কাছের ছোটভাই

বিষয়টা বিব্রতকর। খুবই বিব্রতকর। চেনে না জানে না, এমন একটা ছোটভাই এসে জুটেছে হিরুর ভাগ্যে। তাও আবার যেমন তেমন ছোটভাই নয়। একেবারে কাছের ছোটভাই যাকে বলে!

ব্যাপারটা মানুষেরই সমগোত্রীয় ভিনগ্রহের এলিয়েনের পৃথিবী থেকে ঘুরে যাওয়ার মতোই। তারা আছে। পৃথিবীতেও এসেছিল। শহর-নগরের আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে ঘুরেছে। তাদের চাকতির মতো যে স্পেসশিপটা রয়েছে, যেটাতে চড়ে তারা ঘুরে বেড়ায়, পৃথিবীর কেউ কেউ তা দেখেছেও। কিন্তু সেই ‘দেখাটা’ তাদের জন্য হয়ে গেছে উভয় সংকটের বিষয়। না পারছে প্রমাণ উত্থাপন করে অপরকে বিশ্বাস করাতে, না পারছে নিজের চোখকে অস্বীকার করতে!

হিরুরও তেমনই এক কাছের ছোটভাই রয়েছে। খবরটা অন্য সবাই জানে, তাকে দেখেছেও, কিন্তু যার কাছের ছোটভাই, তার কাছেই সে রয়ে গেছে রহস্যময় এক আগন্তুক হিসেবে। আর এ কারণে হিরুকে বেশ মুশকিলেই পড়তে হয়েছে। ব্যাপারটা তাহলে এ বেলায় খুলেই বলা যাক।

 

সেদিন দুপুরে হিরুর বাবা বাইর থেকে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাত্ পেছন থেকে একজন সালাম দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। দেখতে বেশ হ্যাংলা-পাতলা। বয়সে হিরুর থেকে চার-পাঁচ বছরের ছোট হবে।

‘তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না, বাবা...’, হিরুর বাবা ইতস্তত বললেন।

‘আজ্ঞে আঙ্কেল, আমি হিরু ভাইয়ের কাছের ছোটভাই।’

‘ওওও, আচ্ছা। তা কিছু বলবে?’

‘জি, হিরু ভাই নগদ টাকা চেয়েছেন।’

‘টাকা?’ হিরুর বাবা টাস্কিত। ‘কত টাকা?’

‘এই ধরেন, একহাজার হলে খুব ভালো হয়। পাঁচশ হলেও নিতে বলেছেন।’

ছেলেটি টাকা নিয়ে চলে গেলে হিরুর বাবা একবার পিছু ফিরে চাইলেন। ছেলেটিকে তিনি আগে কখনো দেখেননি। তাতে কী, টাকা নির্ভাবনায়ই দিয়েছেন তিনি। শত হলেও হিরুর কাছের ছোটভাই বলে কথা। কিন্তু ফিরে যেতে যেত ছেলেটিকে পকেট থেকে ম্যাচ আর সিগারেট বের করে জ্বলন্ত সিগারেটে টান দেওয়া আর ধোঁয়া ছাড়তে দেখে তিনি কিছুটা ইতস্তত ফিল করলেন।

বাসায় ফিরে দেখলেন, হিরু বিছানায় গাছের গুঁড়ির মতো সোজা হয়ে পড়ে আছে।

‘আজকাল কী সব ছেলেছোকরার সাথে মিশিস না!’ হিরুর ওপর চরম বিরক্তি প্রকাশ করলেন তিনি।

‘কতজনের সাথেই মিশতে হয়। কী হয়েছে তাই বলো?’

‘বলছি। তার আগে বল একহাজার টাকা দিয়ে কী করেছিস?’

হিরু একমুহূর্ত থমকে গেল। সকালবেলায় ও বাবার পকেট কেটে পাঁচশ টাকা নিয়েছিল। হিসাব মেলাতে পারল না, পাঁচশ কী করে একহাজার হয়ে গেল? বাবা কি বাড়িয়ে বলছে? নাকি সকালে ওর মতো আরো একজন পাপী ছিল। একই অ্যামাউন্টে সেও বাবার পকেট কেটেছিল? সে বেচারা বাবার পকেট মারিং করলেও এখন ফেঁসে যাচ্ছে হিরু।

হিরু বলল, ‘টাকাটা নিয়ে সকালে বাজারে গিয়েছিলাম। লেটুস পাতা আনতে। কিন্তু পেলাম না।’

‘ইয়ার্কি হচ্ছে!’ হিরুর বাবা প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন। ‘মাত্র টাকা নিলি। বাজারে গেলি কখন?’

হিরু অবাক হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল।

বাবা হঠাত্ কিছু মনে পড়েছে এমন ভাব করে ফের বললেন, ‘কী অবস্থা হয়েছে দেখো, সকালের হাতসাফাইটাও তাহলে তুই-ই করেছিলি, তাই না?’

