সেই দুঃসহ দুপুরের পর থেকে শিজাদের চোখের কোটরে শুধু রক্ত! জমাটবাঁধা রক্ত! আর দুর্গত রক্ত তরলের স্রোত! রক্তের হোলিখেলা! বলি হওয়া প্রাণীর চিত্কার মিলিয়ে যায় উত্সাহী আনন্দের ভিড়ে। গলাকাটা কবুতরের মতো লাফাতে থাকা, তড়পাতে থাকা মুহূর্ত করুণা নয়, জাগিয়ে তোলে কুিসত ফুর্তি!
শিজাদ আজ যেদিকে তাকায় লালে লাল ক্ষত-বিক্ষত! মাটি থেকে আসমান সবই যেন পিশাচ হূদয়ের হঠাত্ উদ্গীরণ! সুন্দর প্রকৃতি ও পবিত্র মানুষও এভাবে রক্তচোষা প্রাণী হতে পারে তা কখনোই শিজাদ ভাবতে পারেনি। মাথার ভেতর থাকা যন্ত্রণাকে সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। মারমুখী ভ্রান্তির বেড়াজাল এভাবেও কাউকে গ্রাস করতে পারে, ঠেলে দিতে পারে মৃত্যুর গোরদোড়ায়! যেখানে মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ বেঁচে থাকা, অনেকটা বনের ঐ হরিণের মতো ঝড়ের কবলে গাছের তলে আটকে পড়া, না মৃত্যু না বেঁচে থাকা! কে বা কারা দাবি করতে আসে ওটা ভুলের রোষানল? ভুলকে ক্ষমা ও ক্ষমতার প্যাকেটে পুরে চালান করার আগে বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত। এখানে আফসোসের কোনো ঠাঁই হতে পারে না। সুন্দরকে একনিমেষে নিঃশেষ করা যায়, গড়ে তোলা যায় না।
পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে শিজাদ! জীবিত না মৃত বুঝতে দ্বিধা জাগে। চারদিকের সবুজ গাছপালা হঠাত্ হঠাত্ ঝরে পড়া জলপাই পাতার রূপ ধারণ করে, নদীর পানি জ্যোত্স্না রঙে রুপালি হওয়ার বদলে হতে থাকে গোধূলির প্রতিচ্ছবি! শিজাদের চোখের পাতা আবিষ্ট হয়ে আছে লাল রক্তের তীব্র যন্ত্রণায়। স্বাভাবিকতা ঘুচে সবই এখন পথের ধূলি!
শিজাদ! সতেরো বছর বয়স! ফর্সা মুখমণ্ডল জুড়ে কৈশোরের ভাবলেশ। ঠোঁটের ওপরে সবুজ দিগন্তের তৃণের মতো গোঁফরেখা, লম্বাটে চোয়াল ছাপিয়ে জেগে উঠেছে হালকা কেশ! অল্প-বয়সেই শারীরিক উত্কর্ষতা ওকে এনে দিয়েছে তারুণ্য-আবহ। পেশি-শ্রমের ওপর ভর করেই একটা সংসারকে সে টিকিয়ে রেখেছে। অসুস্থ পিতা ও মাকে আগলে রেখেছিল সর্বোচ্চ মায়া দিয়ে। দরিদ্রতা যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানে জান খাটিয়ে উপার্জনের ফলেই দুটো ডালভাত জুটে! শিজাদের জীবনধারাও ছিল এখানে আবদ্ধ!
শিজাদ কখনো দুরন্ত বালক ছিল না। সবসময়ই ছিল চুপচাপ স্বভাবের। ভীষণ লাজুক! পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকার দলে। শেষ বেঞ্চের সারির শেষ প্রান্তটা ছিল তার। সময়ের আবর্তে চারপাশকে আরো সংকুচিত করে সে এখন বোবা প্রাণী। একসময় মনের ভেতর ছিল কৌতূহলের দৌড়ঝাঁপ। বুকের তলায় ছিল একটা প্রেমময় হূদয়!
