাহেব মঞ্চে দাঁড়িয়ে একবার গলা খাঁকারি দিলেন। তারপর মাইক্রোফোনটা নিজের মুখের কাছে টেনে উচ্চস্বরে গ্রামবাসীর কাছে জানতে চাইলেন, ‘এই নাটক থেকে আমরা কী বুঝলাম?’
গ্রামবাসী একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর সমস্বরে বলে উঠল, ‘যারা ধূমপান করে তারা রাজার হালে শুয়ে বসে দিন কাটাতে পারে। আর যারা ধূমপান করে না তাদের সারাদিন কামলার মতো খাটতে হয়। সুতরাং আমাদের বেশি বেশি ধূমপান করা উচিত!’
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ।