অন্যরকম এক থিমপার্ক

শফিকুর রহমান রয়েল

 

বলতে গেলে প্রায় প্রত্যেক দেশেই বামন সম্পর্কে প্রবাদবাক্য প্রচলিত রয়েছে। এতে ভিন্নতা থাকলেও অধিকাংশই নেতিবাচক। ডোয়ার্ফ বা মিজেট শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে বামন। স্ক্যান্ডিনেভীয় বা জার্মান পৌরাণিক কাহিনিগুলোয় অবশ্য এদের ভিন্ন নরবংশের সদস্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে, যাদের রয়েছে কিছু বিশেষ               আধ্যাত্মিক শক্তি এবং কারুশিল্প ও ধাতুকর্মে দক্ষ। লম্বা দাঁড়িগুলো দেহের সঙ্গে মিল খায় না। উচ্চারণের দিক                 থেকে কাছাকাছি নানা পরিবর্তনের পর ইংরেজি ভাষায় ডোয়ার্ফ শব্দটি থিতু হয়েছে।

উইকিপিডিয়ায় বামন সম্পর্কে বলা হয়েছে, শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একজন প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো সৃষ্টি সমন্ধীয় পরিস্থিতির ফলশ্রুতিতে অনানুপাতিকহারে ছোট। হাসি-তামাশা সহ্যই যেন এদের পরিণতি। স্বাভাবিক কাজকর্মে নিয়োগের বেলায় কারণে-অকারণে এদের প্রতি অবজ্ঞাই মনে হয় প্রত্যাশিত। হয় তো সে জন্যই কিছু বামন ভিক্ষা করছিল চীনের কুনমিং প্রদেশের এক রেল স্টেশনে। তা দেখে মানবিকতা জেগে উঠল চেন মিনজিংয়ের। ২০০৯ সালে কুনমিংয়েই প্রতিষ্ঠা করলেন একটি থিমপার্ক, যার নাম দিলেন ডোয়ার্ফ কিংডম। দর্শকরা সেখানে প্রবেশ করলেই দেখতে পান জবুথবু এক বামন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন, তাকে বকশিশ দিলে অন্যরা নানাভাবে বিনোদন যোগাবেন আগত অতিথিদের। চেন মিনজিং বলেছেন, আশা করি এই বামনরাজ্য তাদের উন্নত জীবনযাপনে সহায়তা করবে।

চেন মিনজিং থিমপার্কের পরিবেশ গড়ে তুলেছেন বামনদের উপযোগী করে। এর সঙ্গে মাথায় রাখা হয়েছে দর্শকদের মনোরঞ্জনের বিষয়টিও। থিমপার্কে থাকতে চাইলে তিনটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হয়— কোনো সংক্রামক ব্যাধি থাকা চলবে না; পঞ্চাশের বেশি বয়স হতে পারবে না এবং উচ্চতা কিছুতেই চার ফুট তিন ইঞ্চি অতিক্রম করা যাবে না। থিমপার্কের ভেতরে মাঠগুলোয় রয়েছে নৈপুণ্য প্রদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা। আর আছে মাশরুমের মতো দেখতে প্রচুর ঘর।

অবাক করার মতো ঘটনা হচ্ছে, চেন মিনজিংয়ের ধারণাটির বিষয়ে সবাই খুশি নয়। অ্যান ইডিয়ট অ্যাবরড সিনেমার একটি পর্বে কৌতুকাভিনেতা কার্ল পিলকিংটন ডোয়ার্ফ কিংডম পরিদর্শন করার পর বলেছেন, এটি শারীরিক প্রতিবন্ধীদের একেবারে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। তবে উলটা সুরেও কথা বলেছেন অনেকে। তারা বলছেন, আপনি সেখানে কিছুটা আনন্দদায়ক সময় কাটাতে যাচ্ছেন এটা যেমন ঠিক, আবার এটিও তো মিথ্যা নয় যে, অতিথিদের বিনোদন দিতে গিয়ে বামনরাও হাসছেন। তারাও নির্মল আনন্দ পাচ্ছেন। এখানে তো সবই ঠিক আছে, নয় কি?

বামনরাজ্যে শ্রমশোষণ ঘটছে নাকি স্রেফ বিনোদনের উপকরণ, এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রীতিমতো বিতর্ক চলছে। তবে একথা ঠিক যে, বামনরাজ্যের সবাইকে বাসস্থান করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রদর্শনীর জন্য সম্মানজনক পারিশ্রমিকও দেওয়া হচ্ছে। বামনরাজ্যের পক্ষে কথা বলার মতো লোকেরও অভাব নেই। বামনরাজ্যের সব প্রদর্শনীই ইচ্ছামূলক। যে কারণে সেখানকার কর্মচারীদের হাসিখুশি দেখা যায়। কেউ কোনো দিন অভিযোগ করেনি। বামনদের একজন বলেন, কিছুসংখ্যক লোক আমাদের নিয়ে মজা করতে এলেও আমাদের কিছুই যায় আসে না। সবকিছু সত্ত্বেও আমরা কতোটা খুশি এটা দেখার পর তারা অন্তত এটি বুঝতে পারেন যে, আমাদের সমস্যার তুলনায় তাদের সমস্যা কতোটা যে নস্যি।