হেরে যেও না বন্ধু

গত ১১ মাসে আত্মহত্যা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থী। শুধু ১২ থেকে ১৬ নভেম্বরের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ৩ শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও গত ৩ ডিসেম্বর আত্মহত্যা করেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী। বলা যায়, উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিক্ষার্থী ও তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা। কেন ঝড়ে যাচ্ছে এ প্রাণগুলো? কী হতে পারে এর প্রতিকার? কারণগুলো অনুসন্ধানের চেষ্টা নিয়ে রইল ‘প্রজন্ম’-এর এবারের আয়োজন। এটি সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও গ্রন্থনা করেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

আগের প্রজন্মের প্রায় সবার ছোটবেলা কেটেছে দারুণ পারিবারিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে। তখন ‘একান্নবর্তী পরিবার’ শব্দটারও খুব চল ছিল। বাবা-মা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, ফুফু—সবাই মিলে একসঙ্গে থাকা হতো একই বাড়িতে। বিকেল হলেই চাচাতো-ফুপাতো ভাইবোন ও পাশের বাড়ির ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে গল্প করা, মাঠে খেলতে যাওয়া, ছোটাছুটি, কানামাছি থেকে শুরু করে জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলার মধ্য দিয়ে সময় কাটত সবার। ঝড়ের পরে গাছের নিচে আম কুড়াতে যাওয়া, বাড়ির পুকুরে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই এখনো মনে দোলা দেয়। ছোটদের এই দলের কেউ পরীক্ষায় খারাপ করেছিল, মা বকছিলেন? হুট করে কেউ একজন রক্ষকের ভূমিকায় এসে যেতেন, ‘থাক না, ছোট মানুষ তো, পরেরবার ভালো করবে।’

সেই সময়টা পুরোপুরি বদলে গেছে। একদম স্কুলপড়ুয়া ছোটদেরও সারাক্ষণ সময় কাটানোর উপকরণ এখন স্মার্টফোনের গেম, ট্যাব ইত্যাদি। আর অল্প একটু বড় হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো যোগ হচ্ছেই। নেই মাঠে খেলতে যাওয়া বা সবাই মিলে গল্প করার অভ্যাস। শহরে খেলার মাঠ নেই, এই অজুহাতে সন্তানের হাতে বাবা-মায়েরা খুব অল্পবয়সে প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছেন, আর তা নিয়ে সারাক্ষণ মত্ত থেকে সন্তান অন্যের সঙ্গে মিশছে কি না, তার সামাজিকীকরণ হচ্ছে কি না—শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় সেই খবর নিতে ভুলে যাচ্ছেন বাবা-মাও। আর ব্যাগভর্তি বোঝার মতো বই নিয়ে পড়ার চাপ, কোচিং ক্লাস, প্রাইভেট টিউটরের কাছে ছোটাছুটি তো আছেই। ফলে বেড়ে ওঠার বয়সে হারিয়ে যাচ্ছে নির্মল বিনোদনের আনন্দ, সারাক্ষণ একা বসে থেকে সন্তানও হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক। খেলাধুলা করলে হার-জিতের মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়, এই শিক্ষাটাও জুটছে না তাদের ভাগ্যে। এই সন্তান যখন বড় হচ্ছে, তখন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লেই তার সঙ্গী হচ্ছে বিষণ্নতা।

এবার মূল আলোচনায় ফিরি। কথা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকা আত্মহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে। আত্মহত্যার প্রবণতা কেন বাড়ছে? এই প্রশ্ন করলে সমাজবিজ্ঞানীরাও পিছনের কারণ হিসেবে উপরের বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করছেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণেরা সারাক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোর ফলে বাস্তবজীবনের সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ে। কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে সে সমস্যা মোকাবিলায় সামাজিকমাধ্যমের সম্পর্ক খুব একটা কাজে দেয় না। তখন তারা একাকীত্ব বা ‘ফিলিং অব আইসোলেশন’-এ ভোগে। এটি তাদের বিষণ্নতার পথে ঠেলে দেয়। এরই চূড়ান্ত ধাপ আত্মহত্যা।

