মো. নিজাম উদ্দিন লাভলু, রামগড়
সপ্তদশ শতকের শেষভাগে চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় দেখা দেয় লুসাই বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ দমনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন মাত্র ৪৮৬ জন সৈন্যের সমন্বয়ে গঠন করে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটেলিয়ন’ নামে একটি সশস্ত্র বাহিনী। ৬ পাউন্ড গোলার ৪টি কামান, দুটি অনিয়মিত অশ্বারোহী দল আর উপযোগী যানবাহন ছিল এ বাহিনীর সম্বল। ২২৪ বছর আগের সেই রামগড় লোকাল ব্যাটেলিয়ন থেকেই আজকের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি। বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী এ বাহিনীর শেকড় ঐতিহ্যবাহী রামগড়েই গ্রোথিত।
রামগড় উপজেলা পরিষদ সংলগ্নে অপরূপা প্রকৃতির মাঝে বিজিবির দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ২০০৫ সালে তত্কালীন ৩৩ রাইফেল ব্যাটেলিয়নের উদ্যোগে এটি স্থাপন করা হয়। বৃহদাকারের স্মৃতিস্তম্ভটির প্ল্যাটফর্ম সাজানো হয়েছে বিজিবির বিভিন্ন প্রতীকী অংশ দিয়ে। বিশাল দেয়ালে শ্বেত পাথরে বাহিনীর সুদীর্ঘকালের গৌরবোজ্জ্বল সংক্ষিপ্ত জন্ম ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। এছাড়াও বাহিনীটির বিবর্তনের পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি ৮টি অবয়ব বা মুর্যাল রয়েছে। প্ল্যাটফর্মে স্থাপন করা হয়েছে ৪টি পিলার, যা সীমান্ত পিলারের প্রতীকরূপ। পিলারের গায়ে ধাতব অক্ষরে খচিত রয়েছে বাহিনীটির জন্মস্থান হিসেবে ‘রামগড়’ ও জন্ম সাল ১৭৯৫। বেদির ওপর সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি সৈনিকের ব্যক্তিগত অস্ত্র বা রাইফেলের প্রতীক হিসেবে একটি দীর্ঘ ধাতব স্তম্ভ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন সমতল জেলা থেকে আগত পর্যটকরা দৃষ্টিনন্দন এ বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ ঘুরে দেখেন আর জেনে নেন বাহিনীটির গৌরবময় জন্ম ইতিহাস।
এর আগে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে বিডিআরের তত্কালীন খাগড়াছড়ির সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল মো. ওয়ালী উল্লাহ ও রামগড়ের ১৬ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. মোসাদ্দেক হোসেনের উদ্যোগে ‘স্বার্থক এ জন্ম’ নামে সর্বপ্রথম রামগড়ে স্থাপন করা হয় বিডিআরের জন্ম স্মৃতিস্তম্ভ। বাহিনীটির ২শ’ বছর পূর্তিতে ছোট আকারের এ স্মৃতিস্তম্ভটি স্থাপন করা হয়েছিল।
১৭৯৫ সালে রামগড় লোকাল ব্যাটেলিয়ন নামে বাহিনীটির গোড়াপত্তন হওয়ার পর কালের বিবর্তনে পরিবর্তন হয় বাহিনীটির নামও। পরিবর্তন হয় অস্ত্র-শস্ত্রের, পোশাকের। জনবল, শক্তি সামর্থ্যও বৃদ্ধি পায় সময়ের প্রয়োজনে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) নাম বদল করে বাহিনীটির নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর। সর্বশেষ ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিডিআর নাম পরিবর্তন করে এ বাহিনীর নামকরণ হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি।
চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দিলে রামগড়কে রক্ষার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৫ সালে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটেলিয়ন’ গঠন করার পর ১৮৬০ সাল পর্যন্ত এ নামেই বাহিনিটির কার্যক্রম চলে। ১৮৬১ সালে পূর্বাঞ্চলে নিয়মিত, অনিয়মিত পুলিশবাহিনী পুনর্গঠিত করে রামগড় লোকাল ব্যাটেলিয়নের নামকরণ করা হয় ফ্রন্টিয়ার গার্ডস। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে ১৪৫৪ জনে উন্নীত করা হয়। সেসময় এ পার্বত্য এলাকায় লুসাই বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করলে ১৮৭১ সালে সৈন্য সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করে এ বিদ্রোহ দমন করে বাহিনীটি। ১৮৯১ সালে বাহিনীর নতুন নামকরণ হয় বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ ব্যাটেলিয়ন। প্রচলিত অস্ত্র ছিল ব্রিচ লোডার রাইফেল। ব্যাটেলিয়নকে ৪টি কোম্পানিতে ভাগ করে ইউরোপিয় সুবেদারদের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ১৯২০ সালে বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুনঃনামকরণ হয় বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ন অব ইস্টার্ণ ফ্যন্টিয়ার রাইফেলস। ১৬টি প্লাটুনে বিভক্ত করে প্লাটুনগুলোকে সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ইস্টার্ণ ফ্যন্টিয়ার রাইফেলসকে নতুন নাম দেওয়া হয় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ ইপিআর নাম পরিবর্তন করে বাহিনীটির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ রাইফেলস।