রাজা প্রাণনাথের রাজ্যে যখন পৌঁছেছি রাত তখন আটটা। রাস্তার দোকানে চায়ের কাপে ধুম আড্ডা চলছে। একটু সামনে যেতেই শহরের পুরনো অংশ, যেখানে ক্রেতা সাধারণের মধ্যে নারীদের বেশি চোখে পড়ছে। নারীরা মহাসমারোহে বাজারপাতি করছেন। দূরপাল্লার বড় বাস ছাড়া ছোট বাস তেমন চোখে পড়ছে না রাস্তায়। চলাচলের বাহন ভ্যান ও অটো। কোনো কোনো ভ্যানের ওপর ম্যাট বিছানো আছে। শহরের যেখান থেকেই ভ্যানে চড়া যায় ভাড়া দশ টাকা, শেয়ারে ভ্যানে চড়লে লাগবে পাঁচ টাকা। শহরের সে কী শান-শওকত। জানা গেল, এই শান-শওকতের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত একটি নাম—জমিদার প্রাণনাথ রায়। সারা শহরে ছড়ানো ছিটানো আছে তার স্মৃতিচিহ্ন। অতি আদরের ও ভালোবাসার প্রাণনাথকে শহরবাসী আদর করে ডাকেন পিএন। যার নামে পিএন খাল, পিএন হাইস্কুল আর বাংলাদেশের প্রথম মিউনিসিপ্যালিটির ল্যাম্পপোস্ট এখনো জানান দেয় রাজা প্রাণনাথের নাম। জানা যায়, জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী ও তার পরে তার পুত্র রায় চৌধুরী ছিলেন সাতক্ষীরার জমিদার। নদীয়ার প্রসিদ্ধ জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায় বাহাত্তর বছর বা তেহাত্তর বছর বয়সে ১৭৮২ সালে মতান্তরে ১৭৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার অধিকৃত জমিদারি পরগনাগুলো নিলামে উঠলে তারই কর্মচারী বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী পরগনা বা এখনকার সাতক্ষীরা কিনে নেন। ১৭৯৭ সালে তিনি সাতঘরিয়া বা সাতক্ষীরা এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ?রায়চৌধুরী উপাধি ধারণ করেন। জমিদার প্রাণনাথ সাতক্ষীরায় নানা জনহিতকর কাজের জনক। এর মধ্যে প্রাণ সায়ের খাল ও দিঘি খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন, বৃক্ষরোপন কাজে আছে তার বিশেষ অবদান। গাছ রোপনে প্রজাদের উত্সাহিত করতে মেলায় গাছের চারা কোনা-বেচার প্রচলন করেন তিনি। সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলা গাছ বেচাকেনার জন্য প্রসিদ্ধ, গুড়পুকুরের মেলাকে গাছের মেলাও বলা হতো।
১৮৬৯ সালে ব্রিটিশরাজ কর্তৃক সাতক্ষীরা মিউনিসিপ্যালিটি বর্তমানে পৌরসভা স্থাপিত হলে প্রাণনাথ প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে ১৮৬৯ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তারই নামানুসারে ১৮৬২ সালে সাতক্ষীরাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রাণনাথ বা পিএন হাইস্কুল এবং ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাণনাথ ওয়াটার ওয়ার্কস বা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।
শহরের দক্ষিণ মাথায় আছে চিত্ত রঞ্জন দে’র মিষ্টির দোকান। প্রসিদ্ধ মিষ্টি প্রস্তুতকারক। তিনি আর বেঁচে নেই ধরাধামে। তার ছেলেরা দোকান চালায়। জানা গেল, রাতে তেল ছাড়া রুটি বানানো হয়। এই রুটি এতটাই প্রসিদ্ধ—প্রায় ছয় শ রুটি বিক্রি হয় প্রতিরাতে। সকালে বিক্রি হয় রুটি, পরোটা ও লুচি। আর মিষ্টি-দই তো আছেই।
আশ্বিনের শেষ দিন মানে ৩১ ভাদ্র সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলের মনসাতলায় বসে মনসাপূজা। রাতে শহরেই ঘুমিয়েছি, সকাল সকাল পৌঁছে গেলাম মনসাতলায়। চীন-বাংলা মার্কেট পার হয়েছি কি হইনি। সামনে সারি সারি টেবিলে সারি করা ভোগ সাজানো। কলা, বেলপাতা, বাতাসা, জবা ফুল, টগর, গাঁদা ফুলের পাপড়ি, আরো আছে শাপলা ফুলের পাপড়ি। আর বোতলে রাখা আছে দুধ। সারি সারি মনসা আর শিবের ভোগের দোকান ছাড়িয়ে চোখে পরে মনসাতলা। এই মনসাতলার ইতিহাস পড়েছিলাম।