‘বাবা তাহলে ওটার কথা জানতে চায়নি!’, হিরু স্বগতোক্তি করল।

ওর বাবা ফের বললেন, ‘সকালে নিলি একদফা। এখন আবার লোক পাঠিয়ে আরেকদফা!’

‘লোক? আমি আবার কাকে পাঠালাম?’

‘কাকে! তোর কাছের ছোটভাইকে। আস্ত একটা বিড়িখোর!’ উষ্মা প্রকাশ করলেন তিনি।

‘আমার কাছের ছোটভাই? কার কথা বলছ, বলো তো বাবা।’

‘একজন মানুষের কাছের ছোটভাই কয়জন থাকে? তোর কাছের ছোটভাই, বিড়ি খায়—এমন কয়জন আছে?’

হিরু জবাব না দিয়ে চুপ করে আছে। হিসাব মেলাতে পারছে না ও। কাছের ছোটভাই যতজনই থাকুক না কেন, কাউকে তো আজ ও ওর বাবার থেকে টাকা নেওয়ার জন্য পাঠায়নি।

‘কাছের ছোটভাইকে পাঠিয়েছিস বলে তোর সম্মানে তখন টাকাটা দিয়েছিলাম। নচেত্ তুই হলে ফিরিয়েই দিতাম। বেঁচে গেছিস।’ বাবা গর্জাতে গর্জাতে চলে গেলেন।

 

পরের ঘটনা সেদিন বিকেলেই ঘটল। হিরুর ছোটকুর বেয়াইন কাম হিরুর পাণিপ্রার্থী মৌ এল এক বস্তা অভিযোগ নিয়ে। সেই কবে থেকে হিরুর পেছনে সে হ্যাং হয়ে আছে, কতশতবার রিস্টার্ট মারা সত্ত্বেও ঠিক হচ্ছে না। সে গোল্লায় যাক। তার আবেগকে ভিত্তি করে হিরু যে এখন ঠগবাজি শুরু করে দিয়েছে!

হিরুর মা বললেন, ‘কী হয়েছে, খুলো  বলো তো...।’ সম্পর্কে বেয়াইন হয়, আবার হিরুকে বিয়ে করতে চায়, এমন মেয়েকে তিনি কোনো সম্বোধন করতে পারলেন না।

‘আর বলবেন না, হিরু আজ একটু আগে আমার কাছে তার এক কাছের ছোটভাইকে পাঠিয়েছিল।’

‘কাছের ছোটভাই!’

‘তাহলে আর বলছি কী! একটু আগে বাঁশের মতো চিকনা একটা ছেলে গিয়ে বলল, সে হিরুর কাছের ছোটভাই। হিরু তাকে পাঠিয়েছে, এক হাজার টাকার জন্য। আমি তো খুশিতে গদগদ। ডাবল দিয়ে দিলাম। ওমা, ছেলেটা টাকাটা পকেটস্থ করতে করতে বলে কিনা, ‘হিরু ভাইয়ের প্রতি আপনার এই ভালোবাসা আমার দিকে কনভার্ট করলেও তো পারেন!’ ভাবতে পারেন—সরাসরি প্রেমের অফার! এর সবই যে হিরুর ষড়যন্ত্র, তা বুঝতে আর আমার বাকি রইল না। ও চেয়েছিল, জনে জনে বলে বেড়াবে, ‘মৌ আমার কাছের ছোটভাইয়ের সাথে প্রেম করে!’ চিন্তা করে দেখুন, আমাকে ওর পেছন থেকে সরানোর জন্য ওর ওই কাছের ছোটভাইটাকে দিয়ে কত্তবড় ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়েছে!’

সবটা শোনার পরে মা ক্ষেপে গেলেন, ‘হিরুটা আজ আসুক বাসায়। চাবকে যদি পিঠের ছাল না তুলছি!’

 

গঞ্জের একটা দোকান থেকে হিরু বাকিতে বাসার জন্য যাবতীয় প্রসাধনী কিনে। মাস শেষে টাকা দেয়। আজ সেই দোকানির সঙ্গে পথে দেখা হলে সে সহাস্যে বলল, ‘কী হিরু সাহেব, চুপিচুপি বিয়েটা সেরে ফেললে!’

হিরুর মুখে কোনো রা নেই।

দোকানি ফের বলল, ‘তোমার এলাকার, আইমিন ওই কাছের ছোটভাইটি আমাকে সবকিছুই খুলে বলেছে!’      

‘কী! কী বলেছে?’ হিরুর মুখ দিয়ে কোনো বের হতে চাইল না।

দোকানদারের মুখের হাসি আরো উজ্জ্বল হলো। ‘কী প্যাঁচে পড়েই না বিয়েটা করতে হয়েছে তোমাকে! বিয়ের পরে আজকাল বাসা থেকেও কদাচিত্ বের হচ্ছো। তাই তো বউয়ের জন্য যাবতীয় কিছু নিজে না এসে ওই কাছের ছোটভাইটাকে দিয়ে নেওয়াচ্ছ। জানো—বিয়ের পরে এ মাসে তোমার গত তিনমাসের সমান কেনাকাটা হয়ে গেছে। বাকি সময় তো পড়েই আছে, কী যে করবে তখন... হা হা। আচ্ছা, আমি এখন যাই। তুমি সময় করে দোকানে এস একদিন। নিজের বিয়ের মিষ্টি তো খাওয়াবা না মিয়া। আমার থেকে খেয়ে যেও!’