রক্তাক্ত ঘটনারও বহু আগের কথা। এক চৈত্রের রাতে ঘরে ফেরার পর ওর হঠাত্ মনে হলো, তার হূদয়ের একাংশ কোথাও হারিয়ে গেছে। হালকা ব্যথা অনুভূত হয় বুকের বাঁ পাশে। না, ওটা ব্যথা নয় তৃষ্ণা। যে তৃষ্ণা মেটানোর জল কোথাও কখনো ছিল না।
সে এক আকস্মিক দৃশ্যের ছটা, ঘটনাটি ঘটে সেদিনই দুপুরে নদীর ঘাটে। মোহনদের বোরো ধানখেতে খাদ খননের কাজে মাট্টাল মজুরদের সঙ্গে রোজ খাটতে যোগ দিয়েছিল শিজাদ। সেখানে মাটিকাটা শেষে, কাদামাখা শরীর নিয়ে ছুটে গিয়েছিল গোসল করতে। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে কয়েকবার ডুব দেবার পর মাথা তুলে তাকায়। আশপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে কোমর পানিতে নেমে অনায়াসে লুঙ্গি খুলে কাঠের গুঁড়িতে ধুপধাপ শব্দে কাচতে থাকে। কয়েকমুহূর্ত পর, তড়িঘড়ি লুঙ্গি ধুয়ে আবার কোমরে বেঁধে নেয়। জলের স্পর্শে শরীরের শুকনো কাদা খসে পানিতে পড়তে থাকে। শিজাদ আবারও সতর্ক দৃষ্টি ফেলে হাতের লুঙ্গিটা পানি ঝরিয়ে সসংকোচে পা বাড়ায় পাড়ের দিকে, কারোর অস্তিত্ব অনুপস্থিত আন্দাজ করে ঝটপট এগিয়ে যায়। দ্রুত লুঙ্গিটা রোদের তেজে নুয়ে পড়া ইপিলইপিল গাছের ওপর নেড়ে, আবার পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠিক তখনই কানে বাজে অট্টহাসির শব্দ! মেয়েলি কণ্ঠস্বর!
শিজাদ কোথাও কাউকে দেখতে না পেয়ে প্রচণ্ড ভয় পায়। মনুষ্য এবং ভুতুড়ে দুটো ভয়ই ওকে কাঁপিয়ে তোলে। নেংটো হয়ে গোসল করার কথা গাঁয়ে জানাজানি হলে মুখ দেখাবার জো থাকবে না। অন্য ভয় হলো, নদীর পাড়ে ভূতের উপদ্রব, কে জানে আজ দুপুরে সে কোন বিপদের মুখোমুখি হয়েছে।
উচ্চহাসির শব্দে ভয়ার্ত চোখে ওপরের দিকে তাকাতেই দেখে দাঁড়িয়ে আছে পঞ্চদশী রাখালি। ওকে বালিকা বা কিশোরী দুটোই বলা চলে। নতুনভাবেও ডাকা যায় বালিকাশোরী। কাজকর্ম এখনো বালিকাদের মতো, হাসি-ঠাট্টা-খেলাধুলাই বোঝে জীবনের মানে হিসেবে। শরীরে নেমে এসেছে কৈশোরের জলছাপ!
সামনে এগিয়ে গলা পানিতে নিজের শরীরটা লুকিয়ে নিয়েছে শিজাদ! চোখজোড়া তিরতির করে তাকিয়ে আছে, মেয়েটির দিকে। রাখালি তখনো সেখানে দাঁড়ানো, হাতে একটা প্লাস্টিকের বালতি। শিজাদ প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে মেয়েটির গতিবিধি লক্ষ করে। ওর ইচ্ছে করছে, কষে একটা থাপ্পড় দিয়ে মেয়েটাকে বাড়ির দিকে পাঠাতে। কারণ, ওর মতো ভয়ংকর মেয়ে আশপাশে কয়েক গাঁয়ে নেই বললেই চলে।
শিজাদ ওকে থাপ্পড় দেবে কী করে? মহামারী লজ্জ্বা তো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে জলের তলে। মেয়েটা এখানে না এলে এতক্ষণে শিজাদ কয়েকটা ডুব দিয়ে রোদে তেতে ওঠা লুঙ্গিটা জড়িয়ে বাড়ির পথ ধরতে পারত। সেই সকাল থেকে খাদ খননের কাজ করে এখন দুপুর, পেটে দুটো দানাপানি পর্যন্ত পড়েনি, ক্ষুধায় চোখের সামনে শর্ষেফুল ভেসে বেড়াচ্ছে। কী যে করবে বুঝতে পারছে না। ভাবছে, ঘরে মা অপেক্ষায় আছে নিশ্চয়ই। বারান্দায় শুয়ে অচল বাবা কাশতে কাশতে হাজারবার জিজ্ঞেস করেছে হয়তো, শিজা, আইছে নাকি?
রাখালিই প্রথম ঘাটে এসে শিজাদের উদ্দেশে বলে, এই তুমি কি উঠবে, নাকি ডুবেই মরবে? আমি কিন্তু কাপড় কাচবো।
এবার কিছু বলার সাহস পেল শিজাদ।
—উঠবো কী করে? তুমি তো...
—আমি তো কী করলাম? পথ আগলে আছি নাকি পানির তলে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছি?
—না বোঝার ভান করছো কেন?
রাখালি মুখ টিপে হেসে বলে, বা রে, বোঝা না বোঝার কী আছে এখানে?
—ভালো হবে না কিন্তু! পানির নিচে আর ভালো লাগছে না।
—উঠে এসো না। মানা তো করিনি।
—গায়ে কাপড় নেই...এটা দেখতে তোমার ভালো লাগছে বুঝি?
এবার রাখালি উচ্চ হাসির ঢেউ তুলে বলে, এমনভাবে কেউ গোসলে নামে? তাও ভূতের মতো পাড়ে উঠে কাপড় শুকাতে দিচ্ছো, আমি না হয় দেখতে না চেয়েও দেখেছি। অন্য কেউ দেখলে কী সর্বনাশ হতো বুঝতে পারছো! হাঁদারাম কোথাকার!
—কী! তুমি দেখেছ? হায়রে আমার খোদা!
—একবারই তো দেখেছি, তাতে কী এমন ক্ষতি হলো? এবার চোখ বন্ধ করছি, ঝটপট উঠে এসো।
রাখালি দুই হাতে চোখ-মুখ ঢেকে ধরে। শিজাদ পানি থেকে একটু একটু এগুতে থাকে, হঠাত্ বুঝতে পারে দুষ্টুটা আঙুল ফাঁক করে চোখ মেলছে।
প্রায় কান্না আর জিদভরা কণ্ঠে শিজাদ বলে, না আমি পানি থেকে উঠবো না। মরে গেলেও উঠবো না। হয় তুমি এখান থেকে যাবে নয়তো আমি পানির নিচেই থাকবো।
রাখালিও কম না। বলে ওঠে, ঠিক আছে, তুমি জলদেবতা, জলেই থাকো। আমি আমার কাজ করি।
রাখালি একমনে কাপড় কাচতে থাকে। চৈত্রের দুপুর হলে কী হবে, শীতের আমেজ এখনো যায়নি, দিনটা কুয়াশাঢাকাই ছিল, সকাল শেষে রোদ চোখ মেলেছে। ঘাটের দিকটা ছায়াশীতল, তার ওপর পানিতে ডুবে থেকে শিজাদ ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত বাজিয়ে হু-হু... কটর কটর করে কাঁপতে থাকে।
একসময় রাখালি ওর স্বভাবজাত ঢঙে বলে, তোমার কষ্ট হচ্ছে জানি, কিন্তু আমার তো কিচ্ছু করার নেই। কাপড় কাচতে তো দেরি হবে, ইস কত ময়লা জমে আছে কাপড়ে।
—আর কতক্ষণ লাগাবে, আমাকে যাবার সুযোগটুকু দেবে না?
—দেবো তো, আমি চলে গেলেই সুযোগ মিলবে, জলদেবতা! আমার সাথে কাজে হাত লাগালে সময়টা এগিয়ে আসবে, শুনছো?
—কী কাজ করতে হবে?
রাখালি হাসতে থাকে। তারপর একের পর এক জামা সাবানে কেচে শিজাদের দিকে ছুড়ে দেয়। আর শিজাদ বারবার কাপড় পানিতে ডুবিয়ে পরিষ্কার করে। হাতের চাপে পানি ঝরিয়ে আবার রাখালির হাতে ছুড়ে দেয়। এভাবেই চলতে থাকে...। শিজাদ মুগ্ধ হয়ে দেখে কৃষ্ণকুমারী রাখালির মিষ্টি হাসিমুখ ও চোখের চাহনি। কাপড় কাচতে কাচতে হালকা ঘেমে ওঠে গোলগাল কালো মুখ। রোদের আলোয় চকচক করে চোখের কাজল!
