ইয়েমেনে শান্তি আলোচনা সফল হবে তো?

 

ইয়েমেন, একবিংশ শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একটি অঞ্চল। সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন এই সূতিকাগার বর্তমানে আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র একটি দেশ। ২০১১ আরব বসন্তের পর থেকে নানা সংকট ও গৃহযুদ্ধে দ্বিধাবিভক্ত দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের মতে, ইয়েমেনে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব-সৃষ্ট বিপর্যয় চলছে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের অবসানে সুইডেনে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত এক শান্তি আলোচনায় মিলিত হয়েছে দেশটির যুদ্ধরত পক্ষগুলো। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষ দূত মার্টিন গ্রিফিথ ইয়েমেন সরকার ও হুতি প্রতিনিধিদের প্রতি যুদ্ধ পরবর্তী দেশটির পুনর্গঠনে অনতিবিলম্বে কাজ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।

ইয়েমেনে সংঘর্ষের সূচনার পর দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির সরকারি মুখপাত্র এবং হুতি বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিগণ সকল সংঘাতের ইতি করতে একসঙ্গে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন। যে সংঘাত ৫৬ হাজার নিরপরাধ জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং ২২ মিলিয়ন মানুষকে মানবেতর জীবনযাপনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শান্তি আলোচনা সভায় নিজের সূচনা বক্তব্যে মার্টিন গ্রিফিথ বলেন, তিন বছরেরও দীর্ঘ সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সমাধান যুদ্ধরত উভয় পক্ষের হাতেই নিহিত আছে। ইতিবাচক দিকটি হচ্ছে, উভয় পক্ষই আশু সমাধানের জন্য আগ্রহী, যা এর আগে আয়োজিত শান্তি আলোচনাগুলোতে অনুপস্থিত ছিল।

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে রিম্বো শহরে জাতিসংঘের বিশেষ দূত গ্রিফিথ মার্টিন মূলত পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসেবে এই শান্তি আলোচনার আয়োজন করেছেন, যাতে ভবিষ্যত্ সমঝোতার পথ প্রশস্ত হয়। এই আলোচনাটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইয়েমেনবাসী ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ২০১৫ সালের মার্চে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব মিত্রদের নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এ পর্যন্ত দেশটিতে অগণিত রক্তক্ষয় হয়েছে। এই সংঘাত বন্ধে গত কয়েক মাস ধরে শান্তি আলোচনার চেষ্টা করে আসছিল জাতিসংঘ। যার সফল একটি উদ্যোগ গ্রিফিথ নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এবারের আলোচনায় দু’পক্ষের মধ্যে আস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসেবে বন্দী বিনিময় চুক্তি সই হওয়াকে ইতিবাচক লক্ষণ বলেই মনে করেন তিনি। তার মতে, এর ফলে হাজার হাজার পরিবার একত্রিত হবে। আর সেই প্রক্রিয়াটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্যই এখন থেকে কাজ করতে হবে।

পরবর্তীতে যখন যুদ্ধরত পক্ষগুলো মুখোমুখি হবে না তখন পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় বন্দর নগরী হোদাইদায় যুদ্ধবিরতি, বড় সংখ্যক বন্দী বিনিময়, সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর খুলে দেওয়া এবং হুতি অধ্যুষিত এলাকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া ইত্যাদি বিষয় সমঝোতার পথ প্রশস্ত করতে পারে। আর এজন্য সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্ট্রমও এই আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা বলে মনে করেন। তার মতে, পারস্পরিক আলোচনা এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্টিনের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা, এই পুরো বিষয়টি আসলে যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্ভর করে। ক্ষতিপূরণ, আপোষ এবং সাহস, এই বিষয়গুলোতেই এখন বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

যদিও ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদ আল ইয়ামানি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে খুব একটা ইচ্ছুক নন। প্রেসিডেন্ট হাদিকে ছাড়া একটি প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল গঠনের হুতি প্রস্তাবকে তিনি ‘ননসেন্স’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, হুতিদের রাষ্ট্রীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে বৈধ সরকারের কাছে সমর্পণ করা উচিত। না হলে, শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের ইচ্ছের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত এবং সকল অস্ত্র, সামরিক সম্ভার ও মিসাইল নিয়ে আত্মসমর্পণ করা উচিত। অন্যথায় স্থায়ী কোনো সমাধান সম্ভব নয়।