বাংলা বারো শতকের কথা, বুড়া খাঁ নামের স্থানীয় এক ধার্মিক ছিলেন। এই বুড়া খাঁকে নিয়ে কিছু জানা যাক—সে আরো অনেকদিন আগের কথা। তখন বাংলাদেশে সুলতানি শাসন চলছে। বাংলার সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন ধারার সূত্রপাত হয়েছে। ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব। মুসলমান সমর নায়ক ও সৈনিকদের সঙ্গে সঙ্গে এদেশে প্রবেশ করতে শুরু করেছে সাধারণ কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ভাগ্যান্বেষী ও সুফি-দরবেশ। পির-দরবেশরা এদেশে এসে ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করতে শুরু করেছেন। সে সময় আরো অনেকের মতো এলেন খানজাহান আলী। বাংলা নবম শতকে তিনি বাগেরহাটে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেন। যা প্রাক মোগল স্থাপত্যের এক অনিন্দ্যসুন্দর নিদর্শন। খানজাহান আলী যখন ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করে সেখানে বসে ধর্ম প্রচার করছেন, তখন তার দুজন ব্রাহ্মণ খাজাঞ্চি ছিল। একজনের নাম কামদেব রায় চৌধুরী অন্যজন জয়দেব রায় চৌধুরী। একদা খানজাহান আলী রোজা থাকা অবস্থায় হাতে থাকা কমলালেবুর ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন। ব্রাহ্মণদ্বয় বললেন, হুজুর আপনি তো আজ রোজা আছেন, এ অবস্থায় কমলার ঘ্রাণ নিলেন, ঘ্রাণে অর্ধভোজন নয় কি? খানজাহান আলী মৃদু হাসলেন, বললেন, তোমাদের সন্দেহ ঠিকই, আমার রোজার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। অন্য একদিন খানজাহান আলী নিজে রান্না করছিলেন। সেই ব্রাহ্মণদ্বয় হঠাত্ সেখানে উপস্থিত হলেন। ব্রাহ্মণদ্বয় বললেন, হুজুর নিশ্চয় মাংস রান্না করছেন, বড়ই সুঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। খানজাহান আলী এবার মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ব্রাহ্মণ মশাইরা, তোমরা তো গো মাংসের ঘ্রাণ নিয়ে ফেলেছ, এখন ব্রাহ্মণত্বের কী হবে? খানজাহান আলীর প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে ভাবতে দুজন বড়োই পেরেসান। কয়েকদিন পর তারা দুই ভাই খানজাহান আলীর কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। কামদেবের নাম হলো কামালউদ্দিন খান চৌধুরী আর জয়দেবের জামালউদ্দিন খান চৌধুরী। উল্লেখ্য, এই কামদেব ও জয়দেবের কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাসে পাওয়া যায়।
কামালউদ্দিন খান চৌধুরী আর জামালউদ্দিন খান চৌধুরীর কোনো একজনের বংশধর বুড়া খাঁ। বুড়া খাঁ বাগেরহাট থেকে এসে সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্র পলাশপোলে বসতি স্থাপন করেন, যা এখনকার পলাশপোল চৌধুরী বাড়ি। চৌধুরী বাড়ির পূর্বপার্শ্বে একটি দরগা তৈরি করে সেখানে ধর্ম সাধনা করতে থাকেন। দরগাটি এখনো আছে।
এবার মনসাতলার নামকরণের হেতু জানা যাক—বুড়া খাঁর কয়েক প্রজন্ম পরের বংশধর ফাজেল খাঁ চৌধুরী একদিন পলাশপোল এলাকায় খাজনা আদায় করে ফিরছিলেন। পথে ক্লান্ত হয়ে পড়লে, শেষ ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে ক্লান্ত দেহে পাশেই গৌরদের পুকুরপাড়ের বটগাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে বসলেন। বটের ছায়ায় বসতে না বসতেই শিকড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। বটের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের তীব্র রশ্মি এসে তার চোখে-মুখে পড়ার কারণে বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। একসময় লক্ষ করলেন তার মুখে রোদ পড়ছে না। কী ব্যাপার, বৃষ্টি হবে নাকি, মেঘ করল নাকি? চোখ খুলে একটু খেয়াল করে ফাজেল খান দেখলেন, গাছের পাতার ফাঁকে যেখানে রোদ বিচ্ছুরিত হয়ে চোখে পড়ছিল, সেখানে একটা পদ্মগোখরো সাপ ফণা দিয়ে রোদ ঢেকে দিয়েছে। তিনি আরাম পেয়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার পর আবার ঘুম ভেঙে গেল। এর মধ্যে ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়েছে। চোখ মেলে সাপটিকে দু-দণ্ড দেখার পরই সে মিলিয়ে গেল। ফাজেল খাঁর ঘুম চলে গেল, আশপাশের বসতিদের ডেকে ঘটনা বললেন। বসতির সবাই হিন্দু, তারা মনসা তুষ্টি পূজা শুরু করলেন। ঘটনার দিনটি ছিল ভাদ্র মাসের ৩১ তারিখ। সেই থেকে বটতলার নাম হয়ে যায় মনসাতলা। আর সেই থেকে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের ৩১ তারিখ মনসাতলায় পূজা হয়। আর বসে মেলা। মনসাতলায় পূজা দিলেও মেলার নাম গুড়পুকুরের মেলা।
মেলার নাম নামকরণ গুড়পুকুর হওয়া নিয়ে আছে নানা মিথ। প্রচলিত কাহিনি—
এক.
