প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রাণিরোগ প্রতিরোধ

আমিষের উত্পাদন বাড়বে ৩৫ ভাগ

অর্থনীতি ডেস্ক

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্যতা নিরসনে প্রাণিসম্পদ উপখাতের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের ফলে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ আজ একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। দেশের বহু পরিবার কেবল দুটি উন্নত জাতের গাভি অথবা স্বল্প পরিসরে ব্রয়লার, লেয়ার মুরগি পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ সরাসরি ও ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাণিরোগের কারণে এই শিল্পে প্রতি বছর বহু ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৭ সালে উপজেলা প্রাণী হাসপাতালগুলোতে ৬১ হাজার ৩৫৩টি খুরারোগ, ৭৫ হাজার ৯১২টি পিপিআর এবং ১২৩৪ হেমরেজিক সেপ্টিসোমিয়া আক্রান্ত প্রাণীর চিকিত্সা প্রদান করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব রোগের প্রকোপ বাড়ছে। দেশে সারাবছরই খুরা রোগ দেখা যায়। ২০০৯ সালের এক হিসেবে শুধু খুরারোগে ৮১৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পিপিআর বা গোটপ্লেগ রোগ ছাগল ও ভেড়ার মতো প্রাণীকে আক্রমণ করে। এ সংক্রমিত এলাকায় ৮০-৯০ ভাগ এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। মৃত্যুর হারও ৪০-৮০ ভাগের ওপরে। এই পিপিআর রোগে বাংলাদেশে বছরে ক্ষতি প্রায় ১৮৪২ কোটি টাকা।

যে সমস্ত রোগ এবং ইনফেকশন প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে সেই সমস্ত রোগ এবং ইনফেকশন জুনোটিক রোগ হিসেবে পরিচিত। এখন পর্যন্ত ১৪১৫টি জীবাণু আবিষ্কার হয়েছে যা মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। তার মধ্যে শতকরা ৬১ ভাগ জীবাণুই জুনোটিক। অর্থাত্ প্রাণিসম্পদ হতে এই রোগ মানুষের মাঝে সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যমান জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এরূপ জুনোজি রোগসমূহের মধ্যে বার্ড ফ্লু, জলাতঙ্ক, ডেঙ্গু, নিপা, এনথ্রাক্স বা তড়কা, যক্ষ্মা, ব্রুসিলোসিস, সালমোনেলাইসিসি, ক্যাম্পাইলো ব্যাকটেরিওসিস, লেপটোস্পাইরোসিস, জাপানিজ এনকেফালাইটিস, রোটা ভাইরাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ ধরনের প্রাণিরোগ প্রতিরোধে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। এ জন্য ‘জুনোসিস এবং আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ গবেষণা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গত একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মোট দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে চলতি অর্থবছর হতে শুরু করে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়েছে। বাস্তবায়ন করবে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের        অধীন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট। এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশব্যাপী জুনোসিস ও আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগের  অবস্থা নিয়ে জরিপ করা হবে। আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের   লাগসই টিকাবীজ উদ্ভাবন ও আমদানিকৃত টিকার মান নিরূপণ করা হবে বলে জানা যায়। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আমিষের উত্পাদন ৩৫ ভাগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক হিসাব অনুযায়ী গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার। মহিষ ১৪ লাখ ৮৬ হাজার, ভেড়া ৩৫ লাখ ৩৭ হাজার এবং ছাগল ২ কোটি ৬২ লাখ। এছাড়া পোলট্রি উত্পাদন হয়েছে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ যার মধ্যে মুরগি ২৮ কোটি ৯২ লাখ এবং  হাঁস ৫ কোটি ৭৭ লাখ। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে মোট পশুপাখি সংখ্যা ছিল ৪০ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার। যা থেকে ৯৯ দশমিক ২৩ লাখ মেট্রিক টন দুধ,       ৭৫ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং ১৭১১ কোটি ডিম পাওয়া গেছে। দুধ উত্পাদনে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি চলে এসেছে বাংলাদেশ।

স্থিরমূল্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ  খাতের অবদান ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। মোট কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তাছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতে উত্পাদিত কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০০৭ সালে প্রথম উচ্চমাত্রায় আক্রান্ত ক্ষমতা সম্পন্ন এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্তকরণের পর পোলট্রিতে ৫১৯টি প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছে। পোলট্রি শিল্পে এ দ্বারা ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১৭২ কোটি টাকা। দেশে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ভ্যাক্সিন আমদানি করা হয়েছে। যাচাই না করে আমদানি করায় অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাক্সিন প্রদান করার পরেও রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় অবস্থিত এবং ভারত ও মায়নামার দ্বারা তিনদিক পরিবেষ্টিত বিধায় ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ বিশ্বে রোগজীবাণুর একটি হটস্পট হিসেবে বিবেচিত। ফলে আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ এবং জুনোটিক রোগের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও উত্পাদন বৃদ্ধির পথে একটি অন্যতম অন্তরায়। জুনোসিস ও আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগসমূহ উচ্চমাত্রায় সংক্রামক ও দ্রুত সংক্রমিত হওয়ায় ক্ষমতা রাখে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আন্তঃদেশীয় জাতীয় সীমানা নির্বিশেষে এসব রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আর্থ-সামাজিক এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা ২০-২৫টি প্রাণিরোগকে আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ বলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এগুলোর মধ্যে খুরারোগ, পেস্টিডেস পেটিস রুমিনেন্ট (পিপিআর), বোভাইন টিউবারকোলসিস, সোয়াইন ইনফ্লুয়েঞ্জা, ক্লাসিক্যাল সোয়াইন ফিভার, গোটপক্স, রাণীক্ষেত রোগ এবং উচ্চমাত্রায় সংক্রামক ক্ষমতা সম্পন্ন এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি শিল্পে বেশি। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।