সম্প্রতি ভিকারুন্নিসার ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ তার বাবা-মাকে ডেকে তার সামনেই ভর্ত্সনা করেন। বলা হয়, মেয়েটিকে টিসি দেওয়া হবে। একে তো নিজের কারণে বাবা-মায়ের অপমান, তারপর টিসি; এ নিয়ে মাত্র পনেরো বছরের অরিত্রীর মনে নিশ্চয়ই ঝড় বইছিল, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। হয়তো সে ভাবছিল, এই স্কুল থেকে আমাকে বের করে দিলে অন্যকোথাও আমি পড়তে পারব না। কিংবা লোকজন আমার বাবা-মাকে কটু কথা বলবে। সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ‘স্ট্রেস’ বা চাপের উত্স হলো সমাজ। চারপাশের সমাজের কাছ থেকে অপমান সইবার যন্ত্রণা পেতে চায়নি মেয়েটি, আর তাকে তাত্ক্ষণিকভাবে মানসিক শক্তি জোগানোর জন্যও হয়তো কেউ ছিল না, ফলে অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে।

আরেকটু পিছনে ফিরে দেখা যাক। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭, প্রতিবছরই বেড়েছে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা। পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার কারণে বিভিন্ন বয়সী নারীদের আত্মহত্যার ঘটনা তো আছেই, নিয়মিত বিরতিতে পত্রিকার পাতায় ও গণমাধ্যমে বারবার প্রচারিত হয়েছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো। গত এগারো মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। এই শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই বিষণ্নতায় ভুগছিল। কারোর দুশ্চিন্তা ছিল আর্থিক অনটন নিয়ে। কেউ কেউ বিষণ্ন ছিল প্রেমে ব্যর্থতায়। আর স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে চাকরি না পেয়েও কেউ কেউ চরম হতাশাগ্রস্ত ছিলেন, ফলে ‘সমাধান’ হিসেবে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।

এরা কেউ নিশ্চয়ই ভাবেননি যে, হেরে যাওয়ার নাম জীবন নয়। জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসতে পারে, সেসবকে মোকাবিলা করতে হবে। অথবা তারা হয়তো মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, কিন্তু একটু শক্তি জোগানোর জন্য কাউকে পাশে পায়নি। আবার, কোনো ধর্মই তো আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভেবেও তাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তা ছাড়া প্রতিটি জীবনের সাথে আরও অনেকগুলো জীবন জড়িত থাকে। নিজেকে হত্যা করা মানে অন্যদের প্রতিও অবিচার করা, তাই এটি একধরনের অপরাধ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবারের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব—সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। কেউ বিষণ্নতায় ভুগলে তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া সবার কর্তব্য। 

সব কথার শেষ কথা হলো, আত্মবিশ্বাস নিয়ে যেকোনো সমস্যাকে মোকাবিলা করাই জীবন। আনন্দের পাশাপাশি দুঃখ, কষ্ট-হতাশা সবই থাকবে জীবনে, আর এ নিয়েই জীবন বৈচিত্র্যময়। আর এই জীবন বড্ড বেশি মূল্যবান।

                কি ছু  প রি স ং খ্যা ন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর এক মিলিয়ন মানুষ আত্মহত্যা করে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুযায়ী, দেশের সাড়ে ৪ ভাগ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ হতাশাজনিত কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ১ ভাগ শিশুও রয়েছে এই ঝুঁকিতে। অর্থাত্ প্রায় ৯০ লাখ মানুষ রয়েছে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে। এদের মূল সমস্যা—বিষণ্নতা। ঝুঁকিতে থাকা মানুষের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। কিশোরী ও তরুণীরা নানারকম মানসিক নির্যাতন, ইভ-টিজিং, সাইবার ক্রাইম, যৌতুক, স্বামীর সংসারে নির্যাতনের শিকার হওয়াসহ নানা কারণে আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া নিঃসঙ্গতা, প্রতিহিংসা, প্রতারণার শিকার হয়েও অনেক প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ও পুরুষ আত্মহত্যা করতে পারে। মানসিক রোগী, মাদকাসক্তরাও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। মাদকাসক্তদের ১০ ভাগ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশে আত্মহত্যা চেষ্টাকারীদের মধ্যে ৪১.২ ভাগ এই পথ বেছে নিতে চায় পারিবারিক সমস্যার কারণে, ১১.৮ ভাগ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে, ১.৮ ভাগের বৈবাহিক সমস্যা, ১১.৮ ভাগের প্রেমে ব্যর্থতা, পরকীয়া ১১.৮ ভাগ, নির্যাতন ৫.৯ ভাগ ও আর্থিক অনটনের সমস্যা ৫.৯ ভাগের।