আগের দিনে মনসাতলায় পূজার সময় পুকুরে বস্তায় বস্তায় বাতাসা ফেলা হতো। ভক্তরা এত বেশি গুড়ের বাতাসা ফেলেছিল যে, একসময় পুকুরের পানি আর পানি থাকল না। শরবত হয়ে গেল, সেই থেকে গুড়ের শরবত বা গুড়পুকুর নামে ডাকা শুরু হলো পুকুরের নাম।
দুই.
চৌধুরীর এলাকার পানির সমস্যা দূরীকরণে বিশাল পুকুর খনন করলেন, কিন্তু পুকুরে পানি থাকে না। শহরের মানুষের প্রয়োজনে যে পুকুর খনন করা হলো, তার সবই বৃথা। স্থানীয় চৌধুরীদের কোনো একজনকে স্বপ্নদর্শনে বিধাতা জানালেন, একশ’ ভাঁড় গুড় ঢালতে হবে পুকুরে। সেই স্বপ্ন নির্দেশমতো পুকুরে একশ ভাঁড় গুড় ঢালা হলো। পুকর যৌবনবতী হলো, শহরের মানুষের পানির সমস্যা মিটল। সেই থেকে পুকুরের নাম গুড়পুকুর।
তিন.
এত গল্পের মাঝে কেউ কেউ মনে করেন, শহরের পানির সমস্যা সমাধানে গৌড় বংশীয় কোনো রাজার খনন করা পুকুরের তলদেশ থেকে একসময় মিষ্টি পানি উঠত, তাই এর নাম গুড়পুকুর।
চার.
পুকর খননের আগে পুকুরের জায়গাতে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। সেই গাছে প্রচুর রস হতো। একবার গাছের সমস্ত রস দিয়ে গুড় তৈরি করে তা বিক্রি করা হলো এবং ওই বিক্রিত টাকা দিয়ে পুকুরটি কাটা হলো। তখন থেকে গুড়পুকুর।
পাঁচ.
অনেকে মনে করেন, আসলে ওসব কিছু না। চৌধুরীপাড়ার রায় চৌধুরীরা গৌর বর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাই তাদের পুকুরকে বলা হতো গৌরদের পুকুর। বিবর্তনের ফলে হয়ে গেছে গুড়পুকুর।
ছয়.
