নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

একধাপ এগিয়ে যাওয়া

  মানবেন্দ্র চক্রবর্ত্তী

 

রাহেলা রহমত উল্লাহ। গ্রামের মেয়ে। গ্রামেই তার বেড়ে ওঠা। গ্রামের  দুরন্ত সেই শিশুটি এখন ইউএনও। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত্ কথাটা যেন চিরন্তন সত্য। আর তাই সরকারের একটি অংশ হিসেবে দায়িত্বশীল পদে আসীন। শুধু তা-ই নয়, দায়িত্ব পালনে দক্ষতার পরিচয়ও দিয়েছেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে তার অফিসে যেতে সবারই দরজা খোলা। অফিসে ঢুকতেই চোখে পড়বে ‘আমি এবং আমার অফিস দুর্নীতি মুক্ত’— ইউএনও রাহেলা রহমত উল্লাহ। গ্রামের সাধারণ মানুষের কথা মন খুলে শুনুন। এরপর আইনে যেটা হয় সেটাই করেন। এতেই বেজায় খুশি গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ। ফলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বেজায় রাগ তার প্রতি। নারী হলেও ঠিক আর দশজন সরকারি কর্মচারীর মতোই উপজেলাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।  চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার বড়কুল গ্রামে জন্ম। পিতা রহমত উল্লাহ জিন্নাহ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত ছিল। মাতা নুরুন নাহার একই বিভাগে কর্মরত। পিতা-মাতার  দ্বিতীয় সন্তান। ভালো ছাত্রী হওয়ার কারণে মা-বাবার স্বপ্ন— রাহেলা বড়ো হয়ে বড়ো কিছু হবে, এটাই ছিল তাদের  প্রত্যাশা। সেই বড়ো হওয়ার একটা স্বপ্ন নিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। অদম্য ইচ্ছশক্তি ও নিজের প্রতি প্রবল আত্মবিশ্বাস যে কোনো মানুষকে সফলতা এনে দিতে পারে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা যিনি প্রতিটি মুহূর্তে লালন করেন এবং এর জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করেন— তিনি একদিন না একদিন সফল হবেনই। সেই ব্রত নিয়েই অজোপাড়া গাঁয়ের বড়কুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে বড়কুল নিম্ন মাধ্যমিক  বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন। এরপর বাবা নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করান হাজীগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে।  সেখান থেকে এসএসসি ১৯৯৮ সালে ছয় বিষয়ে লেটার মার্কসহ বিজ্ঞান বিভাগে স্টার মার্ক অর্জন করেন। হাজীগঞ্জের মডেল কলেজ থেকে ২০০০ সালে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে উর্ত্তীণ। এরপর সমাজকল্যাণ বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ২০০৮ সালে মাস্টার্স শেষ করে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড মডেল কলেজে প্রভাষক হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেন। প্রভাষকের চাকরি ছেড়ে এ বছরের শেষে দিকেই সোনালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সিলেট বিভাগে যোগদান করেন। থেমে থাকেননি এই অদম্য নারী। যেটা ছিল মা-বাবার  চাওয়া পাওয়া— তাই করেছেন মেয়ে রাহেলা রহমত উল্লাহ।

 ২০১৩ সালে  হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত এবং মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিগবাড়ী উপজেলা কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ২০১৫-১৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা লালবাগ সার্কেলে কর্মরত ছিলেন। ২০১৬ এর জুন থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সহকারী পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ঢাকাতে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত শরিয়তপুরের জাজিরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে সিংগাইর উপজেলার সুযোগ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এখানে যোগদান করেই সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ স্থাপনা, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, মাদক, অবৈধ ইটভাটা, বাল্যবিবাহ, খাবারে ভেজালসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দোষীদের আইনের আওতায় আনাসহ সরকারের প্রতিটি দায়িত্ব পালনে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

 দুই কন্যা সন্তানের জননী রাহেলা রহমত উল্লাহ বলেন, যেহেতু ইউনিয়নপর্যায়ে আমার বেড়ে ওঠা, তাই আমার আজকের এ অবস্থানের জন্য আমার মায়ের স্বপ্ন বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তিনি সবসময় বলতেন, মেয়েদের নিজ পায়ে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই পারে মেয়েদের সব নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিতে। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার পর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আমার মা চিন্তিত হয়ে পড়েন আমার ক্যারিয়ার নিয়ে। বিয়ের পর ক্যারিয়ারের সফলতা নির্ভর করে স্বামীর মন-মানসিকতার ওপর। আমার স্বামীর সহযোগিতা এবং অনুপ্রেরণা না পেলে কখনোই আজকের অবস্থানে আসা সম্ভব হতো না। আমার মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর আমার স্বামী সামছুল আলম সুমন আমাকে প্রথম শ্রেণির চাকরি ব্যতীত কোনো চাকরিতে আবেদন করতে দেননি। অধিকাংশ পরীক্ষার আগে তিনি আমাকে উত্সাহ এবং পরামর্শ দিতেন। খুব বেশি চাকরির পরীক্ষা আমাকে দিতে হয়নি। যে কয়টা পরীক্ষা দিয়েছি প্রায় সবগুলো চাকরিতেই নিয়োগ পেয়েছি। মেধা এবং পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। একে অপরের পরিপূরক, শুধু মেধা দিয়ে পরিশ্রম ছাড়া যেমন সফলতা পাওয়া যায় না, তেমনি শুধু পরিশ্রম করে মেধা না থাকলেও সফলতা আসে না। নিজের মেধা, সততা, পরিশ্রম দিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে চাই।