মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার খবর দ্রুত জানাবে যে ডিভাইস

>> জসিম উদ্দিন

 

ঢাকা শহরে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের পরিমাণ। সেই সঙ্গে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনাও। তবে দুর্ঘটনা হলে আশপাশের বেশিরভাগ মানুষই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছবি কিংবা ভিডিও ধারণে। মানুষের ভিড় আর তাদের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় হাসপাতালে খবর দেওয়ার মতো প্রধান কাজটাই করা হয়ে ওঠে না মাঝেমধ্যে। রাজধানীর সড়কের এই নিয়মিত দুর্ঘটনা নাড়া দেয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ৮ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী রিদোয়ান শিহাব, সাদিয়া আনিকা মুমু, মেখলা মরিয়ম মেরি, সোহাগ রানা ও ফাহিম সিয়ামকে। দুর্ঘটনা পরবর্তী এই অবস্থা সামাল দিতে তারা বানিয়ে ফেলেন একটি সেন্সর, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই নিকটস্থ হাসপাতাল, পুলিশ এমনকি পরিবারের কাছে দুর্ঘটনার খবর আর স্থান জানিয়ে বার্তা পাঠাতে সক্ষম। তাদের এই প্রজেক্টে সুপারভাইজার হিসেবে ছিলেন তাদের শিক্ষক ড. মো. মোতাহারুল ইসলাম।

কিছুদিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ব্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। এই ঘটনা থেকেই তাদের এই অ্যাপ তৈরির ভাবনা শুরু। বিশেষ করে কোনো দুর্ঘটনার ঘটে যাওয়ার পরে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়টা কমানো নিয়ে কাজ শুরু করেন তারা। শিহাব বলেন, ‘সম্প্রতি মোটরসাইকেল বেড়ে যাওয়ার ফলে সারাদেশে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। দুর্ঘটনার পর সবাই আহত ব্যক্তির ছবি তুলে কিংবা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেই ব্যস্ত থাকে। কেউ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে না। তখন চিন্তা করলাম, এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করতে, যা দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন ও পরিবারের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে পারবে।’

শিহাব আরো জানান, যখন কোনো মোটরসাইকেল রাস্তায় চলে, তার একটি ভাইব্রেশন সেন্সর থাকে। যখন দুর্ঘটনা ঘটে, তখন তার ভাইব্রেশন সেন্সর বেড়ে যায়। আমাদের তৈরি এই ডিভাইসটি আকারে ছোট। সেজন্য তাকে মোটরসাইকেলের যেকোনো জায়গায় স্থাপন করা যায়। জায়রোস্কোপ ও ভাইব্রেশন সেন্সরের মাধ্যমে এটি বোঝতে পারবে কোনো দুর্ঘটনা হয়েছে কি না। এরপর জিপিএস সেন্সরের মাধ্যমে এ খবর পৌঁছে যাবে নিকটবর্তী হাসপাতাল বা পুলিশ স্টেশনে। বার্তার সঙ্গে একটি লিঙ্ক থাকে। যেখানে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ যোগ করা থাকে। যাতে দেখা যাবে ঠিক কোন স্থানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

বার্তা পাঠাতে ভুল হবে কি না জানতে চাইলে শিহাব বলেন, ‘ডিভাইসটি বার্তা পাঠাতে ৫ সেকেন্ড সময় নেয়। তার মধ্যে যদি ভুল হয়, ইচ্ছাকৃতভাবে হলে ডিভাইসে ক্যানসেল করার জন্য বাটন থাকে।’

পুরো প্রজেক্টের কাজ করার সময় শিহাব ও তার দল তিন ভাগে কাজ করেন, রিসার্চ, কোডিং ও ডিজাইন। প্রজেক্টের রিসার্চ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাদিয়া আনিকা মুমু বলেন, ‘যেকোনো প্রজেক্টে কাজ করতে হলে রিসার্চের বিকল্প নেই। কাজ করার আগে আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, জার্নাল খুঁজে দেখি। তখন আমরা আর এমন প্রজেক্ট খুঁজে পাইনি। আর তখনই আমরা এই কাজ করতে আগ্রহী হই।’

পুরো সিস্টেমটি কিভাবে দাঁড় করিয়েছেন জানতে চাইলে প্রজেক্টের ডিজাইনার মেখলা মরিয়ম মেরি বলেন, ‘একেক ডিভাইস বিভিন্ন ভোল্টেজে একেক রকমের ডিজিট সাপোর্ট করে। আমাদের ডিভাইসটির ডিজিট হলো ৮০৮। অর্থাত্ কোনো স্থানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা হলে ৮০৮ নাম্বর থেকে বার্তা যাবে নিকটতম হাসপাতাল বা পুলিশ স্টেশনে।’

ডিভাইসটি তৈরির সময় বাজেটের পুরোটাই এসেছে নিজেদের টিউশনি ও পরিবার থেকে। এক্ষেত্রে পরিবার থেকে অনেক সাপোর্ট পেয়েছেন বলে জানান তারা। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনিয়র বড়ো ভাইদের কাছ থেকেও পেয়েছেন অনেক সহায়তা। ভবিষ্যতে ডিভাইসটিতে আরো সেন্সর যোগ করে আপডেট করতে চান রিদোয়ান ও তার দল। আগামী দিনগুলোতে এই ডিভাইস ভিত্তিক একটি অ্যাপ বানাতে চান বলেও জানান তারা। যার খরচটাও রাখতে চান সাধ্যের মধ্যে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সবাইকে এমন সৃজনশীল কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা। তাদের মতে, সকলের উচিত মানুষের এমন সৃজনশীল কাজকে সাপোর্ট করা ও উত্সাহিত করা।