প্রতিবছর দেশে গড়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরের মধ্যে ২০১৭ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে সারাদেশে ১১ হাজার ৯৫ জন আত্মহত্যা করেছে। ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৬০০ জন, ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৫০০ জন এবং ২০১৪ সালে ১০ হাজার ২০০ জন আত্মহত্যা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৪ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫-এর অধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। বেশকিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই ঘটনা ঘটছে।

 

আত্মহত্যা-প্রবণ কি না,

তা বোঝার উপায়

n আত্মহত্যা-প্রবণ ব্যক্তি আত্মহত্যার পরিকল্পনা করতে শুরু করার সময় বলতে পারে, ‘সবার থেকে দূরে চলে যাব’, ‘হারিয়ে যাব’। কিংবা অকারণে ক্ষমা চাইতে পারে। এটা বিষণ্নতারই বহিঃপ্রকাশ। 

n আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা বলতে পারে। হুট করে বিষয়টি হয়তো হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন বিষণ্নতায় ভোগা অনেক মানুষই চূড়ান্ত পর্যায়ে এরকম পরিকল্পনা করতে শুরু করে।

n আত্মহত্যার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করতে দেখা।

n স্বাভাবিক জীবনযাপনের ধরন হুট করে বদলে ফেলে ঘুম ও খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দিলে।

n আচার-আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে।

n নিজের চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে অসচেতন হয়ে উঠলে।

n আত্মবিশ্বাস নেই, অল্পতে বিরক্ত হয়, অধৈর্য হয়ে পড়ে, নিজের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে নানা কথা বলে ও অন্যদের সরিয়ে দেয়।

n মাদকদ্রব্যে আসক্তি থাকলে তা হুট করে আরও বেড়ে গেলে।

n অতিসম্প্রতি কোনো বড়ধরনের মানসিক ধকলে পড়েছে, যা সামলে উঠতে পারছে না, এ নিয়ে বারবার কথা বলে যাচ্ছে।

n অতীতে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে।

n পরিবারের কারোর আত্মহত্যার ইতিহাস থাকলে।

n বিষণ্নতা ছাড়াও অন্য যেকোনো মানসিক রোগ বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে।

উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর উপস্থিতি কারোর মধ্যে লক্ষ করলে সতর্ক হতে হবে। সচেতনতার সাথে তার মানসিক অবস্থা বুঝে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে তাকে আত্মহননের পথ থেকে ঠেকানো যায়।

 

যে   কা র ণে   বা ড় ছে   আ ত্ম হ ত্যা

অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

আত্মহত্যার প্রবণতা কেন বাড়ছে, এই প্রশ্ন করা হলে উত্তরে কয়েকটি কারণ বলতে হবে। অন্যতম কারণ হলো এখনকার তরুণদের মধ্যে জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যেকোনো বিষয়ে তারা দুশ্চিন্তায় ভুগছে, সহজে সমাধান করতে পারছে না। আমরা সাইকিয়াট্রিস্টরা একে বলি, ইন্যাবিলিটি টু কোপ উইথ স্ট্রেসফুল সিচুয়েশন। আমরা ছোটবেলায় বিভিন্ন খেলাধুলা করেছি। কখনো জিতেছি, কখনো হেরেছি। খেলায় হারার মাধ্যমে হারকে বরণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছি, যেটা জয়ের চেয়েও বড় শক্তি। ছোটবেলার খেলাধুলা থেকেই যেকোনো পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এই প্রজন্মের তরুণদের বেড়ে ওঠার ধরন বদলে গেছে, ফলে তারা এই বিষয়গুলো অর্জন করতে পারেনি। তাদের সহ্যসীমা বা ‘টলারেন্স লেভেল’-এর মাত্রাও কম। তারা সবসময় জিততে চায়। জিততে হবে—এই চাপটা পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকেও তৈরি হচ্ছে। ফলে তাদের কাঁধে বোঝা চাপছে। দেখা দিচ্ছে আত্মবিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয়ের ঘাটতি, যা থেকে তৈরি হচ্ছে বিষণ্নতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো তরুণ যখন ব্যর্থ হয়, তখন সে তীব্র মনদহনে ভুগতে থাকে। এই ব্যর্থতা হতে পারে চাকরি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অথবা প্রেমের ক্ষেত্রে। ব্যর্থতা সইতে না পারার বিষয়টিই তাদের আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।