গত মার্চ ২০১৫ থেকে ইরান সমর্থিত বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্ট হাদির আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট সরকারকে অপসারিত করার পর সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিলিত জোট, হুতিদের ওপর ভয়ংকর সামরিক হামলা চালিয়েছে। এই সপ্তাহের শুরুতে আস্থা সৃষ্টির প্রক্রিয়াস্বরূপ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ৫০ জন হুতি বিদ্রোহীকে চিকিত্সার জন্য পার্শ্ববর্তী ওমানে স্থানান্তরিত করতে সম্মত হয়েছে। ইয়েমেন সরকার হুতিদের সঙ্গে বড় আকারে বন্দী বিনিময় করবে বলে সম্মত হয়। সংবাদমতে জানা যায়, দুই হাজারের বেশি সরকার সমর্থিত গোষ্ঠীর লোক ও ১৫০০ হুতি বিদ্রোহীর বিনিময় হতে পারে। এ প্রসঙ্গে ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আশাবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে হুতি প্রতিনিধিদের প্রধান মোহম্মদ আব্দুল সালামও সরকারের ঘোষণার প্রতি নিজেদের সন্তোষ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে হুতিরা জানিয়েছে, তারা আলোচনায় বসতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এছাড়া তারা কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হোদাইদা বিমানবন্দরকেও জাতিসংঘের কাছে ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের জন্য মানবিক সাহায্য সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ এই বিমানবন্দরটি। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান হামলা বন্ধের বিনিময়ে তাদের ওপর ড্রোন ও মিসাইল হামলা বন্ধ করতেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে হুতিরা।

যুদ্ধরত উভয় পক্ষের ইতিবাচক সাড়ার প্রেক্ষিতে ইয়েমেনি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের কনসালটেন্ট পিটার সলসব্যারি, দুইপক্ষের আলোচনা সঠিক দিকে যাচ্ছে বলেই মনে করেন। তিনি আরো বলেন, আলোচনার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, পারস্পরিক আস্থা সৃষ্টির পদক্ষেপ। যার ফলে হোদাইদা বন্দরকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। আরেকটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, ভবিষ্যত্ আলোচনায় একত্রিত হওয়ার আশাবাদ নিয়ে একমত হওয়া।

যদিও বৃহস্পতিবারই হুতিদের গণমাধ্যম শাখা আল মাসিরাহ জানায়, হোদাইদা প্রদেশের আল-দুরায়মি শহরে যুদ্ধবিমান হামলায় তিনজন নারী নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি যখন কিছুটা স্বাভাবিকের পথে এগোচ্ছে তখন এই ধরনের ঘটনাগুলো বৈরি পরিবেশ তৈরি করতে পারে। উভয় পক্ষের আলোচনা শুরু হওয়ার কিছু আগে ইয়েমেনি সরকার হোদাইদা থেকে হুতিদের সম্পূর্ণ সরে যেতে বলেছে। আবার হুতিরাও তাদের দাবি-দাওয়া পূরণ না হলে সানা বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে ২০১১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী এবং ইয়েমেনি একটিভিস্ট তাওয়াক্কল কারমানের মন্তব্য, সৌদি, আমিরাত এবং ইরান ইয়েমেনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করলে তবেই শান্তি অর্জন সম্ভব। এই হস্তক্ষেপ ইয়েমেনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা আর তার সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়ানো ছাড়া কিছুই করতে পারছে না। এই দেশগুলো অনধিকার চর্চা না কমানো পর্যন্ত ইয়েমেন তার সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক একমত্যে পৌঁছতে পারবে না।

দীর্ঘদিন ধরে চলা দেশটির অরাজক পরিস্থিতির ইতি টানতে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সৌদি যুবরাজের কট্টর সমালোচক জামাল খাশোগির নির্মম হত্যাকাণ্ড। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। এর মধ্যে জার্মানি ও নরওয়ে সৌদি আরবে অস্ত্র রপ্তানি করা স্থগিত করেছে। রিয়াদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব এখন আমেরিকার সিনেটরদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। বুধবার ইয়েমেনের যুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার পেছনে মার্কিন সিনেটরদের একটি গ্রুপ প্রকাশ্যে মোহাম্মদ বিন সালমানকে দায়ী করেছেন।

এদিকে ইয়েমেনের জনগণ আর সময়ক্ষেপণ চাচ্ছে না। ২০১৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহর বিশ্বস্ত সৈন্যদের সাথে মিলে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ দেশটির বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকে সংঘাতে সংঘর্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে দেশটি। পরের বছর হাদি সরকারের পুনরুদ্ধারে ইয়েমেনে সৌদি চালিত জোটের আকাশপথে বিশাল অভিযান এবং এই জোটকে যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিক ও ইন্টিলিজেন্স সহায়তা দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় ইয়েমেনের জনগণের আর্জি, যুদ্ধরত দুইটি পক্ষ তাদের নিজস্ব মতভেদগুলো এড়িয়ে, ব্যক্তিগত লাভের চিন্তা না করে জনগণের কল্যাণ চিন্তাকেই যেন অগ্রাধিকার দেন। আর সেখানেই শান্তি আলোচনার মূল সাফল্য নিহিত।