জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি

টোকিওর বিশাল পানি নিষ্কাশন চ্যানেলে কি আর কাজ হবে?

টোকিওতে যদি এখন

এমন বন্যা হয়, তাহলে আর

ওই বিশাল চ্যানেলেও কাজ হবে না, এর সঙ্গে আর কি প্রযুক্তি যুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে জাপান সরকারকে এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে এবং দ্রুত তা বাস্তবায়িত করতে হবে। নইলে বন্যা থেকে টোকিওকে রক্ষা

করা কঠিন হবে

আশেক খান আলেখীন

 

সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উন্নত এই দেশটির নাম শুনলেই প্রবীণদের মনে পড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমার আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া হিরোশিমা, নাগাসাকির কথা, আর ছোটদের মানসপটে ভেসে ওঠে নারুতো, ব্লিচ, পোকামন, ড্রাগন বল জি সহ নানা বিখ্যাত অ্যানিমেশন অর্থাত্ কার্টুন সিরিজের সব দৃশ্য। কিন্তু কিছুটা অন্তর্মুখী ও রক্ষণশীল চরিত্রের এই রাষ্ট্রটি মধ্যে কী ধরনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে, তার খবর আমরা কতটুকু রাখি। দেশটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে টোকিওসহ বড় বড় শহরগুলোর বিশাল বিশাল ভবন, সুপরিসর রাস্তা, ফ্লাইওভার, মেট্রো রেল এবং আরও নানা স্থাপনা আমাদের চোখে পড়ে। নজরে আসে রাস্তায় বিশ্ববিখ্যাত টয়োটা, হোন্ডা, নিশানসহ নামকরা কোম্পানির দামি দামি সব গাড়ির ছুটোছুটি, মেট্রো রেলে ঘণ্টায় শত শত মাইল বেগে ছুটে চলা বুলেট ট্রেন আমাদের বিস্মিত করে। ভাবি কত অল্প সময়ে কী উন্নতিই না করেছে দেশটি। তবে শুধু উপরে নয়, মাটির নিচেও দেশটিতে এমন কিছু অবকাঠামোগত কাজ হয়েছে, যা জানলে অনেকেই অবাক হবেন।

এশিয়ার অধিকাংশ দেশের মতো জাপানেও রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য নদী। সেখানে বৃষ্টিও হয় প্রচুর। যে কারণে শত শত বছর ধরে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করেই জাপানের মানুষকে টিকে থাকতে হচ্ছে। প্রতি বছরই বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাপানে অনেক লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৪৭ সালে টাইফুন ক্যাথলিনের আঘাতে রাজধানী টোকিওর ৩১ হাজার বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়, মারা যায় ১১শরও অধিক মানুষ। এর এক দশক পর আঘাত হানে টাইফুন কানোগাওয়া। তখন টোকিওতে ৪শ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিল্প কারখানা পানিতে তলিয়ে যায়। তবে ভূমিকম্প, বন্যার মতো প্রাকৃতিক সব দুর্যোগ জাপানের অগ্রগতিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান সরকার দেশে বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা খাতে মোট বাজেটের শতকরা ৬ থেকে ৭ ভাগ বরাদ্দ দেয়। রাজধানী টোকিওসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ড্যামসহ নানা স্থাপনা।

জাপানের রাজধানী টোকিও এমন এক সমতল ভূমিতে অবস্থিত যার আশেপাশে এবং মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে পাঁচ পাঁচটি নদী। এছাড়াও শহরের কাছাকাছি রয়েছে আরও ডজনখানেক শুকনো নদী যেগুলো বর্ষায় পানিতে ভরে ওঠে। এ অবস্থায় দেশটির অবস্থা বর্ষায় নাজুক হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে টোরটাজাদা নামে জাপানের পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা মজা করে বলেছেন, ‘এত পানির মাঝে রাজধানী করার চিন্তা কার মাথা থেকে বেরুলো, কে জানে।’

প্রথম প্রথম সমস্যাটা এত তীব্র ছিল না, কিন্তু অতি নগরায়ণ, শিল্প-কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী টোকিওতে বন্যা ও নদী ভাঙনের প্রবণতা বাড়তে থাকল। ফলে জাপান সরকারকে টোকিও’র বন্যা সমস্যা মোকাবিলায় বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হলো। রাজধানীর মাটির নিচে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ২০০ কোটি ডলার খরচ করে গড়ে তোলা হলো বিশাল এক জলাধার বা চ্যানেল যেটি অতিবৃষ্টি ও বন্যার সময় পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহূত হয়ে থাকে। ২০০৬ সালে এটি চালু করা হয়। ভূপৃষ্ঠের ২২ মিটার নিচে নির্মিত খ্রিষ্টানদের ক্যাথেড্রলি সদৃশ এই চ্যানেলে রয়েছে কয়েক ডজন বিশালাকৃতির পিলার যার এক একটির ওজন ৫শ টনের মতো। আর চ্যানেল থেকে পানি নদীতে নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে ১৩ হাজার অশ্বশক্তির বেশ কয়েকটি পাম্প যেগুলো সেকেন্ডে ২০০ টন পানি নিষ্কাশন করতে সক্ষম।

চ্যানেলটি পানিতে ভরে গেলে পাম্পের মাধ্যমে সেটি খালি করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। চ্যানেল থেকে নিষ্কাশিত পানি প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল দিয়ে গিয়ে পড়ে নদীতে। এই ব্যবস্থার কারণে ২০০৬ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বন্যা সমস্যা আর বিব্রত করতে পারেনি টোকিওবাসীকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইদানীং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। শহরের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা এখন আর ওয়াটার চ্যানেলের ক্ষমতাতেও কুলাচ্ছে না। চলতি বছরের শুরুতে জাপানের পশ্চিমাঞ্চলে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় শত শত লোক মারা যায়, দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টোকিওতে যদি এখন এমন বন্যা হয়, তাহলে আর ওই বিশাল চ্যানেলেও কাজ হবে না, এর সঙ্গে আর কি প্রযুক্তি যুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে জাপান সরকারকে এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে এবং দ্রুত তা বাস্তবায়িত করতে হবে। নইলে বন্যা থেকে টোকিওকে রক্ষা করা কঠিন হবে।