দোকানদার চলে যাওয়ার পরেও বহুক্ষণ কেটে গেছে, হিরু এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ভেবে কূল পাচ্ছে না—তার এই কাছের ছোটভাইটা কে? সে কি তাকে চেনে? কেউ কি তার সাথে মজা নিচ্ছে, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে ফাঁসাতে চাইছে!

হিরুর গলা শুকিয়ে গেছে। এই মুহূর্তে চাকলাদারের দোকানে গিয়ে চা দিয়ে গলা ভেজাতে চাইছে ও।

 

সেখানে ওর চ্যালারা বসা। কিন্তু হিরুকে দেখে সবাই মুখ ফিরিয়ে নিল। ‘ঘটনা কী?’ হিরু মনে মনে বলল। ‘কাছের ছোটভাইটি কি ওদের সাথেও কোনো কাহিনি করেছে? তার মানে কালপ্রিট ওদের মধ্যকার কেউ নয়।’

তোতা চাকলাদারকে ও হাঁক ছেড়ে বলল, ‘চা দাও। ওদেরকেও দাও।’

‘আমরা তোমার চা খাব না। সব চা তোমার ওই কাছের ছোট ভাইটাকে খাওয়াও।’

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘তোরাও আমার কাছের ছোটভাই।’

‘তাই?’ একটু খুশি হলো যেন ওরা। ‘তাহলে এসো আমরা তোমার সাথে ছবি তুলব। একজন একজন করে।’

‘আয়।’

প্রথমে একজন হিরুর সাথে ছবি তুলল। হিরু সোজা হয়ে বসে মুখে যথাসম্ভব গাম্ভীর্য এনে পোচ দিল। ছবি তোলা হলে, হিরুর ছবি তোলার সঙ্গীটি ছবিটাকে তার মোবাইলের একটা ছবির সাথে মেলাল।

‘কী দেখছিস?’ হিরু জানতে চাইল।

‘দেখছি, আমরা তোমার কতটা কাছের ছোটভাই হতে পারলাম।’ একজন মুখ বাঁকিয়ে বলল।

‘আরে, এসব কী বলছিস!’ হিরু কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। ‘অন্যরাও আয়। আজ তোদের সবার সাথে ছবি তুলব।’

‘থাক, অনেক হয়েছে, আর ছবি তোলা লাগব না।’ গোস্বা করে বলল আরেকজন।

গটগট করে চলে গেল ওরা।

তোতা চাকলাদার এতক্ষণ ধরে বসে বসে ওদের কাণ্ডকীর্তি দেখছিল। সে এবার হিরুকে বলল, ‘কিছু বুঝলে?’

‘না। কানের পাশ দিয়ে তো দূরের কথা, সবকিছু একশ হাত দূর দিয়ে গেল।’

‘সবাই তোমার ওই কাছের ছোটভাইটির মতো করে তোমার সাথে ছবি তুলতে চাইছে। কিন্তু তুমি আজ সেরকম পোচ দিচ্ছ না। তাই ওরা সবাই ক্ষেপে গেছে। ওরা বুঝতে পেরেছে, তোমার কাছের ছোটভাই কেবল ওই একজনই!’

চাকলাদারের কথায় হিরু কিছুটা আঁচ করতে পারল। ওর সেই কাছের ছোটভাইটাকে তাহলে ও চেনে। তার সঙ্গে ও ছবিও তুলেছে। কিন্তু কখন? অনেকের সঙ্গেই তো ছবি তোলে। কোন ছবিটার কথা বলছে এরা?

হিরু চাকলাদারকে বলল, ‘আসলে পোচটার কথা না একদমই ভুলে গেছি। সেদিন হঠাত্ করেই হয়ে গেছিল। ছবিটা তোমার কাছে আছে না? একটিবার দেখাও তো।’

চাকলাদার তার ফোন থেকে ফেসবুকে ঢুকল। তারপর একজনের ওয়ালে গিয়ে একটা ছবি খুঁজে বের করল। মোবাইলটা হিরুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এই যে, এই পোচটা।’

ছবিটা দেখে হিরু চমকে গেল। মনে হলো, ওর মাথায় বুঝি ঠাডা পড়েছে!

চিকনা-চাকনা একটা ছেলের কাঁধে এক হাত দিয়ে হিরু নিজেই অন্য হাতে তুলেছে ছবিটা, সেলফি যাকে বলে। ছেলেটি আবার একহাতে হিরুকে ধরে অন্য হাতের দুই আঙুল দিয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে অদ্ভুত ইয়ো ইয়ো লুক দিয়েছে!

ক্যাপশনে লেখা, ‘হিরু ভাইয়ের সেলফিতে তার আদি ও অদ্বিতীয় কাছের ছোটভাই এই অধম আমি!’

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)