পিতৃহীন শিশুকে ইসলামি পরিভাষায় এতিম বলা হয়। যেসব শিশু জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হওয়ার পূর্বে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয় তারা সমগ্র সমাজের ভালোবাসা পাবার হকদার। ইসলাম তাদের জীবন, সম্পদ ও সব ধরনের নিরাপত্তা দিয়েছে। আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে— ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য (এতিমদের) যে সম্পদ (রক্ষণাবেক্ষণের) কর্তৃত্ব দিয়েছেন তা অবোধদের অর্পণ করো না বরং তা থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করাও, তাদের পরিধান করাও এবং তাদের সান্ত্বনার বাণী শোনাও। আর এতিমদের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে উপনীত হয়। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। এতিমদের মাল প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করো না বা তারা বড়ো হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেল না।’ —সূরা নিসা, আয়াত ৫-৬
সূরা বাকারার ২২০তম আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরো ইরশাদ ফারমান-
‘(হে নবী!) মানুষ আপনাকে এতিমদের ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলুন- তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রতি লক্ষ্য রাখা অধিকতর শ্রেয়। তোমরা যদি তাদের সঙ্গে একত্রে থাকতে চাও তবে তারা তোমাদের ভাই। আর আল্লাহ স্বার্থ নষ্টকারী এবং স্বার্থ রক্ষাকারীকে ভালোরূপে জানেন।’
প্রাক আরব সমাজে প্রচলন ছিল- পিতৃহীন নারীদের যারা আশ্রয় দিত তারা তাদের সম্পদ ও রূপ-লাবণ্যের মোহে পড়ে নিজেরাই বিয়ে করত; কোনো মোহরানা তারা ধার্য করত না। আল্লাহ্পাক তাদের এ ঘৃণ্য রীতির কঠোর সমালোচনা করে এতিম বালিকাদের বিবাহের অধিকার সংরক্ষণ করেছেন। আল-কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—‘(হে নবী!) মানুষ আপনাকে নারীদের সম্বন্ধে ব্যবস্থা জিজ্ঞেস করলে আপনি বলুন, আল্লাহ তোমাদের তাদের সম্পর্কে অনুমতি দেন এবং কোরআনে তোমাদের যা যা পাঠ করে শোনানো হয়, তা ঐসব পিতৃহীন নারীদের বিধান, যাদের তোমরা নির্ধারিত অধিকার প্রদান করো না; অথচ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার বাসনা রাখো। -সূরা নিসা, আয়াত ১২৭
এতিমদের সম্পদ আত্মসাত্ করা সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ। আল-কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে—‘নিশ্চয় যারা এতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, তারা নিজেদের উদরে আগুন ভিন্ন আর কিছুই পুরে না; সত্বরই তারা জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।’ -সূরা নিসা, আয়াত ১০
এতিমরা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষ। যারা তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে কেয়ামতের দিন আল্লাহ্পাকও তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবেন। আল্লাহ এতিমদের লালন-পালনকারীকে তার নবির প্রতিবেশী বানিয়ে জান্নাতে রাখবেন। নবি করীম (স) বলেন— ‘আমি এবং এতিমের ভরণপোষণকারী জান্নাতে এই দুই অঙ্গুলির কাছাকাছি থাকব। (বর্ণনাকারী বলেন) এ কথা বলে নবিজি তার তর্জনী এবং মধ্যমা অঙ্গুলির দিকে ইশারা করলেন।’ -বুখারি
হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবি করীম (স) বলেছেন—‘মুসলমানদের সর্বাপেক্ষা উত্তম গৃহ সেটি, যেটিতে কোনো এতিম বসবাস করে আর সে গৃহের লোকেরা তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে এবং সবচেয়ে মন্দ গৃহ সেটি যেটিতে কোনো এতিম থাকে অথচ সে গৃহবাসীরা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে।’-ইবনে মাজাহ
রাসূলুলাহ (স)-এর যুগে এবং খোলাফায়ে রাশেদার যুগে দুস্থ ও এতিম শিশুরা বেশি আদরে ছিল। কখনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আবার কখনো ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের লালন-পালন করা হতো। সাহাবায়ে কেরাম নিজ ঘরে আপন সন্তানদের সঙ্গে তাদের স্থান দিতেন। আব্দুল্লাহ ইব্ন উমার (রা) এর অভ্যাস ছিল তিনি এতিম ছাড়া এক ওয়াক্তও আহার করতেন না। আল্লাহ আমাদেরও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এতিম ও দুস্থ শিশুদের যত্ন নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন!
লেখক : আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মোতাওয়াল্লি