রুদমিলা মাহবুব

প্রভাষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

লক্ষ্য করছি এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে চাপ নেওয়ার ক্ষমতা একেবারেই কমে যাচ্ছে। সবসময় সবকিছু প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না, এ বিষয়টিও তারা সহজে মেনে নিতে পারে না। এ ছাড়া তারা সারাক্ষণ স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকছে, সেখানে অন্য এক জগত্ তৈরি করে নেওয়ায় দূরত্ব বাড়ছে বাস্তব জগতের চারপাশের মানুষদের থেকে। এই কমিউনিকেশন গ্যাপের কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যা যেটা হচ্ছে, তা হলো, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতেই কোনোধরনের ক্রিটিসিজম সহ্য করতে পারছে না। কারণ স্বাভাবিক ইন্টারঅ্যাকশন হলে যেকোনো মতকে গ্রহণ করার যে সক্ষমতা তৈরি হয় বা মানসিক বিকাশ হয়, তা তাদের অনেকের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এমনকি, ফেসবুকের পোস্টে কতগুলো লাইক এলো, কে কী কমেন্ট করল, এ নিয়েও অনেক তরুণেরা অস্থিরতায় ভুগতে থাকে। কেউ কোনো ব্যাপারে দ্বিমত জানালে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। নিজেকে একটা গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলার ফলে আশপাশে নিজের সমস্যা খুলে বলা যায় এমন কেউ থাকে না। এরকম অবস্থায় অন্যের হাসিমুখ দেখেও তারা দুঃখ অনুভব করে, বিষণ্ন বোধ করে। নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ হতাশায় ভোগে। এই বিষণ্নতার মাত্রা যখন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে আত্মহত্যাকেই তারা সব সমস্যার ‘সলিউশন’ হিসেবে ধরে নেয়।

 

এ র   প্র তি কা র   কী

ডা. মেখলা সরকার

সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

 

বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের বেশিরভাগই আত্মকেন্দ্রিক ছিল। নিজের মধ্যে আবদ্ধ থাকা মানুষগুলো কোনো সমস্যায় পড়লে সহজে তা অন্যের সাথে শেয়ার করতে পারে না। সমস্যার সমাধান করতে না পেরে মানসিক চাপ ও অস্থিরতায় ভুগতে শুরু করে। কারোর ক্ষেত্রে এই চাপ একপর্যায়ে মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যায়, আর চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারা বুঝতে পারে না, জীবনে ঝড়-ঝাপটা বা নানাক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াই স্বাভাবিক। এটি দীর্ঘস্থায়ী না, কিংবা যিনি চাপে ভুগছেন তিনি পৃথিবীতে একা না, তার মতো আরও অনেকেই বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করে সফল হয়েছেন। এটুকু চিন্তা মাথায় রাখলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আমাদের হাত-পা কেটে গেলে আমরা চিকিত্সা নিই। তেমনি মানুষের মনও যখন নানা ভাবনায় জর্জরিত হয়, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়, কোনো সমস্যার সমাধান করতে না পেরে চাপবোধ করে, তখন মানসিক চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমরা মনকে বাহ্যিকভাবে দেখি না বলে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করি না। তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতা দেখা দিলে বন্ধুবান্ধবদের সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে গুণগত সময় দিতে হবে, মানসিক সক্ষমতা তৈরির শিক্ষা দিতে হবে, যেন বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে উঠতে পারে।

ড. ফারহানা জামান

সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখনো মানসিক রোগ বা রোগীর চিকিত্সার বিষয়টি সেভাবে প্রচলিত হয়নি। বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে যে কেউই ‘স্ট্রেসড’ হতে পারেন, মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। সেক্ষেত্রে অন্যদের দায়িত্ব হলো তা থেকে তাকে মুক্ত হওয়ার উপায় দেখানো। আমরা তা করি না, বরং ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ দেওয়ার প্রবণতা আছে আমাদের মধ্যে। এতে করে সমস্যায় ভোগা ব্যক্তি আরও বিষণ্ন হয়ে পড়েন।

কাউকে বিষণ্ন দেখলে বা কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ করলে এই পরিস্থিতির উত্তরণে পরিবারে, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের ভূমিকা রাখতে হবে। বোঝাতে হবে, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না।