তবে বর্তমানে জীবিত প্রৌঢ় বয়সীদের একজন সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর মহল্লার মুজিব হোসেন জানালেন, এসব কিছুই না, আসলে পুকুরটা ছিল গোল যাকে সকলে গোলপুকুর বলত। সময়ের বিবর্তনে লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে হয়ে গেছে গুড়পুকুর।
এই পুকুরের পাড়ে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক সেই বটবৃক্ষ। যাকে পলাশপোলের মানসাতলা বলা হয়। ভাদ্রের শেষদিন এখানেই হয় দিনব্যাপী মনসাপূজা। সূর্য পূর্বাকাশে মুখ তুললেই শুরু হয় মণ্ডপের ব্যস্ততা। মনসাতলার চারদিকে মনসার ভোগ বিক্রির দোকান নিয়ে বসে দোকানীরা। ভক্তকুল ভোগ কিনছেন আর প্রবেশ করছেন মনসাতলায়। আগে থেকেই মনসাতলায় পুরোহিত ধান, দূর্বা, বেলপাতা, ঘটসহ পূজার মণ্ডপ সাজিয়ে বসে আছেন। সারা বছর একাকী কাটালেও শ্রাবণের শেষদিন মনসাতলা যৌবনবতী। মনসাতলা ভক্তকুলে পূর্ণ হয়ে ওঠে। পুরোহিত ভক্তের হাত থেকে কলা, বেলপাতা নিয়ে মনসাতুষ্টি মন্ত্র পড়ে ভক্তের হাতে ভোগের অংশবিশেষ দিচ্ছেন। যা কিনা ভক্তরা বাড়ি নিয়ে রোগমুক্তির আশায় খাবেন। এই মনসাতুষ্টি মন্ত্র পাঠ চলবে সূর্যের আলো নিভে না যাওয়া পর্যন্ত।
মনসাতলার একপাশে খেজুরের ডালায় জবা ফুল গেঁথে মনসাতুষ্টি গাছ বানিয়েছেন। পাশে কলাগাছের খোল দিয়ে বানিয়েছেন বেহুলার বাসর। প্রাকৃতিক রঙে বন্ধকী নকশায় আর মন্ত্রে সেই ঘর বন্ধ করেছেন—যাতে মনসার পাঠানো সাপ কোনোভাবেই বেহুলার বাসরে প্রবেশ করতে না পারে। পাশেই আছে বেহুলা ও লখিন্দরের পুতুল। আছে মনসার পাঠানো প্লাস্টিকের সাপ। আছে বাসরঘরে লখিন্দরকে মনোরঞ্জন করার জন্য বেহুলার পায়ের ঘুঙুর। রাখা আছে সিঁদুর। আগত ঘরণীরা স্বামীর শুভকামনার্থে সাজানো বাসরে অর্ঘ দিয়ে প্রণাম করে মাথায় নিচ্ছেন সিঁদুরের ফোঁটা, সিঁদুরফোঁটা পরিয়ে দিচ্ছেন সরলা দাসী। সরলা দাসী দলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, গান ধরেছেন কালী দাসী—
যমুনার জল কালো, দেখতে ভালো,
সাঁতার কাটিতে বেহুলা গেলো রে।
যমুনার ঢেউ লাগিয়া
পাতা জড়াইয়া ধরে গো।
বুক জলে গিয়া বেহুলা
বুক মাজন করে গো।
যমুনার ঢেউ লাগিয়া
মনসামঙ্গলের আঞ্চলিক সুরের এক ধারা যা কিনা রয়ানী গানের তালে গাওয়া হচ্ছে এখানে। সরলা দাসী বসে সঙ্গত দেন বাকিরা দাঁড়িয়ে নেচে নেচে গান পরিবেশন করেন। মনোসন্ধ্যা দাসী, পুষ্প দাসী, কালী দাসী এই মিলে নগরঘাটার বিধবাদের মনসামঙ্গলের দল। একদিনের জন্য এসেছেন গান করে কিছু টাকা সংগ্রহ করতে। তাদের উদ্দেশ্য অনেকটাই সফল, সামনে বিছিয়ে রাখা রুমালে টাকা-পয়সা ভালোই পড়েছে। তাদের পরিবেশিত মনসাকাব্যের কোনো লিখিত রূপ নেই। মুখে মুখে গান করেন। জানালেন তারা জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৫ তারিখে নগরঘাটার বুড়ো বটের তলে মনসা পূজায় বসেন। আবারও গান ধরলেন সরলা দাসী, অন্যরা অভিনয় করে চলেছেন—
কী সাপে দংশিল লখাই
অঙ্গ হইল কালো
এই আমারে বল।
এই বিধির কী হইল।
বিশ্বকর্মা এসেছেন লখিন্দরের বাসর গড়তে। নাগরীরা প্রশ্ন করছেন ও বিশ্বকর্মা দা কই যাও? বিশ্বকর্মা জানান, তিনি সাতক্ষীরায় পলাশপুলের মনসাতলায় লখিন্দরের বাসর তৈরি করতে যাচ্ছেন, আর এই কাজের দায়িত্ব তাকে দিয়েছে চান্দ সওদাগর। তারপর শুরু করলেন বাসর গড়ার কাজ—
বাসর বান্ধিলাম, বান্ধিলাম
পাতালে বসাতে। বাসর বান্দিলাম—
সেই বাসরে বসত করবে সোনার লখিন্দর
বাসর বান্দিলাম
বাসর বান্দা ষোল আনা
চলো গিয়ে খাই।
বাসর বান্দিলাম
বাসর গড়া শেষ, বিশ্বকর্মা ফিরে গেলেন তার বাড়ি।
এবার লখিন্দরের কথা, লখিন্দর মায়ের কাছে বায়না ধরেছে—
ওমা স্বর্ণবাটা এনে দেও মা
খেলতে যাবো আমি।
আমার খেলার সাথী চলে গেল
ওমা হাতে ধরি পায়ে পড়ি খেলতে যাবো আমি।
খেলার ফাঁকে প্রেম, প্রেম থেকে লখিন্দরের বিয়ে হলো। বেহুলা আর লখিন্দরকে দেওয়া হলো বাসরঘরে। চলছে বেহুলা আর লখিন্দরের বাসরঘরে পাশা খেলা—
পাশা খেলবো রে
ঐ পাশা খেলবো রে
আজ নিমাই বাসর ঘরে
এক-ও দান-ও দুইও দানও
হইল পাশা দানও
নিমাই বাসর ঘরে
আমি যদি হেরে যাই প্রাণনাথ
এই যৌবন করব দান।
বেহুলা হেরে যায়।
তার পর যৌবন দান...
চলতে থাকে বেহুলা লখিন্দরের কাহিনি নাট্য।
মূল বটগাছের নিচে বসেছে মূল পূজার কাজ। পূজাপ্রার্থীর সংখ্যা এতই বেশি, কয়েকজন পুরোহিত বসেছেন পূজাকার্য সম্পাদন করতে। পূজাপ্রার্থীদের সকলের হাতে মাটির পাতে কলা, দূর্বা, বেলপাতা, গাঁদা, টগর ফুল আর হাতে বোতলে দুধ। পুরোহিত ভোগ নিচ্ছেন আর মনসা মণ্ডপে রাখছেন, সঙ্গে সঙ্গে পূজাপ্রার্থীকে কিছু ভোগ ফেরত দিচ্ছেন।
বুড়া খাঁর বংশধর ফাজেল খাঁ চৌধুরীর সময় থেকে ধরলে এই মেলার বয়স প্রায় তিন শ বছর। কাজেই গুড়পুকুরের মেলার আছে ঐতিহাসিক সুনাম। একসময় নাকি শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা প্রধান সড়ক বন্ধ করে দিয়ে মেলা বসতো। প্রথম থেকে আজ অবধি মেলার প্রধান আকর্ষণ গাছের চারা-কলম। হাজারো রকমের গাছের চারা পাওয়া যায় এই মেলায়। এছাড়া কাঠের ফার্নিচার, মাটির আখ, লেবু, গরু, ঘোড়াসহ শিশুদের বিভিন্ন খেলনা। বাঁশের ঝুড়ি, ধামা, কুলা, টুকরি, বাটি, লোহার শাবল, খোন্তা, দা, ছুরি, কোঁদাল বিভিন্ন জিনিসপত্র ছাড়াও বেতের তৈরি নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র সুলভে পাওয়া যায়।
মুজিব হোসেনের কাছ থেকে জানা যায়, একসময় মেলাতে এসে বাতাবি লেবু ও ইলিশ মাছ না কিনে কেউ বাড়ি ফিরত না। এখানকার ইলিশ মাছ ও বাতাবি লেবু এতটাই প্রসিদ্ধ ছিল। সার্কাস, যাত্রা, পুতুলনাচ, মোটর সাইকেল, মৃত্যুকূপ, চরকি, নাগরদোলা, মিষ্টি পান মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল। একসময় খুলনা রোড থেকে তুফান কোম্পানির মোড়, আর নিউ মার্কেট থেকে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পর্যন্ত মেলা বিস্তৃত ছিল। তবে তখন পলাশপোল গ্রামই মেলার কেন্দ্রস্থল।
গত কয়েক বছর ধরে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা মেলার সার্বিক তত্ত্বাবধান করে আসছে। ২০০২ সালে সার্কাস পার্টিতে বোমা হামলার পর মেলাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন মেলার আগের যৌবন আর পায় না। মনসাতলার পৌরাণিক মেলার পাশাপাশি পৌরসভা ও জেলা প্রসাশকের তত্ত্বাবধানে রাজ্জাক পার্কে মেলা বসতে শুরু করেছে, এই মেলা চলে মাসব্যাপী।