শিশুদের রক্ষা করা নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকার কাজ করছে। তবে এটি সবসময় দৃশ্যমান হয় না। তিনি বলেন, তবে সরকারের নানা পদক্ষেপে শিশু নির্যাতন কমে আসলেও এখনো তা আশা জাগানিয়া নয়।
গতকাল শনিবার দৈনিক ইত্তেফাকের মাজেদা বেগম মিলনায়তনে ‘শিশু নির্যাতন ও আমাদের করণীয়’ বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) ও দৈনিক ইত্তেফাক যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।
সভায় আসাদুজ্জামান খান আরো বলেন, ২০৪০ সালে যারা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে সেই শিশু-কিশোরদের আমাদের রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুশিক্ষার ওপর বঙ্গবন্ধু যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সারাদেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোকে জাতীয়করণ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন দেশের সব শিশুকে বাধ্যতামূলক পড়ালেখার আওতায় নিয়ে আসতে। আমরা মাঝে পথ হারিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর কন্যা আবার সেই স্কুলগুলোকে জাতীয়করণ করেছেন। আজকের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিয়ে যেতে চাই।
অনুষ্ঠানে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। তারপরেও উন্নয়নের দিক দিয়ে যথেষ্ট এগিয়েছি আমরা। সরকার উন্নয়নমূলক অনেক কাজ করছে। বিশ্বে আমাদের যথেষ্ট সুনামও বেড়েছে। তারপরেও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে, যা থেকে আমরা কেন জানি বের হতে পারছি না। তার একটা হচ্ছে শিশু নির্যাতন। আমরা সকলেই ছোটোবেলায় কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছি। তাসমিমা হোসেন আরো বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হচ্ছে ‘দরিদ্রতা’। আর এই দরিদ্রতার জন্যেই সমাজে শিশুশ্রমিক হ্রাস পাচ্ছে না। কাজেই এখানে প্রচুর পরিমাণে প্রণোদনা দিতে হবে। আমাদের অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, তবে কিছু দুষ্টু লোকের জন্য তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দেশে অনেক আইন আছে। তবে উপকার পেতে হলে সেই আইনগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে।
মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, শিশু বয়সে নির্যাতনের ভয়াবহতা কাউকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়াতে পারে। শিশুকে কথা বলার প্রবণতা তৈরি করে দিতে হবে। শিশুদের পর্যাপ্ত সময় দিতে তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান। তার মতে, একাকিত্বে বেড়ে ওঠা শিশুর অপরাধ প্রবণতা বাড়তে পারে।
সুপ্রিম কোটের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, দেশের ৮৪ ভাগ স্কুলগামী শিশু পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে। এসব বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মূল প্রবন্ধে এএসডির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন ম্যানেজার লুত্ফুন নাহার কান্তা বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনে হারিয়ে যাচ্ছে অগণিত শিশুর শৈশব। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা তা ঠিকমত বলতে পারছে না। এ ধরনের নির্যাতনের ফলে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। তাই শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই। নিশ্চিত করতে হবে সব শিশুর শৈশব ও কৈশোর।
গোলটেবিল আলোচনা সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক ফারজানা রূপা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এএসডির নির্বাহী পরিচালক জামিল হোসেন চৌধুরী। এতে আরো বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. ইকবাল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ডা. ইশরাত জাহান শর্মী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরী, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ফারুখ আহমেদ, আইএলও এর প্রোগ্রাম অফিসার সৈয়দা মুনিরা সুলতানা, ইউনিসেফের সামাজিক নীতি বিশেষজ্ঞ হাসিনা বেগম, সেভ দ্যা চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন, এসওএস শিশুপল্লীর পরিচালক চায়না রানি সাহা, সাবেক সচিব আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার (এনডিসি), ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স এর নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক মো. আবদুস শহিদ মাহমুদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শিশু সুরক্ষা প্রকল্পের সমন্বয়কারী রাফেজা শাহীন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক অ্যাডভোকেট মাকছুদা আক্তার প্রমুখ। এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাকের সিটি এডিটর আবুল খায়ের।