জয়িতাদের সাফল্যের গল্প

 

কুমিল্লা মুরাদনগর উপজেলার

সংগ্রামী চার জয়িতার সফল হওয়ার  পেছনে রয়েছে অনেক দুঃখকষ্টের কাহিনি। কেউ অর্থনীতিতে, শিক্ষা ও চাকরি, জননী নারী, নির্যাতন ও সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিজেকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন। উপজেলায় নির্বাচিত

চার জয়িতার মধ্যে একজন

জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে ১০ জনের মধ্যে একজন হয়েছেন। জানাচ্ছেন—

মোশাররফ হোসেন মনির

শিমুলী আক্তার

শি ক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের উড়িশ্বর গ্রামের মৃত কামরুজ্জামানের স্ত্রী শিমুলী আক্তার। শিমুলী আক্তার জানান, একটি মধ্যবৃত্ত পরিবারে জন্ম আমার। ছয় ভাইয়ের একমাত্র বোন আমি। বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই পরিবারের কারণে আমি বাল্যবিবাহে আবদ্ধ হই। আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হব ইচ্ছা থাকলেও স্বামী বেকার হওয়ায় স্বামী লেখাপড়া শিখাননি। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সময় স্বামী, ভাই ও বাবার কাছে টাকা চাইলে তারা বলের বিয়ে হয়ে গেছে আর লেখাপড়া করতে হবে না। নিরুপায় হয়ে একটি এনজিওর স্কুলে শিক্ষকতা ও প্রাইভেট পড়াতে শুরু করি। আর সেই উপার্জনের টাকা দিয়ে এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি ও মাস্টার্স পাশ করি। এনজিওতে শিক্ষকতা আর প্রাইভেটের টাকা দিয়ে আমার লেখাপড়া ও সংসার চালাতে হতো। পরে পুষ্টি প্রোগ্রামে চাকরি নেই।

 

০০০

আনোয়ারা বেগম

স ফল জননী নারী উপজেলার ধামঘর ইউনিয়নের ভুবনঘর গ্রামের মৃত আব্দুল আউয়াল সরকারের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, অষ্টম শ্রেণি পাশ করার পরই মা-বাবা আমাকে বিয়ে দেয়। এক ছেলে ও দুই মেয়ে জন্মের পর স্বামীর মৃত্যু হয়। স্বামীর ভিটেমাটি ছাড়া সংসার চালানোর মতো কিছুই না থাকায় সংসার চালানো ও সন্তানদের লেখাপড়া করানো নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। স্বামীর মৃত্যুর পর দরিদ্রতার মধ্যে জীবনযাপন সত্ত্বেও আমার মনোবল কখনো ভাঙেনি। দারিদ্র্য আর লোকজনের নানান কথাকে উপেক্ষা করে লড়াই করা শুরু করি। হাঁস-মুরগি, ছাগল পালন, কাঁথা সেলাই ও ছোটো ছোটো বাচ্চাকে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করি। শত প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে আমি আমার সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।

 

০০০

ববিতা বেগম

নি র্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে কাজ করছেন উপজেলার বাঙ্গরা পূর্ব ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার মেয়ে ববিতা আক্তার। সে বিভাগীয় পর্যায়েও ১০ জনের মধ্যে একজন হয়েছে। স্বপ্না আক্তার জানান, অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় মা-বাবা আমাকে বিয়ে দেয়। বিয়ের পর জানতে পারি স্বামী নিজ গ্রামের এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম ছিল এবং বিয়ের পরও সম্পর্ক অব্যাহত ছিল তার। আর সেই সম্পর্কের কারণে আমাকে সব সময় মারধর করত। সন্তান জন্মের পর সেই নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। নির্যাতন সইতে না পেরে তিন মাসের সন্তানকে নিয়ে আমি বাবার বাড়িতে চলে আসি। তারপর স্বামী আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সন্তানটিকে নিয়ে যায়। পরে এনজিওতে চাকরি নেই।  প্রায় দুই বছর পর মা-বাবা জোর করে আমাকে গ্রামের এক ছেলের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে দেয়। বিয়ের পর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখি যে আমাকে স্বাবলম্বী হতে হবে।

 

০০০

খোরশেদা আক্তার

অ র্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের মোচাগড়া গ্রামের ফুল মিয়ার স্ত্রী খোরশেদা বেগম। খোরশেদা জানান, বাবা বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয়। দুই সন্তানসহ চার জনের সংসার চালাতে খুব হিমশিম পেতে হতো। এমনকি না খেয়ে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন। সংসার চালাতে পরে একটি এনজিওতে চাকরি নেই। অল্প বেতনে সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারতাম না। তখনই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীকে বিদেশ পাঠাই। আমার ও স্বামীর উপার্জনের টাকা দিয়ে একটি পুকুর ক্রয় করি। পরে চাকরি ছেড়ে মত্স্য চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই পুকুরে মাছ চাষ শুরু করি। পাশাপাশি এলাকার দুস্থ লোকদের প্রশিক্ষণ দেই। এতে করেই আস্তে আস্তে আমার অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। বর্তমানে আমার তিনটি পুকুর রয়েছে। এখন আমার মাসিক আয় ২০/২৫ হাজার টাকা। সংসারে আর কোনো প্রকার সমস্যা নেই।