ফের শক্ত অবস্থানে ইরান

 

তৌহিদ আজিজ

 

মাঝে একটু সুর নরম হলেও ইরান আবারও শক্ত অবস্থানে গিয়েছে। এ যাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে দ্রুত অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহারের শুরুর কথা জানিয়েছে দেশটি। সেখানে এ ধরনের ৪০টি সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহূত হচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে। যদিও ইরানের পরমাণু সংস্থা জানিয়েছে, সময় চলে যাচ্ছে পরমাণু চুক্তি রক্ষার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইউরোপকে দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরানের পরমাণু সংস্থার মুখপাত্র বেহরুজ কামালওয়ান্দি জানিয়েছেন, ইরান এখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে আগের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। যদিও আমরা এখনই এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষে নই। তবে বিশ্বশক্তি নীরব ভূমিকায় থাকলে আমাদের সে পথেই যেতে হবে। তিনি বলেন, ঘড়ির কাটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের করা চুক্তি রক্ষায় কেউ সেভাবে এগিয়ে আসছে না। পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করলে আমরা নিজেদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যাব। এই চুক্তির ইউরোপীয় অংশকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই। যদি কারও কোনো পদক্ষেপ নিতে হয় তা দ্রুততার সাথেই নিতে হবে। অন্যথায় আমরাও আমাদের মতো কাজ চালিয়ে যাব। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির যে পরমাণু চুক্তি হয়েছিল তাতে ইরানের যুক্ত হওয়ার কারণ একটাই ছিল বিনিময়ে তাদের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার খড়গ তুলে নেওয়া হবে। সবকিছু যখন ঠিকঠাক মতো চলছিল তখন হঠাত্ করে ট্রাম্প প্রশাসন এর বিপক্ষে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেয় এবং ইরানের ওপর নতুন করে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে। আর এরপর থেকেই পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে। ইরানও হুমকি দিতে থাকে তাদের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া না হলে তারা পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাবে। এ অবস্থায় চুক্তির ইউরোপীয় অংশ ইরানকে এসব কর্মসূচি থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকে এবং আলোচনার টেবিলে বসার জন্য তেহরানকে আহ্বান জানায়। ইরান বলছে, আলোচনায় বসার আগে বিভিন্ন দেশে তাদের তেল রপ্তানিতে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

এবার দেখা যাক এই ইউরেনিয়াম নিয়ে কেন এত কথাবার্তা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হয়। আর অধিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বোমা বানাতে ব্যবহূত হয়। বিশ্বশক্তিগুলোর ধারণা, ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ গবেষণার নামে পারমাণবিক কার্যক্রমে অতিমাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ইরান সরাসরি কিছু না বললেও দেশটির পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান আলি আকবর সালেহি বলেছিলেন, তাদের হাতে ৯৫০ টন ইউরেনিয়াম মজুত আছে। ইরান এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে বলেও জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও বলেছেন, ইতিমধ্যে তাদের উন্নত ও আধুনিক সেন্ট্রিফিউজ উত্পাদনের জন্য যন্ত্রাংশ নির্মাণে অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানকে রুখতে দেশটিকে চুক্তির মধ্যে রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। কেননা এভাবে ইরান শক্তিমত্তা অর্জন করতে থাকলে তা গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তাই এক্ষেত্রে ইরানের ওপর থেকে যদি তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়া হয় তা বিশ্বশান্তির খাতিরে সকলের জন্যই মঙ্গলজনক। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হঠাত্ করে চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পিছনের কারণ হিসেবে অনেকে মনে করছেন এর মাধ্যমে তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরিয়ে আনতে একটা চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু পরিস্থিতির বিবেচনায় যা দেখা যাচ্ছে, উলটো তেহরান তাদের সেন্ট্রিফিউজ উন্নতিকরণে কাজ করে যাচ্ছে। অবশ্য ইরান গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছিল যে, শুক্রবার থেকে তারা তাদের সেন্ট্রিফিউজের গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ শুরু করবে। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এ ঘোষণা দেন। তারই ফলশ্রুতিতে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে দ্রুত অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ ব্যবহারের শুরুর কথা জানিয়েছে।

ইরানের এ ধরনের ঘোষণায় অনেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ফ্রান্স ইরানের সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়ন পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, ইরানের এ ধরনের আচরণ কোনো সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডের বহি:প্রকাশ নয়। ফ্রান্স প্রস্তাব দিয়েছে, চুক্তি রক্ষা করলে এ বছরের শেষ পর্যন্ত ইরানকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার দেওয়া হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সুর নরম নয়। ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি ব্রায়ান হুক বলেছেন, ‘আমরা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছি। সামনে আরো নিষেধাজ্ঞা আসবে।’ তাই এ অবস্থায় বুঝা যাচ্ছে সামনে যদি জোরেশোরে কোনো মধ্যস্থতা বা সমঝোতা না হয় তাহলে পরিস্থিতি যে ভীষণ ভয়ানক হয়ে উঠবে তা-ই স্বাভাবিক। যদিও গত জুনে এ ধরনের এক পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা থেকে সরে আসায় বিশ্ব এক ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু ইরানের এই কর্মকাণ্ড অদূরভবিষ্যতে যদি আরো বাড়তে থাকে তাহলে বিশ্ব যে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে তা বলাই যেতে পারে।

-গার্ডিয়ান অবলম্বনে