এভাবেই সেদিন অনাকাঙ্ক্ষিত শাস্তিভোগ ও ভালোলাগায় ডুবে যায় শিজাদ। আর সে স্মৃতিটুকু বারবার মনে করে সুখসাগরে ভাসে।
রাখালি এ গাঁয়েরই মেয়ে, মিষ্টি চঞ্চল কালো মেয়ে। সফদর আলী ধোপার ছোট মেয়ে। দুষ্টুমি ও দুরন্তপনায় সবার চেয়ে এগিয়ে। প্রতিবার স্কুলের খেলাধুলা প্রতিযোগিতায় একাধিক প্রাইজ আনবেই। একবার দড়িলাফে জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। শিজাদের সঙ্গে রাখালির পরিচয় স্কুল থেকে। রাখালি তখন ক্লাস সেভেনে, শিজাদ যখন ক্লাস টেনে। এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করার পর, ওর আর পড়াশোনা এগোয়নি। এখন রাখালি ক্লাস নাইনে। দুষ্টুমি ও ঝগড়া থেকে শিজাদ হয়ে ওঠে ওর প্রতি প্রচণ্ড ভালোলাগার ব্যথায় ভুগতে থাকা রোগী। চটপটে স্বভাবের রাখালি বরাবরই কথা বলায় পটু ও যাকে তাকে বোকা বানিয়ে নাকানি চুবানি খাওয়াতে মজা পায়। আর নাকানি চুবানির এ বিষয়টা শিজাদের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি হতে থাকে। হাসি-দুষ্টুমির হাত ধরেই ওদের মধ্যে বেড়ে ওঠে প্রতিদিনের রসায়ন।
স্কুলে যাবার পথে রোজ শিজাদ রাখালির অপেক্ষায় থাকত। সাদা ওড়না, সালোয়ার, আকাশি রঙের কামিজ ছিল রাখালির স্কুল ড্রেস। দূর থেকে অনেকের মাঝে দেখেও শিজাদ ওকে ঠিক চিনতে পারত। তারপর নানা কথায় গল্পে একসঙ্গে হেঁটে শিজাদ ওকে কুমারবাড়ির মোড় অবধি এগিয়ে দিত। সারাদিন কাজ শেষে, আবার অপেক্ষায় থাকত কখন স্কুল ছুটি হবে। ছুটির পর মেঠোপথে ওদের হাসি-তামাশার স্রোত আছড়ে পড়ত। একটু একটু করে রাগ-অভিমান মিশ্রিত ভালোলাগা প্রকাশ পেত রাখালির মাঝে। কিন্তু কখনো ও মুখ ফুটে উচ্চারণ করেনি, ভালোবাসা কথাটি। কিংবা শিজাদের প্রস্তাবেও কখনো হ্যাঁ-না প্রকাশ করেনি। কেবল হাসির সুতীব্র মাত্রায় পথ-প্রান্তর ছুঁয়ে পাগলামির রং-রেখা-রসের জাদু ছড়িয়ে দিত।
রাখালি গাছে চড়তে ভালোবাসত। এমন কোনো দিন নেই, কারোর বন-বাগানে যে সে ঢুঁ না মারত। বিএসসির আমবাগানের প্রতিটি ডালপাতা ওর চেনাজানা। আর বনবিভাগের বাংলোবাড়ির ভেতরের বাগানটা তো নিজেরই মনে করে। কারণ, ওখানে বছরে দু-একবার সরকারি গেস্ট আসে কি আসে না তার ঠিকঠিকানা নেই, যারাই আসে উপজেলা ডাক বাংলোতেই ঠাঁই নেয়। তাই কেয়ারটেকার কেবল তালা ঝুলিয়েই খালাস। ওসব ফলের গাছগুলো ঘুরেফিরে দেখা, পাকা ফলের প্রতি সঠিক সময়ে সত্ব্যবহার করা ছিল রাখালির ডিউটি।
