তারামন বিবি সেই শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন যারা চিরকালই অর্থ, সম্পদ, জমিন ও উপর্যুক্ত জীবিকা
থেকে বঞ্চিত থেকেছেন, অথচ শুধুমাত্র মাটির টানে ও হূদয়ের সততা থেকে দেশের জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে গেছেন
পদে পদে। সবশেষ দেশবাসীকে কাদিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। তারামন বিবি
যেখানে থাকুক, ভালো থাকুক। সৃষ্টিকর্তা তাকে ভালো রাখুক
মোহাম্মদ ওমর ফারুক
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অসামান্য সাহসিকতার নজির স্থাপনকারী বীর প্রতীক তারামন বিবি বিজয় মাসের প্রথম প্রহরে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলায় নিজ বাসায় তিনি মারা যান। কুড়িগ্রামের শঙ্কর মাধবপুর গ্রামে তারামন বিবি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার আবু তাহেরের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার তারামন বিবিকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
তারামন বিবি বাংলাদেশের একটি বীরত্বপূর্ণ নাম এবং ইতিহাস| জন্ম ১৯৫৭ সালে। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাঠি ইউনিয়নের শঙ্কর মাধবপুর গ্রামে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন নানা ভূমিকায়। ১৯৭৩ সালে তত্কালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তাঁর সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তারামন বিবি ১১ নং সেক্টরে নিজ গ্রাম কুড়িগ্রাম জেলার শঙ্কর মাধবপুরে ছিলেন। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উত্সাহিত করেন। যিনি তারামনের গ্রামের পাশের একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তারামনকে ক্যাম্পে রান্নাবান্নার প্রস্তাব দেন। প্রথমে তারামনের মা কুলসুম বেওয়া এতে রাজি হননি। পরে মুহিব হাবিলদার তারামনকে ধর্মমেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপরই তারামনকে দশঘরিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে রান্নার কাজে পাঠাতে রাজি হন তাঁর মা। তখন তারামনের বয়স ছিল ১৪ বছর। কিন্তু পরবর্তীতে তারামনের সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার তাঁকে অস্ত্র চালনা শেখান। তারামন বিবির একটি গল্প বলা যাক, ঘটনা ছিল ঠিক মধ্য দুপুরের। সবাই খেতে বসেছে। তারামনকে পাকিস্তানি সেনাদের কেউ আসছে কি না তা দেখার জন্য বলা হলো। তারামন সুপারি গাছে উঠে দূরবীন দিয়ে চারিদিকে লক্ষ্য রাখছিলেন। হঠাত্ দেখলেন, পাক বাহিনীর একটি গানবোট তাঁদের দিকে আসছে। সবার খাওয়া বন্ধ। দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে অ্যাকশনের অপেক্ষা করতে লাগলেন সবাই। তারামন তাঁর সহযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে অংশ নেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। সেদিন তারা শত্রুদের পরাস্ত করতে সক্ষম হন। এরপর তারামন অনেক যুদ্ধে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অংশ নেন। অনেকবার তাদের ক্যাম্প পাকবাহিনী আক্রমণ করেছে, তবে ভাগ্যের জোরে তিনি প্রতিবার বেঁচে যান।
যুদ্ধের পুরো ৯টি মাস ধরেই বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষভাবে অংশ নেন। এরপর থেকেই তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। এসব যুদ্ধের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো, এগারো নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত গাইবান্ধার সওঘাটা ও ফুলছড়ি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ঐ এলাকার কোদালকাঠির আকস্মিক যুদ্ধে তারামন বিবি একাই প্রায় ৫-৬ জন পাক সেনাকে খতম করতে সক্ষম হন। সম্মুখ সমরে তাই তারামনের অর্জন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
শুধু সম্মুখ যুদ্ধই নয়, প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে তারামন ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে শত্রু শিবিরের অবস্থান আর গোপন পরিকল্পনা, সেখানকার লোকবল, মজুদকৃত অস্ত্রের বর্ণনা জানতে পাগলের বেশে গেছেন পাকবাহিনীর ঘাঁটিতে। কখনও সারা শরীরে কাদা মাটি, কালি, ময়লা আবর্জনা, এমনকি মানুষের বিষ্ঠা পর্যন্ত লাগিয়ে পাগল সেজেছেন তারামন। আবার কখনো মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী, অন্ধ, বোবা সেজে পাক সেনাদের সামনে দীর্ঘ হাসি কিংবা কান্নার অভিনয় করে শত্রু সেনাদের খোঁজ নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের প্রয়োজনে কখনো সাঁতরে পার হয়েছেন নদী। আবার কখনো কলাগাছের ভেলা নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। এভাবে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর শ্রম, আন্তরিকতা, ত্যাগ সূচনা করেছিল এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সুবিশাল উপন্যাসের মধ্যে তার নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র বীরত্বের গল্পের।
তার মতো আরো লাখো মানুষের আত্মত্যাগে একাত্তরের ডিসেম্বরে স্বাধীন হয় এই দেশ। এরপর ১৯৭৩ সালে তত্কালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তাঁর সাহসীকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু তখন আর তাঁকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। এরপর অনেক বছর পর্যন্ত এই বীর নারী থেকে গেছেন লোকচক্ষুর আড়ালে, সকলের অগোচরে। আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধার মতো তিনিও হয়তো হারিয়ে যেতেন কালের স্রোতে, কিন্তু ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের এক গবেষক বিমল কান্তি দে তারামন বিবিকে এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানকে সকলের সামনে তুলে ধরেন। এরপর নারী সংগঠনগুলো তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসে। এই সংগঠনগুলো ও বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তাঁর বীরত্বকাব্য প্রকাশিত হয়। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তত্কালীন সরকার এক অনাড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তাকে সম্মানিত করে। তারামন বিবি সেই শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন যারা চিরকালই অর্থ, সম্পদ, জমিন ও উপর্যুক্ত জীবিকা থেকে বঞ্চিত থেকেছেন, অথচ কাঁদিয়ে মাটির টানে ও হূদয়ের সততা থেকে দেশের জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে গেছেন পদে পদে। সবশেষ দেশবাসীকে শুধু পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। তারামন বিবি যেখানে থাকুক, ভালো থাকুক। সৃষ্টিকর্তা তাকে ভালো রাখুক।