উত্তর-পূর্ব এশিয়া আরেক আরেক ‘ইউরোপ’

দক্ষিণ কোরিয়ার মোট

বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ হিস্যা

ছিল জাপানের। কিন্তু এখনকার অঙ্কটা মাত্র ৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বাণিজ্যে চীনের হিস্যা মাত্র ৪ শতাংশ থেকে উন্নীত

হয়েছে ২১ শতাংশে। দক্ষিণ কোরিয়া ক্রমান্বয়েই সিনো-সেন্ট্রিক অর্থনৈতিক বিন্যাসের সঙ্গে আরও বেশি

একাত্ম হচ্ছে

শফিকুর রহমান রয়েল

 

উত্তর-পূর্ব এশিয়া বড় অদ্ভুত জায়গা। এক নিঃসঙ্গ উত্তর কোরিয়াকে বাদ দিলে বিশ্বের সবচে’ সমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অগ্রসর জাতিসমূহের বসবাস যে কয়েকটি অঞ্চলে, তার মধ্যে এটিও পড়ে। দশকের পর দশক ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতির ইঞ্জিন হয়ে রয়েছে জাপান, সে জায়গায় দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলো ইতিহাসের সেরা অর্থনৈতিক চমকগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। চীনের প্রসঙ্গ উঠলেতো কেবল বিস্মিতই হতে হয়; প্রশংসার সাগরে ভাসানো ছাড়া উপায় থাকে না। সবচে’ জনবহুল রাষ্ট্রটি আসছে বছরগুলোয় ডলারের মূল্যে পৃথিবীর সর্ববৃহত্ অর্থনীতি বনে যাওয়ার জন্য তৈরি। এর ‘বিদ্যুত্-গতির’ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে এক সময়ের বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রটি আজ রূপান্তরিত হয়েছে বিশ্ব কারখানায়। এক প্রজন্ম সমান সময়ের মধ্যেই কোটি কোটি লোককে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনাটা হয়তো কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব এবং অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে তারা হতে পারে রোল মডেল। উত্তর-পূর্ব এশিয়াকে এখন বহুলাংশে দেখা হয় সফল পুঁজিবাদের বাতিঘর হিসেবে।

সম্পদ ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ও দক্ষতার প্রশ্নে উত্তর-পূর্ব এশিয়া উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমানভাবে ইউরোপসদৃশ হয়ে উঠলেও এটি অস্বীকার করার জো নেই যে, উত্তর-পূর্ব এশিয়ার অবস্থা যুগপত্ভাবে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো-সমৃদ্ধি ও সংঘাতের মঞ্চ। নিজেদের মধ্যে গভীরে প্রোথিত পারস্পরিক বিদ্বেষ, আঞ্চলিক বিরোধ, অস্ত্রের মহড়া এবং প্রতিযোগিতার সর্বক্ষেত্রে বিরামহীন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য। একে অপরকে ঐতিহাসিক দুঃখ-দুর্দশার কারণও ভাবে তারা। তারপরও এ অঞ্চলটিকে সব ধরনের সংঘাত থেকে দূরে রাখতে কিছু দিন আগে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেছিলেন জাপান, দক্ষিণ এশিয়া ও চীনের নেতারা। ঐতিহাসিক ত্রিপাক্ষিক বৈঠক শেষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লিকিয়াং এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাস্যোজ্জ্বলভাবে যে কথাগুলো বলেছিলেন তার সারমর্ম হলো, আগের সেই সুসম্পর্ক পুরোপুরিই ফিরে এসেছে।

তিন দেশের তিন নেতার আলোচনায় নানাবিধ বিষয় ঠাঁই পেলেও ঘুরে ফিরে এসেছে সেই একটি প্রসঙ্গই, অর্থনৈতিক সহযোগিতার অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা। আলোচনায় দুঃখ-দুর্দশার জন্য একে অপরকে দোষারোপ না করার পাশাপাশি ভূখণ্ডগত ইস্যুতে দীর্ঘ বিভেদের প্রসঙ্গও খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। হেনরি কিসিঞ্জার তার ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ নামক সর্বশেষ বইয়ে লিখেছেন, এশিয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী জাতিতে পরিপূর্ণ। মহাদেশটির প্রায় সবগুলো দেশই উঠে আসছে। এশিয়ার যোগ্যতামাফিক সম্পূর্ণ ভূমিকা বিশ্ব এখন পর্যন্ত দেখতে পায়নি। প্রতিষ্ঠানীভূত সংহতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গভীরতর সহযোগিতা ঘটনাক্রমে ভূখণ্ডজনিত উত্তেজনা প্রশমিত করছে,  যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বের সবচে গতিশীল ও নিয়ত পরিবর্তনশীল অঞ্চলগুলোর একটিতে সংঘাত প্রতিহত হবে।

এ কথা সবাই জানে যে, অতিপ্রতিযোগিতার এ অঞ্চলে প্রত্যেকটি দেশই জাতীয় সম্মান বৃদ্ধিকারক নানাবিধ কর্মসূচি চালু রেখেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন বিরামহীনভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বে তাদের স্থান উন্নয়নের জন্য। উদ্ভাবন ও উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একে অপরকে ধরাশায়ী করার। এতে দোষের কিছু না থাকলেও ওয়ার্ল্ড অর্ডার বইয়ে লেখা কিসিঞ্জারের যুক্তি মানলে নিজেদের স্বার্থেই উত্তর-পূর্ব এশিয়ার আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক সুদৃঢ় করা জরুরি, যে সত্যটি হয়তো এ তিন দেশের নেতাদের প্রত্যেকে অনেক আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এর প্রমাণ হচ্ছে, স্নায়ুযুদ্ধ যুগের পুরোটাতেই পুঁজিবাদী টোকিও ও সিউল যেখানে সমাজতন্ত্রী বেইজিং ও পিয়ংইয়াংয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে চীনের ক্রমিক সংহতিতে সে জায়গায় দেখা গেল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান ধীরে ধীরে দৈত্যসম মহাদেশীয় প্রতিবেশীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। সবচে’ জনবহল ও তুলনামূলকভাবে সস্তা শ্রমের দেশটিকে সঙ্গী বানালে আখেরে তাদেরই যে বেশি লাভ। যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-কোরিয়া ত্রিপাক্ষিক জোটের অংশ হয়েও সিউল আজ চীনকে বৃহত্ বাণিজ্যিক অংশীদার বিবেচনা করে।

১৯৯১ সালে ফিরে গেলে দেখতে পাই, দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ হিস্যা ছিল জাপানের। কিন্তু এখনকার অঙ্কটা মাত্র ৮ শতাংশ। পক্ষান্তরে একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বাণিজ্যে চীনের হিস্যা মাত্র ৪ শতাংশ থেকে উন্নীত হয়েছে ২১ শতাংশে। দক্ষিণ কোরিয়া ক্রমান্বয়েই সিনো-সেন্ট্রিক অর্থনৈতিক বিন্যাসের সঙ্গে আরো বেশি একাত্ম হচ্ছে।