একদিন শিজাদকে অবাক করে দিয়ে ওর হাতে এক ডজন আতাফল গুঁজে দিয়েছিল। শিজাদ এসবের উত্স জানতে চাইলে বলে, ওগুলো সেরাজ পাগলার উঠোনের গাছ থেকে আত্মসাত্ করেছি। পাগলার বউ এখনো কাপড় কাচার দাম দেয়নি। এ দুটো কথা বলে প্রজাপতির মতো উড়ে চলে যায় রাখালি।
শিজাদ পরে ওগুলো সেরাজ পাগলার বাড়িতে ফিরিয়ে দেয়। এমন দুষ্টুমির খতিয়ান প্রতিদিনই একটা-দুটো কি তারও বেশি ঘটতে থাকে।
আর একদিনের ভয়ার্ত রোমাঞ্চে পাল্টে যায় সবকিছু। সে ঘটনার স্মৃতি এখনো শিজাদ দুই চোখভরে বয়ে বেড়ায়।
অজানা ব্যথা-আনন্দের ভায়োলিন বাজিয়ে খুঁজে ফেরে স্মৃতির কাঠখড়। বর্ষার শেষ সময় তখন। স্কুল ফাঁকি দিয়ে রাখালি শিজাদের হাত ধরে যেতে থাকে দূর উত্তরের গাঁয়ে। বইগুলো বেতঝোপে লুকিয়ে পৌঁছে যায় নদীর পাড়ে। ঘাটের ভিড় এড়িয়ে পাড় ধরে হেঁটে বেড়াতে থাকে। পথ চলতে চলতে হঠাত্ মাঝি বিহীন নৌকা পেয়ে চুপিচুপি নৌকা ভাসায় নদীর বুকে। স্রোতের পিঠে চড়তে চড়তে ওরা থামে নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা দ্বীপ ঘুঘুর চরে। ওটা ছিল সবুজ লতা-বৃক্ষের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। নতুন এ স্থানটি বাঁধনহারা রাখালিকে আনন্দপবনে ভাসিয়ে দেয়। হাসির কনকলতা বাতাসে দুলতে থাকে অনবরত।
আম, জাম ও পেয়ারা গাছে ভরপুর পুরো দ্বীপ। একসময় রাখালির চোখ পড়ে করমচা ঝোপের দিকে। লাল টকটকে করমচা ঝুলে আছে থোকা থোকা। আর কথা না বাড়িয়ে ওর নিশানা হয়ে ওঠে করমচা ঝোপ। ঝোপের পাশে দাঁড়ানো পেয়ারা গাছে সে লাফিয়ে ওঠে। এডাল থেকে ওডালে পা বাড়ায়, মুঠো মুঠো করমচা ছুড়ে দেয় শিজাদের দিকে। এভাবে চলতে থাকে দীর্ঘ অভিযান, হই হুল্লোড়ে উল্লাস! রাখালি হঠাত্ ওর পায়ের কাছে শীতল কিছু অনুভব করে। অন্যডালে সরে এসে, পায়ের দিকে তাকায়, দেখতে পায় পা জোড়া খুনে ভেসে যাচ্ছে। শরীরে কোথাও কেটে যাবার মতো কোনো ব্যথা পায়নি রাখালি, এটা বুঝতে পারার পর, জোঁকের ভয়টা ভাবনায় আসে। চিত্কার করে শিজাদকে ডাকে।
তড়িঘড়ি নিচে নেমে আসে রাখালি। শাদা সালোয়ার তখন রক্তে একাকার! রক্তের স্রোত পা বেয়ে মাটিতে নেমে আসে। রাখালি জামার ভেতর খুঁজে জোঁকের অস্তিত্ব পায় না। হতভম্ব শিজাদের জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বলে, আমার কী হয়েছে আমাকে বাঁচাও! আমি মরে যাবো, এত রক্ত কোথা থেকে আসছে জানি না।
রাখালির অস্থিরতা বেড়ে চলে। শিজাদ ওকে শান্ত করে বলে, ভয় পেয়ো না, বুঝেছি করমচার কাঁটায় তোমার কোথাও কেটে গেছে নিশ্চয়ই!
