‘প্রতিটা পরিবারে মায়ার বন্ধনের মতো জড়িয়ে আছে টেলিভিশন’

সৈয়দ আশিক রহমান আরটিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বার্তা প্রধান। তিনি ২০০০ সালে টেলিভিশন মিডিয়াতে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১৭ সালে ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে তিনি ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন। তিনি টেলিভিশনে বেশ কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্টার অব পলিটিক্স অন্যতম। বাংলাদেশের বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে কাজ করার আলোকে তিনি এই শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার সাক্ষাত্কার নিয়েছেন অজেয় চৌধুরী

আমাদের দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের চ্যালেঞ্জগুলোকে কিভাবে দেখেন?

বাংলাদেশের টেলিভিশন মিডিয়া খুবই বিকাশমান একটি শিল্প। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে রয়েছে। আমরা প্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, সেটা হলো পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ ও সৃজনশীল জনবলের অভাব। যার ফলে আমরা নান্দনিক অনুষ্ঠান দর্শকদের দিতে পারছি না। দ্বিতীয় সমস্যা, বাংলাদেশের প্রতিটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। আমাদের দেশে একাধিক বিদেশি চ্যানেল, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশের বাংলা ও হিন্দিভাষী চ্যানেলগুলো অবাধে সম্প্রচারিত হচ্ছে বিজ্ঞাপনসহ। এই চ্যানেলগুলোর দর্শক দু দেশেই আছে। এই বিবেচনায় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ও আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনদাতারা ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার চেষ্টা করেন। তারা তাদের বিজ্ঞাপন ঐসব চ্যানেলে সম্প্রচার করছেন। ফলে, দেশীয় চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন পাচ্ছে না এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের টাকা বিদেশে চলে যাওয়ায় আমরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ছি।

আপনি কি মনে করেন, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে কনটেন্টের ঘাটতি রয়েছে?

মানসম্মত কনটেন্ট নিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক জড়িত। যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, তাদের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী এবং তাদের মিডিয়া বাজারটিও বেশ বড়ো। তারা কনটেন্ট তৈরিতে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করতে পারে। আমরা ভালো কনটেন্ট প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ পাচ্ছি না, তাই কনটেন্টগুলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে থাকে। তবে, আমাদের মেধাবী নির্মাতারাও স্বল্প বাজেটের মধ্যেই বেশ মানসম্মত কনটেন্ট প্রস্তুত করার চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রেখেছে।

ইউটিউবের জনপ্রিয়তা এদেশে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কি আরেকটি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ছে?

বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে খুব সহজেই দর্শকরা আইফ্লিক্স, নেটফ্লিক্স ও ইউটিউবের মাধ্যমে বিভিন্ন কনটেন্ট দেখছে, এটা সত্য। তবে, আমি মনে করি না, এটার জন্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কোনো প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে। একটু লক্ষ করে দেখবেন, টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখা হয় পরিবার-পরিজন নিয়ে। প্রতিটা পরিবারে মায়ার বন্ধনের মতো জড়িয়ে আছে টেলিভিশন। আর, আইফ্লিক্স, নেটফ্লিক্স ও ইউটিউবের মাধ্যমে অনুষ্ঠান দেখা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইন্ডিভিজ্যুয়ালি অর্থাত্ একাকী এবং এর ইউজারের বয়স কিশোর থেকে মধ্যবয়সী। এছাড়া টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিষয়বৈচিত্র্যে বহুমাত্রিক। আর, অ্যাপসের চেয়ে টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপভোগ অর্থ-সাশ্রয়ী। পরিসংখ্যানে বলে বাংলাদেশের বড়ো শহরগুলো ছাড়া অ্যাপসের মাধ্যমে কনটেন্ট দেখার দর্শক এখনো সীমিত। অতএব, অ্যাপসকেন্দ্রিক সম্প্রচার টেলিভিশনের জন্য এখনো কোনো হুমকি নয়।

বিভিন্ন মোবাইল টেলিকম প্রতিষ্ঠান অ্যাপস তৈরি করে তার মাধ্যমে কনটেন্ট প্রচার করছে, এটাকে কীভাবে দেখছেন?

এটা সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে সরকারের অনুমোদন ছাড়া করা হচ্ছে। ইদানীং বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর তাদের মূল ব্যবসার বাইরে অ্যাপস তৈরি করে কনটেন্ট প্রদর্শন করে আয় করার চেষ্টা করছে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত বলে মনে করি। সরকার তাদের অনুমতি দিয়েছে শুধু টেলিফোন ব্যবসা করার জন্য। অথচ তাদের সার্ভিসের মান সন্তোষজনক নয়। তাদের কলড্রপের অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নেটওয়ার্কের মান নিয়েও প্রশ্ন। অথচ, তাদের উচিত ছিল ভোক্তাদের আরো উন্নতমানের সেবা প্রদান করা।

আপনি একটু লক্ষ করলে দেখবেন, ইউটিউবে ওয়েব সিরিজের নামে বিভিন্ন অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ নাটক সম্প্রচার করা হচ্ছে। যেটা আমদের সমাজব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, বিনোদনের নামে এসব সস্তা ওয়েব সিরিজ বন্ধ করে যুবসমাজকে রক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

টেলিভিশন চ্যানেলের এই দুরাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কী কাজ করা উচিত বলে মনে করেন?

বাংলাদেশ সরকার স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তাই, সরকারকেই প্রধান উদ্যোগী হতে হবে এই শিল্পের সুরক্ষায়। আমাদের দেশে আজ প্রায় ৩০টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে রয়েছে। ডাইরেক্ট ও ইনডাইরেক্টভাবে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এই শিল্পে। এই শিল্পকে গড়ে তুলতে এবং দৈনন্দিন চলতি মূলধনের জোগান দিতে হচ্ছে মালিকপক্ষকে। সেই ইনভেস্টমেন্টও প্রচুর! এই ইনভেস্টমেন্ট সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপ। তাই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমার দেশের অর্থ যেন বিদেশে চলে না যায় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি, বিদেশে যেন আমাদের চ্যানেল সম্প্রচারে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে।