এটা আমার দোষ না। কাজেই আমাকে আপনি দোষারোপ করতে পারেন না। আমি এটা করিনি এবং জানিও না কীভাবে এটা হলো। আমার দুই পায়ের মধ্য থেকে যখন ওরা তাকে টেনে বের করল, তারপর এক ঘণ্টা পার হতে না হতেই আমি বুঝতে পারলাম, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ভীষণ একটা ভুল। সে এমন কালো ছিল যে, রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম। নিশুতি রাতের মতো কালো। সুদানিদের মতো কালো। আমার গায়ের রং ফর্সা, চুল সুন্দর, যাকে আমরা বলি উজ্জ্বল হলুদ। লুলা অ্যানের বাবারও তা-ই। আমার পরিবারের আর কারো গায়ের রং ওর সেই মিশমিশে কালো রঙের কাছাকাছিও না। ওকে দেখে কেবল আলকাতরার কথাই মনে হয়, তবে ওর গায়ের রঙের সাথে চুলের কোনো মিল নেই। এটা একটু ভিন্নরকম-সোজা তবে কোঁকড়ানো, সেই অস্ট্রেলিয়ার উদোম গায়ের আদিবাসীদের মতো। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, সে তার পূর্বপুরুষের রং পেয়েছে, কিন্তু কোন পূর্বপুরুষ? আমার দাদিকে দেখলে বুঝতেন; তাকে একজন শ্ব্বেতাঙ্গই মনে করা হতো, বিয়েও করেছিলেন একজন সাদা চামড়ার মানুষকে। আর তার ছেলেমেয়েদেরকেও কখনো কিছু বলেননি। আমার মা-খালারা তাকে কোনো চিঠি পাঠালে, চিঠিটা না খুলেই আবার ফেরত পাঠিয়ে দিতেন। অবশেষে ওরা বুঝতে পারলেন যে, তার কাছ থেকে কিছু আশা করে আর লাভ নেই, তাই ওকে ওরা ওর মতোই থাকতে দিলেন। তখনকার দিনে যাদের বাবা-মায়ের মধ্যে একজন কালো, একজন শ্বেতাঙ্গ বা মুলাটো এবং যাদের পূর্বপুরুষের এক চতুর্থাংশ কালো এবং তিন চতুর্থাংশ শ্বেতাঙ্গ বা কোয়াড্রোন ছিলেন, তাদের অধিকাংশই এরকম করতেন—অর্থাত্ তাদের চুলের রং যদি সঠিক হতো। কখনো ভেবে দেখেছেন, কয়জন সাদা চামড়ার মানুষের শিরায় নিগ্রো রক্ত লুকিয়ে আছে? অনুমান করুন। আমি শুনেছি শতকরা বিশ ভাগ। আমার মা লুলা মাআ সহজেই একজন শ্বেতাঙ্গ হিসেবে নিজেকে চালিয়ে নিতে পারতেন, তবে তিনি তা করেননি। এই সিদ্ধান্তের জন্য তাকে যে কী মূল্য দিতে হয়েছিল, সে কথাটা তিনি আমাকে বলেছিলেন। যখন আমার মা আর বাবা বিয়ে করার জন্য কোর্টহাউসে গেলেন, তখন সেখানে ওরা দুটো বাইবেল দেখতে পেলেন এবং তাদেরকে নিগ্রোদের জন্য আলাদা করে রাখা বাইবেলের ওপর হাত রাখতে বলা হলো। অন্যটা ছিল শ্বেতাঙ্গদের হাত রাখার জন্য। এটা ছিল বাইবেল! ভাবতে পারেন? আমার মা একটি ধনী শ্বেতাঙ্গ দম্পতির বাড়িতে হাউসকিপার ছিলেন। ওরা তার হাতের রান্না খেতেন এবং বাথটাবে গোসলের সময় ওদের পিঠ ঘষে দেবার জন্য জোর খাটাতেন। ঈশ্বরই জানেন আর কী কী অন্তরঙ্গ কাজ তাকে দিয়ে করাতেন, তবে একই বাইবেল ছোঁয়া যাবে না।
কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, গায়ের রং দিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণিকরণ করাটা ঠিক না। রং যত ফর্সা হতো, ততই ভালো—সামাজিক ক্লাবে, পাড়াপ্রতিবেশীর মাঝে, গির্জায়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, মহিলা সমিতি এবং এমনকি কালোদের বা মিশ্র বর্ণের স্কুলেও। কিন্তু আর কীভাবে আপনি একটু সম্মান বজায় রাখবেন বা মর্যাদা ধরে রাখবেন? আর কীভাবে ওষুধের দোকানে গিয়ে নিজের গায়ে থু থু ছিটানো, বাসস্টপে কনুইয়ের গুঁতো এড়াবেন আর পুরো ফুটপাত শ্বেতাঙ্গদের জন্য ছেড়ে দিয়ে নর্দমার মধ্য দিয়ে হাঁটবেন? আবার মুদির দোকানে যে কাগজের ঠোঙাটা শ্বেতাঙ্গ ক্রেতাদের বিনামূল্যে দেওয়া হয়, তার জন্য কেন আপনাকে এক নিকেল দিতে হবে? আর ব্যঙ্গ করে শুধু কী কী নামে ডাকা হয় সেকথাটাই একবার ভাবুন। আমি এগুলো অনেক অনেক শুনেছি। তবে আমার মাকে অবশ্য তার গায়ের রঙের জন্যই ডিপার্টমেন্ট স্টোরে টুপি মাথায় দিয়ে ট্রায়াল দেওয়া কিংবা লেডিজ রুম ব্যবহার করা থেকে বিরত করা হয়নি। আর আমার বাবা জুতার দোকানের সামনের দিকে এসে জুতা পায়ে দিয়ে মাপ দেখতে পারতেন, পেছনের ঘরে নয়। আর ওদের দুজনের কেউই পিপাসায় মরে গেলেও ‘কেবল কালোদের’ জন্য বরাদ্দ পানির ফোয়ারা থেকে পানি পান করতেন না।
বলতে খুবই খারাপ লাগছে, তবে মেটার্নিটি ওয়ার্ডে শুরু থেকেই বাচ্চাটা, অর্থাত্ লুলা অ্যান আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। জন্মের সময় আর সব বাচ্চাদের মতোই, এমনকি আফ্রিকান বাচ্চাদের মতোই ওরও গায়ের রং ফ্যাকাশে ছিল, তবে এটা দ্রুত বদলে গেল। ঠিক আমার চোখের সামনে যখন এটা নীলচে-কালো হয়ে গেল, তখন ভেবেছিলাম, আমি পাগল হয়ে যাব। জানি অন্তত এক মিনিটের জন্য হলেও আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম, কেননা কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও আমি বাচ্চাটার মুখের ওপর একটা কম্বল চেপে ধরেছিলাম। তবে কাজটা করতে পারলাম না, যতই কামনা করি না কেন যে, এরকম ভয়ংকর গায়ের রং নিয়ে সে জন্মগ্রহণ না করলেও পারত। এমনকি বাচ্চাটাকে কোনো একটা অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলাম। তবে আমি সেই ধরনের মা হতে চাইনি—যারা গির্জার সিঁড়িতে তাদের বাচ্চাদের ফেলে রেখে যায়। সম্প্রতি আমি শুনেছিলাম, জার্মানিতে বরফের মতো ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙের এক দম্পতির একটি কালো রঙের বাচ্চা জন্ম নিয়েছিল, যার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেনি। আমার মনে হয় এরা জমজ ছিল—একটি শিশু সাদা আর আরেকটি শিশু কালো। তবে জানি না এটা সত্যি কি না। আমি কেবল জানি আমার বেলায়, যখন আমি তাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল যেন একটা কালো বাচ্চা আমার স্তনের বোঁটা চুষছে। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর পরই আমি তাকে বোতলের দুধ খাওয়াতে শুরু করলাম।
আমার স্বামী লুইস একজন পোর্টার। যখন সে রেল অফিস থেকে ফিরে এল, তখন এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি সত্যি সত্যি একটা পাগল হয়েছি আর বাচ্চাটার দিকেও এমনভাবে তাকাল যেন সে বৃহস্পতি গ্রহ থেকে এসেছে। ছোটখাটো সাধারণ ব্যাপার নিয়ে সে খুব একটা মাথা ঘামাত না, আর কথায় কথায় শাপশাপান্তিও করত না। তবে যখন সে বলল, ‘ঈশ্বরের দোহাই! এটা আবার কী?’ তখনই আমি বুঝলাম আমরা ঝামেলায় পড়েছি। তারপর থেকেই আমাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হলো। আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে খান খান হয়ে গেল। তিনটি বছর আমরা ভালোই কাটিয়েছিলাম, তবে যখন বাচ্চাটার জন্ম হলো, তখন সে আমাকেই ওর জন্য দোষারোপ করল আর লুলা অ্যানকে একজন অপরিচিত বা আগন্তুকের মতো—বরং তারচেয়েও বেশি, একজন শত্রুর মতো দেখতে লাগল। একবারও তাকে ছুঁয়ে দেখল না।
আমি যে কখনো আরেকজন পুরুষের সাথে মেলামেশা করিনি, একথাটা তাকে একবারও বিশ্বাস করাতে পারিনি। সে পুরোপুরি নিশ্চিত যে, আমি মিথ্যা বলছি। আমরা তর্ক করেই চললাম, তারপর তর্ক করতে করতে অবশেষে আমি তাকে বললাম যে, বাচ্চাটার কালো রং আমার স্বামীর পরিবার থেকে এসেছে, আমার পরিবার থেকে নয়। ব্যস, এরপর পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে মোড় নিল, এতই খারাপ যে, সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল আর আমাকে আরেকটি কম ভাড়ার নতুন বাসা খুঁজতে হলো। তখন আমার যা করার তা-ই করলাম। জানতাম নতুন বাড়িওয়ালার কাছে বাড়িভাড়ার জন্য গেলে বাচ্চাটাকে সাথে নেওয়া যাবে না, তাই ওকে দেখাশোনা করার জন্য আমার একজন তরুণ কাজিনের কাছে রেখে গেলাম। তবে এমনিতেই তাকে খুব একটা বাইরে নিতাম না, কেননা যখন আমি বেবি ক্যারেজ ঠেলে তাকে নিয়ে যাব, তখন লোকজন নিচু হয়ে বাচ্চাটার দিকে এক নজর দেখে হয়তো সুন্দর কোনো কথা বলতে চাইবে, তারপর ভ্রু কুঁচকে চমকে উঠবে। এটা খুবই খারাপ লাগবে। আমার গায়ের রং যদি উল্টোটা হতো, তবে আমিই হয়তো তার বেবিসিটার হতে পারতাম। একজন কালো নারী হলে—এমনকি বাদামি বা উজ্জ্বল হলদে রং হলেও শহরের একটু ভালো এলাকায় বাড়ি ভাড়া নেওয়াটা এমনিতেই বেশ কষ্টকর। ৯০ দশকে, যখন লুলা অ্যানের জন্ম হয়েছিল, তখন কাকে বাড়িভাড়া দেওয়া হবে সে বিষয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ করার বিরুদ্ধে আইন ছিল, তবে অনেক বাড়িওয়ালাই তা মানত না। কাউকে ফিরিয়ে দিতে হলে ওরা একটা না একটা কারণ ঠিকই দেখাত। তবে মিস্টার লেই-এর সাথে আমার ভাগ্য ভালো ছিল, তবে তিনি যে ভাড়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, তার চেয়ে সাত ডলার বেশি ভাড়া আমার কাছ থেকে আদায় করলেন। আর ভাড়া দিতে এক মিনিট দেরি হলেই রীতিমতো মেজাজ দেখাতেন।
আমি ওকে বললাম, ‘মাদার’ বা ‘মাম্মা’ না ডেকে সে যেন আমাকে ‘সুইটনেস’ বলে ডাকে। এটা বেশ নিরাপদ ছিল। কালো রং আর সেই খুব বেশি পুরু ঠোঁট নিয়ে সে আমাকে ‘মাম্মা’ বলে ডাকলে লোকজন একটু বিভ্রান্ত হতো। এছাড়া ওর চোখের রংও ছিল আজব ধরনের, কুচকুচে কালোর মধ্যে সামান্য নীলাভ—কেমন যেন ডাইনির মতো একটা ভাব ছিল চোখজোড়ার মধ্যে।
যা-ই হোক, এভাবেই কেবল আমরা দুজনেই বেশ কিছুদিন একসাথে কাটালাম এবং একজন পরিত্যক্তা স্ত্রী হিসেবে কী কষ্টে আমাকে জীবন চালাতে হয়েছে, সেকথা আর বলার নয়। তবে আমার মনে হয় এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর লুইস হয়তো একটু অনুতপ্ত হয়েছিল, কেননা কয়েক মাস পর সে আমার নতুন বাসা খুঁজে বের করে, সেই ঠিকানায় প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করল। যদিও আমি কখনো তার কাছে টাকা চাইনি আর খোরপোষ আদায়ের জন্য আদালতেও যাইনি। তবে প্রতিমাসে তার পঞ্চাশ ডলারের মানি অর্ডার আর হাসপাতালে আমার রাতের চাকরি দিয়ে আমার আর লুলা অ্যানের খরচের জন্য আর সরকারি ওয়েলফেয়ারের কাছে হাত পাততে হলো না। এটা একদিকে ভালোই হলো। কেননা আমার অনেক সময় মনে হতো এটাকে ওয়েলফেয়ার না বলে ওরা সেই আগের শব্দটায় ফিরে গেলে ভালো হতো, যখন আমার মা একটি ছোট্ট মেয়ে ছিলেন। তখন ওরা এটাকে বলত ‘রিলিফ’। কথাটা শুনতে ভালোই লাগে, যেন নিজেকে সামলে ওঠার আগে কিছু সময়ের জন্য একটু স্বস্তি। তাছাড়া ওয়েলফেয়ারের কেরানিরা ভীষণ রগচটা। অবশেষে একটা কাজ পেতেই ওদের সাহায্য আর দরকার পড়ল না, কেননা তখন আমি ওদের চেয়ে অনেক বেশি টাকা কামাতাম। আমার মনে হয় আমাদেরকে যে অঙ্কের চেকটা দেওয়া হতো, তা এতই কম ছিল যে, সে জন্যই হয়তো ওরা আমাদের সাথে ভিক্ষুকের মতো আচরণ করত। বিশেষত যখন ওরা প্রথমে লুলা অ্যানের দিকে তাকিয়ে, তারপর আমার দিকে এমনভাবে ঘুরে তাকাত—যেন আমি ওদের সাথে প্রতারণা বা তেমন কিছু একটা করছি। আমার অবস্থা অবশ্য ক্রমশ এর চেয়ে ভালো হয়ে উঠল, তবে তারপরও আমাকে সতর্ক হয়ে চলতে হয়েছিল। কীভাবে ওকে বড় করব, সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলাম। আমাকে খুব কড়া, ভীষণ কঠোর হতে হয়েছিল। লুলা অ্যানকে শিখতে হবে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কীভাবে মাথা নিচু করে চলতে হবে এবং কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করা চলবে না। কতবার সে তার নাম বদলায় তাতে আমার কিছু আসে যায় না। তার গায়ের রংটাই হচ্ছে একটা ঝাণ্ডা বা ক্রস, যা তাকে সবসময় বয়ে বেড়াতে হবে। তবে এটা আমার দোষ নয়। মোটেই আমার দোষ নয়।
ও হ্যাঁ এটা ঠিক, যখন ও খুব ছোট্টটি ছিল তখন যেভাবে লুলা অ্যানের সাথে আচরণ করতাম, সেকথা ভেবে অনেকসময় খারাপই লাগত। তবে একটা কথা আপনাকে বুঝতে হবে। তাকে আমার নিরাপত্তা দিতে হবে। সে তো দুনিয়া চেনে না। সে ন্যায্য কথা বললেও বা তার কথা সঠিক হলেও এরকম গায়ের রং নিয়ে দৃঢ় মনোভাব দেখিয়ে কিংবা কেতাদুরস্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে কোনো লাভ নেই। অন্তত সেই জগতে নয়, যেখানে উল্টো জবাব দিলে কিংবা স্কুলে মারামারি করলে কিশোর অপরাধীদের কারাগারে পাঠানো হয় এবং যে জগতে আপনাকে সবার শেষে চাকরি দেবে এবং সবার আগে চাকরিচ্যুত করা হবে। সে এগুলো কিছুই জানে না আর একথাও জানে না—কীভাবে তার গায়ের কালো রঙের কারণে শ্বেতাঙ্গরা ভয় পাবে কিংবা হেসে উঠবে এবং তাকে ঠকাবার চেষ্টা করবে। একবার আমি দেখেছি প্রায় লুলা অ্যানের মতোই গায়ের রঙের প্রায় দশ বছর বয়সী একটা মেয়েকে একদল শ্বেতাঙ্গ বালক ল্যাং মেরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর যখন মেয়েটি আবার উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছিল, তখন আরেকটা ছেলে তার পিঠে পা দিয়ে লাথি মেরে তাকে আবার মাটিতে ফেলে দিল। ছেলেগুলো এই দৃশ্য দেখে পেটে হাত রেখে শরীর বাঁকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ছিল। মেয়েটা চলে যাওয়ার অনেক পরেও ওরা গর্বভরে তখনো হাসছিল। বাসের জানালা দিয়ে এ দৃশ্যটা না দেখলে আমি হয়তো মেয়েটাকে সাহায্য করতে পারতাম এবং শ্বেতাঙ্গদের ঐ জঞ্জালের মধ্য থেকে তাকে টেনে সরাতে পারতাম। তাহলে দেখুন আমি যদি লুলা অ্যানকে সঠিকভাবে শিক্ষা না দিতাম, তাহলে সে জানত না যে, রাস্তায় পার হবার সময় শ্বেতাঙ্গ ছেলেদের এড়িয়ে যেতে হবে। তবে আমি তাকে যে শিক্ষা দিয়েছিলাম, তা কাজে লেগেছিল এবং শেষ পর্যন্ত সে আমাকে পেখম মেলা একটি ময়ূরের মতো গর্বিত করেছে।
মা হিসেবে আমি খুব একটা খারাপ ছিলাম না, একথা আপনার জানা দরকার, তবে অনেক সময় আমার একমাত্র সন্তানের প্রতি মনে আঘাত দেওয়ার মতো কিছু কিছু কাজ করেছি বা কষ্ট দিয়েছি, তবে তাকে তো আমার নিরাপত্তা দিতে হবে। তাই এটা করতেই হয়েছিল। সবকিছুই সেই গায়ের রঙের কারণে। প্রথমত তার সেই কালো রঙের পেছনের মানুষটাকে আমি দেখতে পারিনি যে, সে কে এবং সেভাবে স্বাভাবিকভাবে তাকে ভালোবাসতে পারিনি। তবে আমি তাকে ভালোবাসি। আসলেই ভালোবাসি। আমার মনে হয় এখন তা সে বুঝতে পারে। তা-ই মনে হয় আমার।
শেষ দুইবার যখন তাকে আমি দেখি, তখন সে দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল। একধরনের দুঃসাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী। প্রত্যেকবার যখন সে আমাকে দেখতে আসত, তখন আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, সে কতটা কালো, কেননা সে তখন সুন্দর সুন্দর সাদা পোশাক পরে তার কালো গায়ের রংকে ঠিকই কাজে লাগিয়েছিল।
সে আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে, যা আমার সবসময় জানা উচিত ছিল। আপনি সন্তানের প্রতি যা করেন তা আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণই হয়। আর ওরা হয়তো সেকথা কখনো ভুলে না। তাই যে মুহূর্তে সে সুযোগ পেল, সেই জঘন্য অ্যাপার্টমেন্টে আমাকে একা ফেলে সাথে সাথে চলে গেল। আমার কাছ থেকে যতদূর সম্ভব দূরে চলে গেল :সুন্দর পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা ভালো কাজ পেল। এরপর আর আমাকে সে ফোন করেনি কিংবা দেখা করতে আসেনি। তবে মাঝে মাঝে টাকাপয়সা আর এটাসেটা পাঠাত, তবে ঠিক বলতে পারব না কতদিন হলো তাকে আর দেখিনি।
এই জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ—উইন্সটন হাউজ। শহরের উপকণ্ঠের সেই বিশাল, ব্যয়বহুল নার্সিং হোমগুলোর চেয়েও এ জায়গাটা আমি পছন্দ করি। এটা বেশ ছোট, ঘরোয়া ধরনের এবং সস্তা। চব্বিশ ঘণ্টা নার্স আছে আর একজন ডাক্তার সপ্তাহে দুইবার আসেন। আমার বয়স কেবল তেষট্টি—সবকিছু ছেড়েছুড়ে অবসরে যাওয়ার জন্য খুবই কম বয়স। তবে গা শিরশির করা খুবই খারাপ একটা হাড়ের রোগে ধরেছে, সেজন্য ভালোভাবে যত্ন নেওয়াটা দরকার হয়ে পড়েছে। দুর্বলতা কিংবা যন্ত্রণার চেয়েও একঘেয়েমিজনিত ক্লান্তিটা খুবই খারাপ লাগে, তবে নার্সরা সত্যি খুবই ভালো। একবার যখন আমি বললাম, আমি নানী হতে চলেছি, তখন একটা নার্স আমার গালে চুমু খেল। তার মিষ্টি হাসি আর প্রশংসা দিয়ে যেকোনো মানুষকে সে অনেক উঁচুতে তুলে দিতে পারবে। লুলা অ্যানের কাছ থেকে নীল কাগজে লেখা যে চিঠিটা পেয়েছিলাম, সেটা তাকে দেখালাম। তবে চিঠির নিচে সই করা ছিল ‘নববধূ’, তবে সেদিকে আমি একবারও নজর দেইনি। তবে তার কথাগুলো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। ‘জানো সু, আমি খুব, খুউব খুশি এ খবরটা জানাতে পেরে। আমি মা হতে চলেছি। খুবই শিহরণ অনুভব করছি আর আশা করি তুমিও তা-ই অনুভব করছ।’ আমার মনে হলো এই শিহরণটা কেবল সন্তানের জন্য, এর বাবাকে নিয়ে নয়, কেননা সে একবারও তার কথা বলেনি। ভাবছি লোকটি তার মতোই কালো কি না। তা-ই যদি হয়, তবে তাকে আমার মতো উদ্বিগ্ন হতে হবে না। আমার ছোটবেলার সময়ের তুলনায় এখন সবকিছু একটু বদলে গেছে। নীলচে-কালো রং এখন সবজায়গায় দেখা যাচ্ছে, টিভিতে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনে, বিজ্ঞাপনে, এমনকি চলচ্চিত্রের অভিনয় জগতেও।
খামে তার কোনো ঠিকানা ছিল না। তার মানে আমার অনুমান, আমি এখনো সেই খারাপ মা হিসেবেই মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত শাস্তি পাচ্ছি। ইচ্ছা করেই এবং সত্যি বলতে কী নিতান্ত প্রয়োজনেই যেভাবে তাকে আমি বড় করেছি, সেকারণে সে আমাকে ঘৃণা করে, এটা আমি জানি। আমাদের সম্পর্কটা এখন কেবল আমাকে তার টাকা পাঠানো পর্যায়ে নেমে এসেছে। আমাকে স্বীকার করতে হবে যে, নগদ টাকাটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কেননা এর ফলে অন্যান্য কয়েকজন রোগীর মতো আমাকে আর হাত পাততে হয় না। একা সলিটারি খেলার জন্য নতুন এক প্যাকেট তাসের প্রয়োজন হলে, লাউঞ্জে পড়ে থাকা পুরনো ছিন্নভিন্ন তাসের বদলে নতুন এক প্যাকেট তাস কিনতে পারি। আর আমার সেই বিশেষ ধরনের ফেস ক্রিমটাও কিনতে পারি। তবে আমি বোকা নই। জানি আমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকার জন্য আর যে ছিটেফোঁটা বিবেকের তাড়না তার মধ্যে ছিল, তা প্রশমনের জন্যই সে টাকাটা পাঠায়। আমার কথাগুলো যদিও খুবই বিরক্তিরকর, অকৃতজ্ঞ শোনায়, তবে অংশত এর কারণ হচ্ছে এর নিচে অনুতাপ বা অনুশোচনা ছিল। ছোট ছোট যেসব কাজ করিনি বা করেছি, তা সবই ছিল ভুল। মনে আছে, প্রথম যখন ওর মাসিক হয়েছিল তখন আমার কী রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বা কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলাম। আর যখনই সে হোঁচট খেত বা কিছু একটা ফেলে দিত, তখন কীভাবে চেঁচাতাম। সত্যি। যখন ওর জন্ম হলো, তখন ওর গায়ের কালো রং দেখে আমি আসলেই খুবই অস্থির হয়ে পড়েছিলাম, এমনকি তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করতে চেয়েছিলাম এবং তখন প্রথমে ভেবেছিলাম ... না, সেই স্মৃতিগুলো এখন দ্রুত ঠেলে সরিয়ে দিতে হবে। কোনো লাভ নেই। জানি পরিস্থিতির কারণে আমি তার জন্য যা সবচেয়ে ভালো তা-ই করেছি। যখন আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন, তখন লুলা অ্যান আমার ওপর একটা বোঝার মতো ছিল। ভারী একটা বোঝা, তবে বেশ ভালোভাবে আমি সেই বোঝা বহন করেছি।
হ্যাঁ, তার ওপর আমি অত্যন্ত কঠোর হয়েছিলাম। সত্যিই ছিলাম। যখন সে বারো পার হয়ে তেরোতে পা দিল, তখন আরো বেশি কঠোর হতে হয়েছিল। তখন সে মুখে মুখে তর্ক করত, যা রান্না করতাম খেতে চাইত না, চুল বাঁধত না। যখন চুলে বেণি গেঁথে দিতাম, তখন স্কুলে গিয়েই সেই বেণি খুলে ফেলত। আমি তাকে খারাপ হতে দিতে পারি না। তাই সেই পথ বন্ধ করে তাকে সতর্ক করলাম যে, কী কী নামে ওকে স্কুলে ওরা ডাকবে। তারপরও আমার কিছু কিছু শিক্ষা মনে হয় তার মন থেকে মুছে গেছে। দেখুন না, এখন সে কী হয়েছে? একজন ধনী পেশাজীবী মেয়ে হয়েছে। কী আশ্চর্য, তা-ই না!
এখন সে মা হতে চলেছে। এটা একটা ভালো পদক্ষেপ, লুলা অ্যান। যদি ভেবে থাকো মা হওয়া মানেই কেবল কপোত কূজনের মতো করে মধুর স্বরে কথা বলা, উপহার আর ডায়েপার, তাহলে তুমি একটা বড় ধাক্কা খাবে। তুমি এবং তোমার নামহীন ছেলেবন্ধু, স্বামী কিংবা আকস্মিক পরিচিত কোনো ব্যক্তি, যেই হোক—শুধু ভাবতে পারবে, ওহ! একটা বাচ্চা! কিচি কিচি কু!
আমার কথা শোন। তুমি এখন জানতে চলেছ এটা পেতে কী দিতে হয়, পৃথিবী কী রকম, কীভাবে এটা কাজ করে আর জানবে যে, যখন তুমি মা হবে তখন পৃথিবী কীভাবে বদলে যায় ।
শুভকামনা রইল। ঈশ্বর বাচ্চাটির সহায় হোন।
[টনি মরিসন ১৯৯৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। গত ৫ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
গল্পটি ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দি নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। ]