ভরসার আশ্রয়ে শিজাদের দিকে তাকিয়ে রাখালি কান্না জড়িয়ে বলে, আমার খুব ভয় হচ্ছে, আমাকে বাঁচাও।
শিজাদ রাখালির হাত-পা, শরীরে কোথাও কোনো কাটা বা রক্তের উত্স খুঁজে পায় না। তারপর কামিজের নিচের অংশ সরাতেই দেখা যায়, পুরো সালোয়ার রক্তাক্ত! হাঁটু ও ঊরুর দিকে সবচেয়ে বেশি। রাখালি আর কিছু ভাবতে পারে না। কোমর থেকে সালোয়ারের গিঁট সরিয়ে দেয়। কামিজ খুলেতেই দেখা যায়, ওর গোপনাঙ্গে রক্তের ঝরনা হয়ে গেছে। মাছের কানকোর মতো টকটকে লাল! ওখান থেকেই রক্তের স্রোত গড়িয়ে নামছে।
নিজের শরীরের এমন খুন দেখে সহ্য করতে পারে না রাখালি। ও প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। মুহূর্তে জ্ঞান হারায় রাখালি। ঘাবড়ে যায় শিজাদ, রাখালির কী হলো তা কোনোভাবেই ধরতে পারে না। ওটা যে ঋতুস্রাবের রক্ত নয়, তা সে নিশ্চিত! রাখালিকে চিত্কার করে ডেকেও সাড়া পাওয়া যায় না। দিশেহারা শিজাদ নৌকায় তোলে ওকে ঘাটে নিয়ে আসে। ঘাটপাড়ের একটা দোকানের বেঞ্চে রাখালিকে শুইয়ে দেয়। বেঞ্চটাও রক্তে ভিজে ওঠে।
শিজাদ দোকানদারের কাছ থেকে একটা জগ চেয়ে নিয়ে, নদী থেকে পানি এনে রাখালির মাথায় ঢালে। অনেক ডেকেও রাখালির সাড়া পাওয়া যায় না। অসহায়ের মতো ছুটোছুটি করতে থাকে শিজাদ।
দেখতে দেখতে সেখানে স্থানীয়দের ভিড় বাড়ে। চারদিক ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়ানো মানুষজন নানা জিজ্ঞাসায় শিজাদকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে! শিজাদ সবার কাছে সাহায্য চায় রাখালিকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য। কেউ তাকে সাড়া দেয় না। সন্দেহসূত্রে অতিবিজ্ঞ জনতা যা বোঝার আপনা থেকেই বুঝে নেয়। কারণ, মানুষজনের ইতিবাচক ভাবনার ক্ষমতা খুব কম! শিজাদের কথা-কান্না মিলিয়ে যেতে থাকে লোকজনের অজস্র বাজে মন্তব্যে!
শিজাদ ও রাখালির এই ঘটনা উড়ো সংবাদের মতো লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে একদল বখাটে ছেলের আবির্ভাব ঘটে ওখানে। শিজাদ জনতার চোখ মুখে কোনো মায়া-সহমর্মিতা খুঁজে পায় না। সবার চোখে হিংস্রতার প্রকাশ! সবগুলো চোখ তাকে চিবিয়ে খেতে চায়! এসব দেখে শিজাদ রাখালিকে কাঁধে তোলে এগোতে চায়। যেতে চায় কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে, সুস্থ করতে চায় প্রিয় রাখালিকে। ঠিক তখনই পথ আগলে দাঁড়ায় বখাটেরা।
—এই এলাকায় আইসা আকাম করবা, আর পার পাইয়া যাইবা, তা হবে না।
আরেকজন বলে, খুব তো মজা নিছোস, ফাটায়া ফেলছস।
লাল লম্বা চুলের ছেলেটা বলে, পাকা খেলোয়াড় রে তুই... সবকিছু লালে লাল করে দিছোস...
শিজাদ ওদের বোঝাতে চায় ও এমন কিছু করেনি, কোনো অপরাধ বা পাপ করেনি। কেউ শিজাদের কথা কানে তুলতে চায় না। বরং বলে ওঠে, দেখ শালা, কিস্সা শোনাচ্ছে...
ভিড় এড়িয়ে এগোতে গেলে শিজাদকে আচমকা আঘাত করে বখাটে ছেলেরা। কাঁধ থেকে রাখালি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই দাঁড়িয়ে সার্কাস দেখতে থাকে, অপূর্ব মুগ্ধতায়। এত আনন্দ ওরা আগে কখনো অনুভব করেনি। কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে, কুকর্মের উচিত শিক্ষা...
ধূলির ওপর পড়ে থাকা শিজাদের কপাল ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। রক্তে ভরে যায় চোখের কোটর!
সেদিনের পর থেকে রাখালি সমাজের চোখে নষ্টা, আর বাবা-মায়ের শেষ অবলম্বন শিজাদ মানসিকভাবে পঙ্গু! যেদিকে তাকায় সেদিকে কেবল সে রক্ত দেখতে পায়!